এই তো গেল আমার অবস্থা। আর আমার ভাই পিছন দিককার গলুইয়ের ওপরের খালি একটা পিপা দুহাতে শক্ত করে ধরে দাঁড়িয়ে রইল। এরকম চরম মুহূর্তে তার আর করারও তো কিছুই ছিল না।
যে গহ্বরটার একেবারে কোণার দিকে সে এগোতে লাগল। সেখানে পৌঁছে। যাবার পূর্ব মুহূর্তেই সে বলয়টাকে ছেড়ে দিল। এবার সে হঠাৎই পিপেটাকে ছেড়ে দিয়ে বলয়টার দিকে হাত বাড়িয়ে দিল। তখন তার মধ্যে আতঙ্ক এমন চরমে উঠে গেল যে, আমার হাত দুটোকে সরিয়ে দেবার জন্য মরিয়া হয়ে চেষ্টা চালাতে লাগল যাতে বলয়টাকে আঁকড়ে ধরা যায়। কিন্তু দুজনের ধরার মতো জায়গা না থাকায় তা সম্ভব হচ্ছিল না।
আমার তো আর জানতে বা বুঝতে অসুবিধা হলো না যে, আমি পাগলই হয়ে গেছি। তা সত্ত্বেও তাকে এ কাজটা করার জন্য অত্র আগ্রহান্বিত দেখে আমার মনটা যে দুঃখে কী পরিমাণ বিষিয়ে উঠল, তা বুঝিয়ে বলা আমার পক্ষে সম্ভবই নয়।
আমি বলয়টা ছেড়ে দিয়ে তাকে ধরার সুযোগ করে দিলাম। আর নিজে চলে গেলাম পিছনের গলুইটার কাছে। সেখানে গিয়ে পিপেটার কাছে গুটিসুটি মেরে বসার চেষ্টা করলাম। গোছগাছ করে কোনোরকমে বসামাত্রই জাহাজটা হঠাৎ দক্ষিণ দিকে হেলে পড়ল। ব্যস, আমরা উভয়েই গহ্বরটার ভেতরে ছিটকে পড়ে গেলাম।
মুহূর্তের মধ্যে মাত্র একবার পরমপিতাকে স্মরণ করলাম। আমাদের সবকিছু শেষ হয়ে গেছে, বুঝতে পারলাম। ভয়ানক দ্রুতগতিতে অবতরণ করার সময়ও আমি পিপেটাকে ছাড়লাম না, বরং অধিকতর দৃঢ়ভাবে সেটাকে আঁকড়ে ধরে চোখ দুটো বন্ধ করে ফেলি।
আমি চোখ দুটো বন্ধ করেই রাখলাম। কয়েক সেকেন্ড চোখ খুলে তাকানোর সাহসই হলো না। তখন তো যে কোনো মুহূর্তে পরলোকে পাড়ি জমাতে পারি এরকম আশঙ্কা বুকে স্থায়ী আসন পেতেই রয়েছে। মৃত্যুশিয়রে তবুও বুঝতে পারলাম, সমুদ্রের পানির সঙ্গে মরণ লড়াই এখনও পুরোপুরি আরম্ভই হয়নি।
একের পর এক মুহূর্ত পেরিয়ে যেতে লাগল। আমার দেহে কিন্তু তখনও প্রাণের অস্তিত্ব অব্যাহত রয়েছে, আমি জীবিতই রয়েছি।
নিচে নামার চেতনাটা বন্ধ হয়ে গেছে।
আমাদের জাহাজটা তখনও ফেনার বৃত্তটার মধ্যেই অবস্থান করছে। আর তার গতিবেগের কোনো পরিবর্তন হয়নি। প্রায় আগের মতোই অব্যাহত রয়েছে।
বুকে সাহস সঞ্চয় করলাম। সাহস করে চোখ দুটো ধীরে ধীরে মেলোম।
সে যে কী অবর্ণনীয় ভয়, জমাটবাধা আতঙ্ক আর অব্যক্ত বিস্ময়ের অনুভূতি আমার মন-প্রাণ আচ্ছন্ন করে ফেলল, তা আমি শত চেষ্টা করেও কোনোদিনই মন থেকে মুছে ফেলতে পারব না।
অতিকায় পরিধি এবং অন্তহীন গভীরতা বিশিষ্ট গহ্বরটার ভেতরের দেওয়ালের ঠিক মধ্যস্থলের একটা জায়গায় জাহাজটা যেন ভোজবাজির খোলের মতো লটকে রয়েছে।
আর সে গহ্বরটার তেলতেলে গা-টাকে আবলুস কাঠ বলে ভ্রম হওয়া কিছু মাত্রও অস্বাভাবিক নয়, কিন্তু সেটাকে যেমন দ্রুতগতিতে অনবরত চক্কর খেতে দেখলাম, আর মেঘের বৃত্তাকার ফাঁক ফোকড় দিয়ে থালার মতো গোলাকার কিরণচ্ছটা যেভাবে তার ওপর পড়তে লাগল তাতে আমার ধারণা হলো গহ্বরটার মসৃণ ও কালো দেওয়ালের সঙ্গে লম্বাভাবে সোনালি রঙের জলস্রোত গহ্বরটার একেবারে অন্তিম তলদেশ পর্যন্ত প্রবাহিত হয়েছে। সে যে কী স্রোত তার বিবরণ আর না-ই বা দিলাম।
আসলে আকস্মিক পরিস্থিতিটার মুখোমুখি হয়ে আমি এতই ঘাবড়ে গিয়েছিলাম যে, কিছুই নিবিষ্টভাবে লক্ষ করতে পারিনি। আসলে লক্ষ্য করার মতো মানসিক পরিস্থিতি আদৌ আমার ছিল না।
সাহসে ভর করে যখন চোখ দুটো খুলেছিলাম তখন কেবলমাত্র গহ্বরটার বুক কাঁপানো ভয়ঙ্কর অতিকায়ত্বটাকেই দেখেছিলাম।
বুকে সাহস সঞ্চয় করে কিছুটা প্রকৃতিস্থ হবার পর স্বাভাবিকভাবেই নিচের দিকে আমার দৃষ্টি নিবদ্ধ হলো।
বৃত্তাকার গর্তটা দিয়ে গহ্বরটার ভেতরে যেটুকু অদের অত্যুজ্বল আলো ঢুকতে লাগল তাতে আমার মধ্যে এটুকু ধারণাই হলো তা বুঝি গহ্বরটার একেবারে তলদেশ পর্যন্ত গিয়ে থমকে গেছে।
কিন্তু কুয়াশা এমন জমাটবেঁধে বসেছে যার ফলে সবকিছুর ওপর যেন একটা পুরু আস্তরণ সৃষ্টি করেছে। আর এরই ফলে সবকিছু পরিষ্কারভাবে দেখা সম্ভব হলো না। তার সে জমাটবাধা কুয়াশার আস্তরণটার ওপর অতিকায় একটা রামধনুকে লটকে থাকতে দেখলাম। মুসলমান সম্প্রদায়ের মানুষরা সরু আর প্রায় ভেঙে পড়া সেতুটাকে মহাকাল আর অনন্তকালের মধ্যে একমাত্র পথ আখ্যা দিয়ে থাকেন, এটা প্রায় সেরকমই দেখতে।
এবার সে ভয়ঙ্কর পরিস্থিতিটা সম্বন্ধে আরও কয়েটা কথা বলছি। সে ফেণার রাজ্য থেকে আমরা যখন প্রথম গর্তটার মধ্যে হুড়মুড় করে পড়েছিলাম তখন আকস্মিক একটা টান চাপের ফলে চো-চো করে অনেকখানি তলায় চলে গিয়েছিলাম। তার পরই গতির সে দ্রুততা আর রইল না। ফলে তখন আমাদের গতি অনেকটা মন্থর হয়ে যায়। ধীরে ধীরে নিচে নামতে থাকি। তবে একেবারে সরাসরি নয়, চারদিকে হরদম ঘুরতে ঘুরতে নামলাম। কখনও নামি কয়েকশো গজ, আবার গহ্বরটার পুরো একটা পাক খেয়ে নেমে চললাম।
গহ্বরটার ভেতরে তলিয়ে যেতে যেতেই লক্ষ্য করলাম, সে ঘূর্ণিপাকে কেবলমাত্র আমাদের জাহাজটাই যে আটকা পড়েছে তাই নয়। আমাদের ওপরেও নিচে-সর্বত্র জাহাজটার ছোট বড় অংশ, আসবাবপত্রের টুকরো, কিছু অতিকায় কাঠের গুঁড়ি, ছোট বড় বহু সামগ্রি, বাক্সের ভাঙা অংশ, লোহার পাত, পিপে আর চোঙের মতো কিছু বস্তু প্রভৃতি ভাসতে দেখতে পেলাম।
