আমি আবারও অনুসন্ধিৎসু নজরে জাহাজটার পরীক্ষা-নিরীক্ষার কাজে মেতে গেলাম। সবকিছু খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে লাগলাম। নতুন করে পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে একেবারে হঠাৎই আমার মনের কোণে পূর্ব পরিচয়ের একটা অনুভূতি উঁকি দিল। আর সে অত্যাশ্চর্য অভাবনীয় অস্পষ্ট স্মৃতির সর্বদা প্রতিটা মুহূর্তই মিশে রয়েছে বিদেশের প্রাচীন ইতিকথা, বহুদিন আগেকার বর্ণনাহীন, ব্যাখ্যার অতীত স্মৃতি। আগেই তো বলে রেখেছি, সে স্মৃতি খুবই অস্পষ্ট, ঝাপসা, ঠিক যেন কুয়াশার মোড়কে আটকাপড়া।
আমি ঘাড় ঘুরিয়ে জাহাজটার কাঠের দিকে তাকালাম। সাধ্যমত খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে লাগলাম কোন্ কাঠ দিয়ে জাহাজটাকে তৈরি করা হয়েছে। কিন্তু বহু চেষ্টা করেও তা আবিষ্কার করা নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারলাম না। আসলে এ কাঠ আমার একেবারেই অপরিচিত। এ ধরনের কাঠ আগে কোনোদিন দেখেছি বলেও মনে হলো না। কাঠটাকে দীর্ঘসময় ধরে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে তার এমন একটা বৈশিষ্ট্য আমার চোখে ধরা পড়ল যে, সেটা জাহাজে ব্যবহারের একেবারেই অনুপযুক্ত। কেন? এমন দৃঢ়তার সঙ্গে কথাটা কেন বলছি, তাই না? সমুদ্রের লোণা পানির সংস্পর্শে দিনের পর দিন, বছরের পর বছর থাকায় কীটের দ্বারা আক্রান্ত হওয়া, বয়সের ভারে সহজেই জীর্ণ হয়ে পড়া ছাড়াও কাঠটার গায়ে অগণিত ছিদ্রের সৃষ্টি হওয়ার কথাই আমি বলতে চাচ্ছি। আবার এমন প্রশ্নও কারো না কারো মনে জাগতেই পারে। এ ব্যাপারটা নিয়ে আমার মধ্যে এমন কৌতূহলের উদ্রেক হলো কেন? তবে আমি স্বীকার করে নিচ্ছি, আমার কাজ ও কথার মধ্যে কৌতূহলের গন্ধ আছে ঠিকই। তবে জাহাজটায় ব্যবহৃত কাঠের মধ্যে স্পেনীয় ওক কাঠের যা-কিছু বৈশিষ্ট্য থাকা দরকার সবই বর্তমান। স্পেনীয় ওক কাঠকে যদি অস্বাভাবিক, একেবারেই অভাবনীয় উপায়ে সম্প্রসারিত করা যায়, তবে আমার আর কিছুই বলার নেই। বক্তব্যটা যদি যুক্তিগ্রাহ হয় তবে মেনে না নিয়ে উপায়ই বা কি?
এ বক্তব্যটুকু পড়তে পড়তে আমার স্মৃতির পটে ভেসে উঠছে এমন এক বুড়ো ওলন্দাজ নাবিকের কথা–যে জীবনে বহুবার ঝড় ঝঞ্ঝার মোকাবেলা করেছে। হ্যাঁ, তার বক্তব্যটা বার বারই আমার মনে পড়তে লাগল।
বুড়ো ওলন্দাজ নাবিকটার কথায় তিলমাত্র সন্দেহ প্রকাশ করলেই সে মুখ না। খুলে পারত না। সে সঙ্গে সঙ্গে মন্তব্য করত–দেখ হে, সমুদ্রের বুকে জাহাজে চেপে ভাসমান কোনো নাবিকের দেহটা যেমন ক্রমে বেড়েই চলে, ঠিক একই রকমভাবে জাহাজটার দেহটাও ক্রমাগত বেড়েই চলে। তার পরই সে আবার বলে উঠত তেমন একটা সমুদ্রের অস্তিত্বও যে সত্যি সত্যি রয়েছে টা যেমন সত্যি আমার বক্তব্যটাও ঠিক তেমনি সম্পূর্ণ নিশ্চিত। কথাটা রীতিমত দৃঢ়তার সঙ্গেই বুড়ো ওলন্দাজ নাবিকটা বলত।
আমি ঘণ্টা খানেক আগে সেখান থেকে উঠে এসেছি। ওপারে, এক ধারে দাঁড়িয়ে তাকিতুকি করতে লাগলাম। আসলে আমি সুযোগের প্রতীক্ষায় রয়েছি, কিভাবে নাবিকদের সঙ্গে ভিড়ে যাওয়া যায়। শেষপর্যন্ত করলামও তাই। সুযোগ বুঝে একদল নাবিকের দলে ভিড়ে গেলাম। এমন আচরণ করতে লাগলাম, আমি যেন তাদেরই একজন। আর তারাও যেন আমার উপস্থিতির কথা বুঝেও বুঝল না।
আমি সুযোগ বুঝে নাবিকদের দলের একেবারে মাঝে চলে গেলাম। তাদের দলের মাঝে অবস্থান করেও আমার যেন মনে হলো আমার উপস্থিতি সম্বন্ধে তারা পুরোপুরি উদাসিন। আমার দিকে কারো তিলমাত্র লক্ষ্যও নেই।
আমি জাহাজটার খোলের মধ্যে অবস্থানকালে যে বুড়োটাকে থপ থপ করে ধীর মন্থর গতিতে হাঁটাচলা করতে দেখেছিলাম, আমার চারদিকের মানুষগুলোও যেন তারই মতো অতিবৃদ্ধ, জরার ভারে জীর্ণ। বার্ধক্য তাদের হাঁটুর জোর গ্রাস করে ফেলেছে, খুবই দুর্বল। আর এরই ফলে তাদের হাঁটু তিরতির করে অনবরত কেঁপেই চলেছে। আর জরার ভারে তাদের সবার কাঁধই সামনের দিকে ঝুঁকে পড়েছে। গায়ের ঢিলে হয়ে-পড়া শুকনো চামড়া দমকা বাতাসে কাঁপছে, কণ্ঠস্বর। কাঁপা কাঁপা কথাগুলো এমনই দুর্বোধ্য যে, তাদের একটা বর্ণও বোঝার উপায় নেই। আর এরই ফলে বুড়ো নাবিকগুলো নিজেদের মধ্যে যে সব কথা বলাবলি করছে, তার কিছুই আমার বোধগম্য হলো না। আর এও আমার নজরে পড়ল তাদের চোখের কোণগুলিতে বার্ধক্যজনিত পিচুটি ভিড় করে রয়েছে। আর এরই ফলে তারা পিটপিট করে তাকাচ্ছে আর চোখ দুটো চকচক করছে। আর তাদের মাথায় শনটাপের মতো সাদা পাকা চুলের গোছা। বাতাসে সেগুলো অনবরত উড়ছে। হঠাৎ করে দেখলে মনে হয় তাদের মাথায় যেন পাকা চুলের ঢেউ বয়ে চলেছে।
বুড়ো নাবিকগুলোর চারদিকে, ডেকের এখানে ওখানে–সর্বত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে রয়েছে গণিতশাস্ত্রে ব্যবহৃত অদ্ভুত আকৃতিবিশিষ্ট অপ্রচলিত বহু যন্ত্রপাতি। তাদের আকৃতি প্রকৃতি যে কী অদ্ভুত প্রকৃতির তা বলে শেষ করা যাবে না।
একটু আগেই তো এক বাঁকা-পাল অর্থাৎ বেঁকে-থাকা পালের কথা বলেছি, তাই না? সেই তখন থেকেই ভেঙে যাওয়া জাহাজটা একপাশে হেলেপড়ে প্রায় বাতাসের মতো তীব্র বেগে দক্ষিণ দিকে ধেয়ে চলেছে–অনবরত ছুটেছে তো ছুটেছেই। পা ঠিকঠাক রেখে দাঁড়িয়ে থাকাই সমস্যা হয়ে পড়েছে। কোনোরকম নিজেকে সামলে সুমলে জাহাজটার ডেকে পৌঁছতে পেরেছি। তবে এও ঠিক আমি জাহাজটার নাবিকদের কোনোরকম সমস্যায় ফেলেছি বলে মনে হলো না। সে মুহূর্তে একটা কথা আমার বারবার মনে হতে লাগল; আমরা এতগুলো প্রাণী যে উত্তাল উদ্দাম সমুদ্রের অতল গহ্বরে চিরদিনের মতো তলিয়ে যাইনি, এটাই তো একটা একেবারেই অলৌকিক ব্যাপার। অলৌকিক ব্যাপার ছাড়া একে আর কী-ই বা আখ্যা দেওয়া যেতে পারে? অতএব আমরা তো পুরোপুরি নিঃসন্দেহ যে, সমুদ্রের অতলে চিরদিনের মতো সলিলসমাধির পরিবর্তে অনাদি অনন্তকাল ধরে সফেন সমুদ্রের বুকে ঢেউয়ের তালে তালে চক্কর মেরে বেড়ানোই আমাদের বরাতে আছে।
