যেভাবে তৈরি হয়েছে তাতে শেষ সম্ভাবনার ব্যাপারটাকে মনের কোণে স্থান দেওয়াই রীতিমত পাপের বোঝা মাথায় নেওয়া ছাড়া কিছু নয়। হ্যাঁ, নির্দিধায় স্বীকার করে নিচ্ছি, আমার মনোভাবের ব্যাপারে আমি কোন দিনই সন্তুষ্ট হব না, এক মুহূর্তের জন্যও না। আমি নিশ্চিত কোনোদিনই সন্তুষ্ট হব না। আবার সে ধারণাগুলো যে নিশ্চিত নয়, তাতেও অবাক হবার কিছু নয়। অবাক হবার সামান্যতম কারণই থাকতে পারে না। কেন? কারণ তাদের উৎস যেখানেনিহিত সেগুলোও একেবারেই অভূতপূর্ব, সম্পূর্ণ অভাবনীয়ও বটে। সম্পূর্ণ নতুন একটা ইন্দ্রিয় যেন আমার আত্মার সঙ্গে মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে। যুক্ত হয়েছে নতুন একটা সত্ত্বা। সত্যি আমার সে অনুভূতিটা ব্যাখ্যার অতীতই বটে।
দুই-একদিন বা দুই-এক বছরের কথা নয়, বহু দিন আগের কথা, যেদিন এ। ভয়ঙ্কর জাহাজটায় আমি প্রথম পা দিয়েছিলাম। আমার ভাগ্যরেখা ক্রমে স্লান হতে। হতে একটা বিন্দুতে এসে মিরিত হয়েছে। মানুষগুলোর হাবভাব কিছুই বুঝার উপায় নেই। একেবারেই দুর্বোধ্য। কী যে গভীর ভাবনায় হাবুডুবু খেতে খেতে সবাই আমার ধার দিয়ে চলে যেতে লাগল, তার মাথামুণ্ড কিছু আমি অনুমানও করতে পারলাম না। কাঠের বোর্ডটার ফাঁক দিয়ে উঁকিঝুঁকি মেরে আমি তাদের চলাফেরার ওপর সতর্ক দৃষ্টি রাখতে লাগলাম। কিন্তু এ-পর্যন্তই। তাদের সম্বন্ধে এক তিলও ধারণা করতে পারলাম না। আমি তাদের গতিবিধির ওপর সাধ্যমত নজর রাখতে পারলেও তারা কেউই কিন্তু আমাকে দেখতে পায় না।
এবার আমি বুঝতে পারলাম, ডেকের মধ্যে, কাঠের স্কুপের অন্ধকার গহ্বরে এভাবে ঘাপটি মেরে বসে থাকাটা বোকামি ছাড়া কিছুই নয়। হ্যাঁ, বোকামি তো অবশ্যই। কারণ, আমি এখানে এভাবে থাকলে এরা তো আমার দিকে ফিরেও তাকাবে না। এই তো সবেই গেট পেরিয়ে সবার চোখের সামনে দিয়েই ডেকে নেমে এসেছি। তা ছাড়া বেশিক্ষণ আগে নয়, এই তো আমি মনকে শক্ত করে বেঁধে, বুকে সাহস সঞ্চয় করে গুটি গুটি ক্যাপ্টেনের নিজস্ব কেবিনে ঢুকি, আর তার টেবিল থেকে লেখার জন্য কাগজ-কলম প্রভৃতি নিয়ে ফিরে আসি।
আমি দিনপঞ্জি লিখতে আরম্ভ করলাম। মনস্থ করলাম, মাঝে মাঝে একটু ফুরসৎ পেলেই এ দিনপঞ্জি লেখার কাজ চালিয়ে যাব, তবে আমি এ ব্যাপারে নিঃসন্দেহ যে, আমার এ লখা অন্ধকার ডেকের বাইরে জগতে কারো কাছে পাঠাবার সুযোগ কোনোদিনই পাব না। তা সত্ত্বেও আমি মনস্থির করে ফেললাম, দিনপঞ্জি লেখার কাজ আমি বন্ধ করব না, চালিয়েই যাব। তবে কেনই বা এ পণ্ডশ্রম তাই না? শেষমেশ আমার দিনপঞ্জির পাণ্ডুলিপিটাকে একটা বোতলের মধ্যে ভরে, ভালোভাবে ছিপি এঁটে সমুদ্রের বুকে ভাসিয়ে দেব। সমুদ্রের বুকে ভাসতে ভাসতে সেটা কোনো-না কোনোদিন, কারো না কারো হাতে তো পড়বেই। যাকগে, সে চিন্তা করে আজ ফয়দাই বা কি? পাণ্ডুলিপিটার গতি যা হয় হবে।
৩
একদিন আমার মনে একটা নতুনতর ভাবনার উদয় হলো। আসলে নতুন একটা ঘটনা ঘটার ফলেই আমার মনে ভাবনাটা জাগল। তবে কি এসবই অনিয়ন্ত্রিত আকস্মিকতার ফল, আকস্মিকতার পরিণতি?
সেদিন মনে জোর করে সাহস সঞ্চয় করে সে প্রায়ান্ধকার গহ্বর থেকে বেরিয়ে গুটি গুটি ডেকের ওপরে উঠে যাই। পা টিপে টিপে এগিয়ে সবার চোখের আড়ালে ডিঙির তলদেশে জমিয়ে রাখা পুরনো ছেঁড়াফাটা পাল আর মইয়ের দড়ির ভ্রুপের ওপর নেমে দাঁড়ালাম।
পাল আর দড়িদড়ার ওপরে দাঁড়িয়ে নিজের অদৃষ্ট বিড়ম্বনার কথা ভাবতে ভাবতে অন্যমনস্কভাবে পাশের একটা পিপের গায়ে হাত বুলতে লাগলাম। তারপর অন্যমনষ্কভাবেই পিপেটার ওপরে রাখা ছোট পালটার গায়ে আলকাতরার বুরুশটা টানতে লাগলাম। পালটা জাহাজের ওপর কাৎ হয়ে অবস্থান করছে। ফলে অন্যমনষ্ক ও উদ্দেশ্যহীনভাবে চালানো বুরুশটার ঘষায় সেটার মুখে একটা শব্দ স্পষ্ট হয়ে উঠল। কি সে বিশেষ শব্দটা? আবিষ্কার। শব্দটা আমি স্পষ্ট পড়তে পারলাম।
আবিষ্কার শব্দটা আমার মনে বিশেষ প্রভাব বিস্তার করল। আমি এবার ঘাড় ঘুরিয়ে, দৃষ্টি ফিরিয়ে জাহাজটার গঠন প্রকৃতি দেখার দিকে মন দিলাম।
আমি অনুসন্ধিৎসু দৃষ্টিতে দীর্ঘসময় ধরে দেখে লক্ষ্য করলাম, জাহাজটা অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত। তবে আরও ভালোভাবে লক্ষ্য করে মনে হলো অস্ত্রশস্ত্র সাজানো থাকলেও এটা যুদ্ধজাহাজ নয়। কারণ, তার দড়িদাঁড়া, গঠন প্রকৃতি আর সাধারণ ব্যবস্থাদি দেখে সেটাকে যুদ্ধজাহাজ মনে করতে উৎসাহ পাওয়া গেল না। আর এটা যে কি নয়। তা অচিরেই বুঝে নিলাম। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এটা যে কি–ও বলা সম্ভব নয়। আসলে জাহাজটা সম্বন্ধে নিশ্চিত কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া আমার পক্ষে একেবারেই অসম্ভব ব্যাপার হয়ে দাঁড়াল।
জাহাজটা, এটা যে আসলে কি তা আমার জানা নেই। দীর্ঘসময় ধরে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখেও সেটা সম্বন্ধে আমি নিশ্চিত কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারলাম না। আসলে এর মডেলটাই অদ্ভুত। আর মাস্তুল? এর গঠন প্রকৃতিও খুবই বিচিত্র। আমাদের জাহাটারই কেবল নয়, অন্য কোনো জাহাজের মাস্তুলের গড়নও এরকম অদ্ভুত নয়। আর গলুইও সাদামাটা, পিছন দিকটাও একেবারেই সাধারণ আগেকার। দিনে জাহাজের পিছন দিকটা যে আকৃতি বিশিষ্ট করা হতো ঠিক সে রকম করেই তৈরি।
