একবার সেভাবে সমুদ্রের পানিতে তলিয়ে যাওয়ামাত্র আমার সহযাত্রীর ভয়ঙ্কর আর্তস্বর বাতাসবাহিত হয়ে রাতের জমাট বাঁধা অন্ধকার ভেদ করে বহুদূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ল।
সে তার মুখটাকে সাধ্যমত আমার কানের কাছে এগিয়ে নিয়ে এসে তীব্রস্বরে আর্তনাদ করে উঠল–শোন! শোন! পরমেশ্বর সর্ব শক্তিমান। শোন! দেখ! দেখ!
আমি উৎকর্ণ হয়ে, অত্যুগ্র আগ্রহান্বিত হয়ে তার কথাগুলো শুনতে লাগলাম।
সে আবারও বলল–দেখ! ওই দেখ!
আমি তার অঙ্গুলি-নির্দেশিত পথে অনুসন্ধিৎস নজরে তাকালাম। আমার নজরে পড়ল, আমরা যেখানে অবস্থান করছি ঠিক সে জায়গাটাতেই সমুদ্রটা দ্বিধা বিভক্ত হয়ে গেছে।
আর এও লক্ষ করলাম যে নিস্পলক চোখে একই দিকে সবিস্ময়ে তাকিয়ে রয়েছে। আমি ঘাড় ঘুরিয়ে আবার তার অঙ্গুলি-নির্দেশিত পথে দৃষ্টি ফেরালাম। লক্ষ্য করলাম–হ্যাঁ, যা ভেবেছি ঠিক তাই। সমুদ্রটা দুভাগে বিভক্ত হয়ে গেছে। আর লাল আলোর একটা অদ্ভুত রেখা তার ফাঁক দিয়ে এগিয়ে আমাদের জাহাজের ডেকের ওপর পড়েছে।
ব্যাপারটা লক্ষ্য করে আমি অবাক না হয়ে পারলাম না, পরমুহূর্তেই ঘাড় ঘুরিয়ে ওপরের দিকে দৃষ্টিপাত করামাত্র যে অভাবনীয়, একেবারেই অপ্রত্যাশিত দৃশ্য আমার চোখের সামনে ভেসে উঠল, তা যে কেবলমাত্র আমাকে অবাকই করল তাই নয়, শরীরের সবটুকু রক্ত হিম হয়ে, জমাটবেঁধে যাবার পক্ষে যথেষ্ট।
আমার বিস্ময়ের ঘোরটুকু কাটতে না কাটতেই দেখতে পেলাম, আমাদের ঠিক মাথার ওপরে, সমুদ্রের উপরিতলে কম হলেও হাজার চারেক টনের অতিকায় একটা জাহাজ ইতস্তত চক্কর মারছে। দৃষ্টি ফেরানো তো দূরের কথা, চোখের পলক পর্যন্ত খোলা আমার পক্ষে সম্ভব হলো না। আপন মনে প্রায় অস্ফুটস্বরে বলে উঠলাম– আরে বাবা!
সমুদ্রের উপরিতলে বললে যথার্থ বলা হবে না। বরং বলা যেতে পারে, সমুদ্র কক্ষ থেকে একশো গুণেরও বেশি উপরে অবস্থান করছে বিশালায়তন জাহাজটা। আবার কেবলমাত্র বিশালায়তন বললেও জাহাজটার আয়তন সম্বন্ধে কারো মধ্যে ধারণা সঞ্চার করা সম্ভব নয়। তবে? বহু উঁচুতে, আকাশচুম্বী ঢেউয়ের মাথায় অবস্থান করলেও জাহাজটার আকার-আয়তন এ পথে যাতায়াতকারী বা প্রচলিত ইস্ট ইন্ডিয়ান-এর যে কোনো জাহাজের চেয়ে অনেকাংশে বড়।
জাহাজটার অতিকায় দেহটার গায়ে গাঢ় কালো রঙের প্রলেপ দেওয়া। আর অন্যান্য সাধারণ জাহাজের মতো এটা কারুকার্যবিশিষ্টও নয়। যাকে বলে একেবারে সাদামাটা তার গড়ন। জাহাজটার গায়ের খোলা ছিদ্রপথগুলো দিয়ে কয়েকটা কামানের ধাতব নল উঁকি দিচ্ছে। শিকল দিয়ে অগণিত মশাল জাহাজটার এখান-ওখান থেকে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে। আর তাদেরই আলো জাহাজের মসৃণ গায়ে প্রতিফলিত হয়ে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছে। এসব তো হচ্ছে মামুলি ব্যাপার। কিন্তু যে ব্যাপারটা প্রত্যক্ষ করার পর আমার চোখ দুটো ছানাবড়া হয়ে যাবার জোগার হলো সে কথা তো এখনও বলাই শুরু করিনি। আর কিভাবেই সে অবিশ্বাস্য, অভাবনীয় ঘটনাটার যথার্থ বর্ণনা দেব, তা-ও আমার পক্ষে কম সমস্যা নয়। তবু বলতে যখন শুরু করেছি তখন যে করেই হোক ব্যাপারটা ব্যক্ত তো করতেই হবে। যে ব্যাপারটা আমাকে যারপরনাই অবাক করল, আতঙ্কে প্রায় কুঁকড়ে দিল, সেটা হচ্ছে–এই উত্তাল উদ্দাম উন্মাদপ্রায়। সমুদ্র আর নিয়ন্ত্রণ বহির্ভূত ভয়ঙ্কর ঝড়ের তাণ্ডবের মধ্যেও একমাত্র পালের ওপর ভর করে জাহাজটা অক্ষত অবস্থায় দিব্যি চলাচল অব্যাহত রেখেছে। এমন একটা আতঙ্ক মিশ্রিত বিস্ময়কর ব্যাপার দেখে অভিভূত না হয়ে পারা যায়?
আমি নিস্পলক চোখে আবছা সে ফাঁকটার দিকে তাকিয়ে রইলাম। সেটা যখন আমার নজরে পড়ল, তখন লক্ষ্য করলাম, ভয়ঙ্কর সে-ফাঁকটা দিয়ে ক্রমে একটা গলুই ভেসে উঠছে। হ্যাঁ, কেবলমাত্র গলুইটাকেই আমি দেখতে পেলাম।
আকাশছোঁয়া ঢেউয়ের মাথায় অবস্থানরত জাহাজটা মুমূর্ষ রোগীর মতো কাঁপতে কাঁপতে এক সময় আচমকা হুড়মুড় করে ভেঙে পড়ল। ব্যস, আর দেরি নয়, দ্রুতবেগে সেটা নিচে নেমে এলো। নিচে, একেবারে সমুদ্রের অশান্ত বুকে।
আমি কিন্তু ভেঙে পড়লাম না। বরং সে চরম মুহূর্তে আমার মধ্যে কী যে অভাবনীয় আত্মসংযম জেগে উঠল তা আমি নিজেই জানি না। আমার তখনকার মানসিক দৃঢ়তা দেখে আমিই বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেলাম।
আমি মুহূর্তের মধ্যে যন্ত্রচালিতের মতো ঝট করে কয়েক পা একধারে সরে গিয়ে নির্ভয়ে আসন্ন ধ্বংসের প্রতীক্ষায় নিশ্চলনিথরভাবে অপেক্ষা করতে লাগলাম। সে চরম মুহূর্তে নিশ্চেষ্টভাবে দাঁড়িয়ে থাকা ছাড়া আমার তো করার কিছু নেই।
আমাদের জাহাজটার সব চেষ্টার অবসান হলো। এবার সেটার চরম ধ্বংসের পালা। শেষপর্যন্ত এক সময় ধীর মন্থর গতিতে হলেও ক্রমে সমুদ্রের অতল গহ্বরের দিকে যাত্রা করল, একটু একটু করে তলিয়ে যেতে লাগল।
আমাদের জাহাজটা তলিয়ে যেতে যেতে এক সময় আমাদের ওপরে অবস্থানরত এবং আগেই তলিয়ে যাওয়া জাহাজটার গায়ে ধাক্কা মারল। ধাক্কাটা বেশ জোরেই লাগে। আর তার অনিবার্য পরিণতি হলো আমি সবেগে ছিটকে গিয়ে পড়লাম হাত কয়েক দূরে। আগেই তলিয়ে যাওয়া জাহাজটার দড়ির গাদার ওপর আমি আছাড় খেয়ে পড়লাম।
আশ্চর্য ব্যাপার! সত্যি বলছি, আমি অবাক না হয়ে পারলাম না। দড়িদড়ার ওপর আমি হুমড়ি খেয়ে পড়তে না পড়তেই আমাকে অবাক করে দিয়ে জাহাজটা বার কয়েক দুলে উঠে আবার তির তির করে চলতে আরম্ভ করল। জাহাজের মাঝিমাল্লারা আনন্দে লাফালাফি শুরু করে দিল। সে কী উল্লাস তাদের! আমি তাদের হৈ হট্টগোলে সুযোগ নিলাম। হৈহুল্লোড়রত মাঝিমাল্লাদের নজর এড়িয়ে দড়িদড়ার সে স্তূপটা থেকে উঠে গুটিগুটি সেখান থেকে সরে পড়লাম।
