গ্রীষ্মমণ্ডলে সমুদ্রের পানিতে যে থেকে থেকে ফসফরাস ঘটিত আলো আমাদের চোখে পড়ে, তা-ও একেবারেই অনুপস্থিত। অন্ধকার সমুদ্রের পানির গায়ে ফসফরাসঘটিত যে আলোর ঝকঝকানি দেখে আমরা অভ্যস্থ, সে আলোর কথা বলছি। তার নাম গন্ধও আমাদের চোখে পড়ছে না। অবাক হবার মতো ব্যাপারই বটে।
ঝড়ের তাণ্ডব আগের মতোই অব্যাহত রইল। ঝড় থামা তো দূরের ব্যাপার তার তীব্রতা এতটুকুও হ্রাস পেল না। আবার এও লক্ষ্য করলাম, সাগরের বুকে বা তীরে ফেণার এতটুকু লেশমাত্রও নেই।
না, আমাদের চরম বিপদ থেকে অব্যাহতি পাবার সামান্যতম আশাও মনে অবশিষ্ট রইল না। হতাশা, হাহাকার আর নিরবচ্ছিন্ন আতঙ্ক আমাদের চারদিক থেকে ঘিরে রাখল। না, এক বর্ণও বানিয়ে বলছি না, নিরবচ্ছিন্ন বিষণ্ণতা, আতঙ্ক আর পোড়া আবলুস কাঠের মরুভূমি ছাড়া আশাব্যঞ্জক কোনো ভাবনা-চিন্তাই আমাদের মনে জাগতে পারল না।
গোদের ওপর বিষফোঁড়ার মতো নতুন একটা ভাবনা, সুইডেনবাসী বুড়োটার অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে উঁকি মারতে লাগল। সর্বনাশা এক আতঙ্ক কুসংস্কারজাত আতঙ্ক। না, কেবলমাত্র তার কথা বললে সত্য গোপন করাই হবে। নীরব বিস্ময়। আমার অন্তরেও ছড়িয়ে পড়তে লাগল। আরও সহজ-সরল ভাষায় বললে, আমিও বিস্ময়-আতঙ্কের শিকার হয়ে পড়লাম।
জাহাজটার পরিস্থিতি সম্বন্ধে ভাবনা চিন্তা করা, জোড়াতালি দিয়ে জাহাজটাকে টিকিয়ে রাখার মতো সামান্যতম আগ্রহও আমাদের মধ্যে রইল না। পিছন দিকের মাস্তুলটার গোড়ায় একেবারে ওটার গা ঘেঁষে আমরা দুটো প্রাণী নীরবে সমুদ্রের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ রেখে পাশাপাশি বসে রইলাম। এ স্থানটাকেই সবচেয়ে নিরাপদ ভেবে আশ্রয় নিলাম।
সময় আমাদের অজ্ঞাত। সময় বুঝবার কোনো উপায়ই নেই। ঘণ্টা মিনিট তো দূরের ব্যাপার, সকাল, দুপুর নাকি বিকেল তাও বুঝা সম্ভব নয়। আর কোথায়ই বা আমরা অবস্থান করছি, সেটাও বুঝতে পারছি না। কী সমস্যায়ই না পড়া গেল!
হ্যাঁ, আমরা এগিয়ে চলেছি। চলেছি তো চলেছিই বটে। তবে একটা ব্যাপার আমাদের কাছে পরিষ্কার, নিঃসন্দেহই বলা যেতে পারে, আমরা দ্রুত সুদূর দক্ষিণের দিকে অগ্রসর হচ্ছি। আর দক্ষিণের যে অঞ্চল দিয়ে আমরা এগিয়ে চলেছি এর আগে কোনো নাবিকের পক্ষে এখানে আসা সম্ভব হয়নি। অথচ অবাক না হয়ে পারলাম না, সেখানকার বরফ আমাদের চলার পথে কোনোরকম প্রতিবন্ধকতা এখনও সৃষ্টি করেনি, আমাদের পথ আগলায়নি।
আমরা দিনের পর দিন, ঘণ্টার পর ঘণ্টা যে অনবরত চলেছি তো চলেছিই প্রতিটি মুহূর্তই মনে হচ্ছে আমাদের জীবনের শেষ মুহূর্ত–চরম শত্রু, চরম আতঙ্কের মতো পর্বত প্রমাণ ঢেউয়ের আঘাতের সম্মুখীন হয়ে মনে হচ্ছে, এই আমাদের জীবনের অন্তিম লগ্ন। চরমতম আতঙ্কের মতো প্রতিটা ঢেউ আমাদের ওপর আছড়ে পড়ছে। ঢেউয়ের প্রতিটা আঘাত এমনই প্রচণ্ড, এমনই ভয়ঙ্কর যে, ইতিপূর্বে কোনোদিন কল্পনাও করতে পারিনি।
তবে একটা ব্যাপার আমাদের আরও বেশি করে অবাক করছে যে, এমন পর্বত প্রমাণ উত্তাল উদ্দাম ঢেউ আমাদের এখনও টিকিয়ে রেখেছে, সলিল সমাধি দিয়ে দেয়নি। হ্যাঁ, ব্যাপারটা কেবল অভাবনীয়ই নয়, অলৌকিক বললেও অত্যুক্তি হবে না।
হ্যাঁ, আমরা অবিশ্বাস্যভাবে বেঁচে আছি, পিতৃদত্ত জীবনটার অস্তিত্ব এখনও পুরো দস্তুরই আছে। আমার মুখ থেকে এরকম উক্তি শুনে আমার সঙ্গি সুইডেনবাসী বুড়োটা আশ্বাস দিয়ে বলল–আমাদের জীবনের আশঙ্কা তেমন নেই বলেই মনে হচ্ছে।
আমি আচমকা ঘাড় তুলে তার মুখের দিকে বিস্ময় মাখানো দৃষ্টিতে তাকালাম।
আমি কিছু বলার আগেই সে আবার মুখ খুলল–হ্যাঁ, আমার ধারণাটা অবিশ্বাস্য মনে হলেও অমূলক নয় বলেই মনে করতে পারেন।
আমি চোখ-মুখের বিস্ময়ের ছাপটুকু অব্যাহত রেখেই বললাম–আপনি কি করে যে এতটা নিশ্চিন্ত হতে পারছেন, কোন্ আশা বা লক্ষণ দেখে এতটা দৃঢ়তার সঙ্গে কথাটা বললেন, কিছুই বুঝতে পারছি না।
ফ্যাকাশে বিবর্ণ মুখায়বে জোর করে ম্লান হাসির রেখা ফুটিয়ে তুলে বুড়োটা এবার বলল–দেখুন, আমার আশ্বস্থ হবার কারণ, ভেঙেচুড়ে আমাদের জাহাজটা এখন খুবই হালকা হয়ে গেছে।
হ্যাঁ, আপনার এ যুক্তিটা অবশ্য সমর্থনযোগ্য বটে।
আরও আছে–
তাকে কথাটা শেষ করতে না দিয়েই আমি বলে উঠলাম–আরও আছে? জাহাজটা টিকে থাকা, আমাদের জীবনের অস্থিত্ব রক্ষা পাওয়ার ব্যাপারে আপনার আর কি যুক্তি, জানতে পারি কী?
আমি বলতে চাইছি, জাহাজটার যন্ত্রপাতি আর গঠন পদ্ধতিও খুবই ভালো। আর এ কারণেই সমুদ্র আর ঝড়ের এত প্রতিকূলতা সত্ত্বেও জাহাজটা নিজে যেমন টিকে আছে, আমাদেরও বাঁচিয়ে রেখেছে।
সুইডেনবাসীর মুখে যুক্তিসঙ্গত আশা ভরসার কথা শুনেও আমি কিন্তু তার মতো নিশ্চিন্ত হতে পারলাম না। আমার হতাশা আর হাহাকার জর্জরিত মনের নৈরাশ্য কিছুতেই কাটিয়ে উঠতে পারলাম না। মৃত্যু অবধারিত।
আমি প্রাণের আশা ছেড়ে দিয়ে আসন্ন মৃত্যুর জন্য নিজেকে তৈরি করতে লাগলাম। কারণ, আমি যে নিঃসন্দেহ, এমন কোনো শক্তি নেই যে আমাকে মৃত্যুর কবল থেকে রক্ষা করতে পারে। আর আমি এও এমন মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে নিলাম যে, মৃত্যু আসতে আর আধ ঘণ্টাও দেরি হবে না।
আমাদের জাহাজটা আগের মতোই দুর্বার গতিতে এগিয়ে চলেছে। কোথায়, কোনদিকে চলেছি না জানলেও আমরা যে এগিয়ে চলেছি, এটা তো আর মিথ্যা নয়। জাহাজটা অনবরত দুর্বার গতিতে এগিয়ে চলার প্রতিটা নট-এর সঙ্গে উত্তাল উদ্দাম সমুদ্রের প্রতিটা আকাশছোঁয়া ঢেউ আরও অনেক, অনেক বেশি প্রলয়ঙ্কর হয়ে উঠেছে। কখনও এক-একটা ঢেউ আচমকা আমাদের ভাঙাচোরা মনটাকে এতই ওপরে তুলে। নিয়ে যেতে লাগল, মাথার ওপরে ইতস্তত উড়ে বেড়ানো অ্যালট্রেস পাখিগুলোকেও ছাড়িয়ে উঠে যেতে লাগল। প্রতিবারই ভাবি দম বন্ধ হয়ে যাবার জোগার হয়, ভাবি এবারই বুঝি ভবলীলা সাঙ্গ হয়ে গেল। আবার পর মুহূর্তেই যখন আকাশছোঁয়া ঢেউটার মাথাটা সেঁটে গিয়ে জাহাজটসমেত আমাদের দম্ করে নিচে ছুঁড়ে দেয় তখন আমার অবস্থা আরও অনেক বেশি খারাপ হয়ে পড়তে লাগল। অন্তরাত্মা শুকিয়ে, প্রাণপাখি খাঁচাছাড়া হবার জোগার হয়ে উঠতে লাগল। মনে হলো নরকের দক্ষিণ দরজার দিকে এত দ্রুত নেমে যাচ্ছি যা ভাবা যায় না। মাথার ভেতরে ঝিমঝিমানী শুরু হয়ে যায়। উফ্! সে যে কী ভয়ঙ্কর পরিস্থিতি তা কাউকে বলে বুঝানো সম্ভব নয়।
