জীবনের একটা বড় ভগ্নাংশই আমার কেটেছে উত্তাল সমুদ্রের বুকে। আর জীবনে যত ঢেউয়ের মুখোমুখি হয়েছি তার চেয়ে অনেক, অনেকগুণ প্রচণ্ড ঢেউয়ের তাণ্ডবের মোকাবিলা করতে করতে আমরা এগিয়ে চলেছি, বাতাসের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে উড়ে বেড়ানো সমুদ্র-পরীক্ষা, তীব্র অথচ স্বচ্ছন্দ ভঙ্গিতে, তীব্র গতিতে এগিয়ে চলছি।
আকাশচুম্বী অতিকায় ঢেউগুলো আমাদের মাথা ডিঙিয়ে পাতালপুরীর দৈত্যদের মতো বার বার সদম্ভে মাথা তুলছে। পরমুহূর্তেই আবার নিজেকে গুটিয়ে নিয়ে প্রায় স্বাভাবিক হয়ে উঠছে। এমনি করে প্রতি মুহূর্তে ওঠা-নামার খেলা চলতে লাগল। তবে একটা ব্যাপারে আমি নিশ্চিত যে, তারা আমার মধ্যে আতঙ্কের সঞ্চার করতে পারে সত্য বটে। কিন্তু ধ্বংস করে দেওয়ার ক্ষমতা নেই।
কিন্তু অভাবনীয়, একেবারেই অপ্রত্যাশিত উপায়ে যে আমরা বার বার জীবন রক্ষা করতে পারছি তার একটামাত্র প্রাকৃতিক কারণ আমার পক্ষে অনুমান করা সম্ভব হচ্ছে না। কি সে প্রাকৃতিক কারণ, তাই না? তবে খোলসা করেই বলছি, আমাদের বিকল হয়ে-যাওয়া ভাঙাচোরা জাহাজটা হয়তো বা কোনো প্রবল স্রোতের মধ্যে পড়ে তার টানে নিজের অস্তিত্ব রক্ষা করে এমন সুতীব্র গতিতে ছুটে চলছে। আর যদি তা নাই হয় তবে কোনো চোরা-স্রোতের টানে পড়ে ছুটছে তো ছুটছেই। না, এ ছাড়া অন্য কোনো কারণ আমার মাথায় আসছে না।
আমি অনুসন্ধিৎসু চোখে বার-কয়েক এদিক-ওদিক দৃষ্টি ফেরাতেই দেখলাম, ক্যাপ্টেন তাঁর নিজের কেবিনে দাঁড়িয়ে। আমার মুখোমুখি তিনি অবস্থান করছেন। কিন্তু আমি যা অনুমান করেছিলাম, তাঁর দৃষ্টি যেন কেমন অস্বাভাবিক, উদাস ব্যাকুল। ব্যাপারটা আমার মাথায় এলো না। আবার তাকে দেখে মানুষ ছাড়া অন্য কিছু ভাবতেও আমি মনের দিক থেকে সাড়া পেলাম না। তবু তাঁর দিকে চোখ পড়তেই অন্তরের অন্তঃস্থলে জেগে উঠল বিস্ময়মিশ্রিত শ্রদ্ধা ও আতঙ্কের অনুভূতি। অস্বীকার করতে বিস্ময়ের চেয়ে আতঙ্কই আমাকে বেশি করে দুর্বল করে তুলল।
ক্যাপ্টেনের আপাদমস্তক চোখের মণি দুটোকে বুলিয়ে নিয়ে আমি অনুমান করতে পারলাম, তার দৈহিক উচ্চতা প্রায় আমারই সমান, পাঁচ ফুট আট ইঞ্চি। সুঠাম দেহী বলিষ্ঠ বা বিশেষ করে বলার মতো কিছু নয়। বরং সব মিলিয়ে বলা যায়, ক্যাপ্টেন একজন দীঘাকৃতি, সুঠামদেহী সাদামাটা হেচারার মানুষ। তা সত্ত্বেও তার মুখের হাবভাবে এমন একটা বিশেষ ছাপ আমার নজরে পড়ল, যাতে বার্ধক্যের অতি অদ্ভুত আর রোমহর্ষক ভাব বলেই তার ব্যাখ্যা করা চলে। আর এক ঝলক দেখেই আমার মধ্যে একেবারেই অভাবনীয় ও অবর্ণনীয় অনুভূতির সঞ্চার হলো। সত্যি সে অনুভূতির কথা কিছুতেই আমার পক্ষে খোলসা করে বর্ণনা করা, কারো মধ্যে ধারণা সঞ্চার করা একেবারেই অসম্ভব। বার্ধক্যের প্রভাবে তার কপালের চামড়ায় পর পর বেশ কয়েকটি ভাজ পড়ে গেছে। আর সে কুঞ্চিত কপালের চামড়ার গায়ে যেন অনন্তকালের ছাপ অঙ্কিত হয়ে রয়েছে। তার মাথায়, কাকের বাসার মতো উসকো খুসকো পাকা চুলের ফাঁকে ফাঁকে লেখা রয়েছে ইতিহাস–অতীত কাহিনী। আর তার চোখের মণি দুটোর গায়ে লেখা আছে অকথিত ভবিতব্যের কথা।
কেবিনের মেঝেটা একেবারেই অপরিচ্ছন্ন। মেঝের এখানে ওখানে–সর্বত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে লোহার মোটা তার দিয়ে গাঁথা অদ্ভুত অদ্ভুত সব কাগজপত্র, বৈজ্ঞানিক কাজকর্ম আর পরীক্ষা-নিরীক্ষার ভাঙাচোরা যন্ত্রপাতি আর সুদীর্ঘকাল অব্যবহৃত ও অপ্রচলিত তালিকা।
কয়েকমুহূর্ত পর আবার হঠাৎ তার দিকে চোখ পড়তেই লক্ষ্য করলাম, সে বুড়ো বিচিত্র এক ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে রয়েছে। হাত দুটোর ওপর অদ্ভুতভাবে হাত দুটো রেখে অবর্ণনীয় এক ভঙ্গিতে, চোখের তারায়ও অদ্ভুত ছাপ এঁকে একটা কাগজের দিকে অপলক চোখে তাকিয়ে রয়েছে।
আমি ঘাড় ঘুরিয়ে কাগজটার দিকে তাকালাম। অনুসন্ধিৎসু চোখে সেটাকে দেখে নিয়ে আমি অনুমান করলাম, সেটা মোটেই একটা সাধারণ কাগজ নয়, একটা নিয়োগপত্র। আর তার গায়ে রাজার স্বাক্ষরটাও আমার নজর এড়াল না।
আমি আরও লক্ষ্য করলাম, খোলের মধ্যে যে বিচিত্র আর অদ্ভুত চরিত্রের বুড়োটাকে অনবরত বক বক করতে দেখেছিলাম, এ বুড়োটারও সর্বক্ষণ ঠোঁট নেড়েই চলেছে। অনুচ্চ কণ্ঠে, একেবারেই অস্ফুট স্বরে কি যেন বলছে। কেবলমাত্র অবোধ্য বিদেশি ভাষায়ই নয়, বড়ই বিরক্তির সঙ্গে নে কথাগুলো বলছে। আরও আশ্চর্য হলাম, যখন আমার মধ্যে ভাবনার উদয় হলো, বুড়ো নাবিকটা আমার কাছাকাছি আর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে কথা বলছে আর আমার মনে হচ্ছে, যেন এক মাইল দূর থেকে বাতাসবাহিত হয়ে আমার কানে পৌঁছাচ্ছে। এমন একটা অভাবনীয় ব্যাপার নজরে পড়লে কার মধ্যে না বিস্ময়ের সঞ্চার ঘটে। আমি অপলক চোখে তাকিয়ে তার কাণ্ডকারখানা দেখতে লাগলাম।
ভালোভাবে লক্ষ্য করে নিঃসন্দেহ হলাম, জাহাজটার নির্মাণ পদ্ধতি তো বটেই এমন জাহাজের ভেতরে যেসব জিনিসপত্র ইতস্তত ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে, সবকিছুর গায়েই প্রাচীনত্বের ছাপ সুস্পষ্ট। আর নাবিকদের কথা নাই বললাম। আমার চারদিকে যারা অপেক্ষা করছে, এদিক-ওদিকে চক্কর মেরে চলেছে, তারা প্রত্যেকেই যেন বহু শতাব্দীর প্রেতাত্মা–প্রেত-ছায়ার মতো। আর তাদের চোখে-মুখে প্রকাশ পাচ্ছে সাগ্রহ আর অস্বস্তি। মশালের জোড়ালো আলোকচ্ছটায় তারা যখন আমার সামনে পথ আগলে পাশাপাশি দাঁড়ায়, সে মুহূর্তে আমার ভেতরে যে ভাবের সঞ্চার ঘটে, আমি
