জাহাজের সবাই কাজে ব্যস্ত, সবারই লক্ষ্য জাহাজটা যাতে আবার নিরাপদে নির্দিষ্ট লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে যেতে পারে। আমি শিকারি বিড়ালের মতো পা টিপে টিপে, খুবই সতর্কতার সঙ্গে এগিয়ে সবার নজরের আড়ালে আধ-বোজা দরজাটা দিয়ে সোজা ভেতরে ঢুকে গেলাম।
আমি থামলাম না। চারদিকে সতর্ক দৃষ্টি রেখে এগিয়েই চললাম। সে মুহূর্তে আমার একমাত্র লক্ষ্য জাহাজটার কোনো এক স্থানে আশ্রয় নেওয়া যাতে আমার খোঁজ কেউ না পায়।
আমি এক-পা দু-পা করে এগোতে এগোতে একটা সিঁড়ির কাছে গিয়ে থমকে দাঁড়িয়ে পড়লাম। আমার বুঝতে দেরি হলো না, সিঁড়িটা জাহাজের খোলে নামার কাজে ব্যবহার করা হয়। ব্যস, মুহূর্তমাত্র সময় নষ্ট না করে আমি সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতে শুরু করলাম। অচিরেই আমি জাহাজের খোলে, নিরাপদ আশ্রয়ে পৌঁছে। গেলাম। অন্ধকারে খোলের ভেতরে আমি ঘাপটি মেরে বসে রইলাম।
কিন্তু কেন যে আমি সবার অলক্ষ্যে জাহাজটার অন্ধকার খোলের মধ্যে আশ্রয় নিলাম তা আমার পক্ষে বলা শক্ত। তবে এটা হতে পারে বটে, প্রথম দর্শনে জাহাজের মাঝিমাল্লাদের ভয়ে আমি অনিশ্চিত বিপদাশঙ্কায় মুষড়ে পড়ি। আর সে ভয়বশতই আমি তড়িঘড়ি আত্মগোপনের সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হই। আর করিও তাই। আর প্রথম দর্শনেই আমি যে অজানা অচেনা যে নতুনত্বের সম্মুখীন হই তাতেই আমার মধ্যে সন্দেহ ও আতঙ্ক মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। আর তখন তাদের চেহারা ছবি আর আচরণে যেসব লক্ষণ আমার নব জরে পড়ে তা থেকেই আমার অন্তরের অন্তঃস্থলে ভয় হঠাৎই জমাট বেঁধে যায়। আর এরই ফলে হয়তো বা আমার পক্ষে তাদের ওপর আস্থা রাখা, ভরসা করা সম্ভব হয়নি। তাই ঝট করে আত্মগোপন করার সিদ্ধান্তকে আমি গ্রহণ না করে পারিনি। শেষপর্যন্ত করলামও তাই। আর জাহাজের অন্ধকার খোলটা ছাড়া আত্মগোপন করার মতো ভালো জায়গা কোথায় বা আছে।
হ্যাঁ, জাহাজটার খোলের ভেতরেই আমি আশ্রয় নিলাম। সেখানে বোর্ডের একটা ছোট টুকরো ধীরে ধীরে সরিয়ে ফেলতেই কয়েকটা বড়সড় কাঠের টুকরো পেয়ে গেলাম। তাদের মাঝখানে লুকিয়ে-থাকার মতো চমৎকার একটা জায়গা নজরে পড়ল। বুঝলাম, জায়গাটা আশ্রয় নেবার উপযুক্তই বটে। ব্যস, চোখের পলকে সে ফাঁকটার মধ্যে নিজেকে সিধিয়ে দিয়ে ঘাপটি মেরে বসে রইলাম।
তখন সবে কাজটা সেরেছি। ঠিক সে মুহূর্তেই কার যেন কাটামারা বুটের খট খট শব্দ কানে এলো। চোখের পলকে আবার কাঠের বোর্ডটাকে বসিয়ে দিলাম। ব্যস, নিরাপদ। বলা তো যায় না, কোন হাঙ্গামায় জড়িয়ে পড়ে নাস্তানাবুদ হতে হয়, জীবন সংশয় হওয়াও কিছুমাত্র বিচিত্র নয়।
মিনিট খানেকের মধ্যেই একটা অস্থির দুর্বল পদধ্বনি আমার দিকে এগিয়ে এসে আবার দূরে সরে যেতে লাগল। অল্পক্ষণের মধ্যেই সেটা দূরে সরে যেতে যেতে এক সময় একেবারে মিলিয়ে গেল।
আমি সে লোকটার মুখটা দেখতে পাইনি সত্য, কিন্তু তার চেহারাটা ঠিকই আমার নজরে পড়ল। এবার বুঝতে পারলাম, কেন তার পদধ্বনি অস্থির হলেও এমন দুর্বল মনে হচ্ছিল। লোকটা বৃদ্ধ, একেবারেই জরাগ্রস্ত। বয়সের ভারে পা দুটো তার দেহটাকে যথাযথভাবে বইতে পারছে না। তাই দুর্বল পা দুটো কোনোরকমে টেনে টেনে তার দেহটাকে এগিয়ে নিয়ে চলেছে। হাঁটু অনবরত কেঁপেই চলেছে আর নুয়ে পড়া দেহটা এদিক-ওদিক টলছে। আর একটা ব্যাপার লক্ষ্য করলাম, বুড়োটা অবোধ্য ভাষায় আপন মনে বিড়বিড় করে কি যেন বলছে। যাকে বলে আপন মনে বকবক করা। আমি উৎকর্ণ হয়ে লক্ষ্য করলেও তার কথার একটা বর্ণও বুঝতে পারলাম না।
বুড়োটা ধীরপায়ে থপ থপ করতে করতে আরও খানিকটা এগিয়ে জাহাজটার খোলের একেবারে কোণে চলে গেল। আমি কাঠের বোর্ডটার ফাঁক দিয়ে তার গতিবিধির ওপর সতর্ক দৃষ্টি রাখতে লাগলাম।
অচিরেই আমার নজরে পড়ল, বুড়োটা সে কোণটায় পড়ে-থাকা বিচিত্র যন্ত্রপাতি, ভাঙাচোরা লোহা লক্কর আর জাহাজ চালানোর জীর্ণ মানচিত্রের পাঁজার মধ্যে কি যেন হণ্যে হয়ে খোঁজাখুঁজি করছে। কি যে সে খুঁজছে জানার কথা নয়, আর সে মুহূর্তে আমার জানার আগ্রহও তেমন ছিল না। তবে সবচেয়ে বেশি করে যা আমার নজরে পড়ল তা হচ্ছে, তার আচরণে শৈশবের দুরন্তপনার দিনগুলোর খিটখিটে মেজাজ প্রকাশ পাচ্ছে। আর এও লক্ষ্য করলাম, শিশুসূলভ খিটখিটে মেজাজের সঙ্গে দেবতাদের গাম্ভীর্য ও শান্ত-সৌম্য প্রকৃতি ও মর্যাদাবোধের অদ্ভুত সংমিশ্রণ ঘটেছে।
বুড়োটা এতক্ষণ হণ্যে হয়ে খোঁজাখুঁজি করল, সে বাঞ্ছিত বস্তুটা পেল কি না বুঝতে পারলাম না। তবে একটু পরেই লক্ষ্য করলাম, সে আগের মতোই ধীর-মন্থর গতিতে থপ থপ করতে করতে চলে গেল। কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই সে আমার নজরের বাইরে চলে গেল। ব্যস, তাকে আর দেখা গেল না। আবার আমি প্রায়ান্ধকার ডেকের মধ্যে নিরবচ্ছিন্ন উৎকণ্ঠার মধ্যে প্রতিটা মুহূর্ত কাটাতে লাগলাম।
২
আমি অজানা এক অনুভূতির শিকার হয়ে পড়লাম। সে অনুভূতিটা যে কি তার কথা কাউকে বুঝিয়ে বলা তো দূরের ব্যাপার, কারো মধ্যে সামান্যতম ধারণা সঞ্চার করাও সম্ভব নয়। অতীতের শিক্ষাদীক্ষা বা অভিজ্ঞতা সে ক্ষেত্রে একেবারেই অকেজো, সম্পূর্ণ অর্থহীন। আমার কাছে ব্যাপারটা এমন মনে হলো যে, অনাগত ভবিষ্যতেও সে বিশেষ রহস্যটা ভেদ করার জন্য কোনো চাবিকাঠি আমার হাতে তুলে দেবে না। অর্থাৎ রহস্যটা হয়তো চিরদিনই পর্দার আড়ালেই রয়ে যাবে। আর আমার মানসিকতা
