পিছনের গলুইটার অবস্থা খুবই শোচনীয় হয়ে গেল, লক্ষ্য করলাম। ভেঙেচুড়ে একেবারে ব্যবহারের অনুপযুক্ত হয়ে পড়েছে।
আর আমরা? আমরাও নানাভাবে আহত হয়ে পড়লাম। বরং বলা চলে, কোনোরকমে পিতৃদত্ত জীবনটা রক্ষা পেয়ে গেছে, এই যা। সত্যি ভাগ্যের ব্যাপারই বটে। ভাগ্যের জোরে পাম্পগুলোর মুখ আটকে যায়নি। যদি তাই হতো তবে এতক্ষণে কেলেঙ্কারির চূড়ান্ত ঘটে যেত। আর? আর জাহাজ বোঝাই ইট-পাথরের টুকরোগুলো এদিক-ওদিক ছড়িয়ে পড়েনি।
প্রাণে একটু পানি এলো বটে। ঝড়ের বেগ ক্রমে কমতে কমতে অনেক কমে। গেছে। আগের সে দাপট আর অবশ্যই নেই। তবে বাতাসের বেগ এখনও আছে। তবে এ বাতাস থেকে বিপদের আশঙ্কা নেই। আমাদের বুকের জমাট-বাঁধা ভয়ও অনেকাংশে লাঘব হয়ে গেছে। বিপদের আশঙ্কা আর তেমন কিছু আছে বলে মনে হলো না। আমাদের প্রাণে কিছুটা পানি এলো বটে। তবে বিপদের আশঙ্কা একেবারে নির্মূল হয়ে গেছে এরকম ধারণা করতে পারলাম না, পরিস্থিতি তেমন ছিলও না।
বাতাস একেবারে কমে না যাওয়া পর্যন্ত আমাদের স্বস্তি নেই। অনন্যোপায় হয়ে আমরা বাতাস কমে গিয়ে সমুদ্র একেবারে শান্ত না হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে লাগলাম।
না, আমাদের সে আশা বাস্তবায়িত হলো না। বরং বলা চলে, একেবাওে নিষ্ফল প্রত্যাশা। আমাদের হতাশ হতেই হলো।
এক-দুই-তিন করে পাঁচ পাঁচটা দিন ও রাত কেটে গেল।
আমাদের একমাত্র খাদ্যবস্তু কিছু পরিমাণ তালের গুড় কোনোরকমে রক্ষা করা গেল। আমাদের দোমড়ানো-মোচড়ানো–ভাঙাচোরা জাহাজটা সমুদ্রের ঢেউয়ের কাঁধে ভর দিয়ে কোনোরকমে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হলেও এগিয়ে যেতে লাগল। তবে তার গতি একেবারে মন্থর হয়ে গেছে, এরকম কথা বলা যাবে না, বরং বলতেই হয় জাহাজের ভাঙা অংশটা দ্রুতগতিতেই এগিয়ে যেতে লাগল।
ঝড়ের তাণ্ডব অনেকাংশেহাস পেয়েছে, স্বীকার না করে উপায় নেই, খুবই সত্য বটে। তবে এখন ঝড়ের যে দাপট আর তর্জন গর্জন কানে আসছে তা-ও নেহাৎ কম নয়। আর এখন যে পরিস্থিতি চলছে এরকম প্রতিকূল পরিস্থিতির মুখোমুখিও আমাকে এর আগে কোনোদিন হতে হয়নি।
তবে এও সত্য, গোড়ার দিকের চারদিন আমাদের গতি ছিল খুবই এলোমেলো। মোদ্দা কথা, কর্তব্য স্থির করতে না-পেরে মানুষ অসহায় পরিস্থিতিতে যেমন দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে যা করে থাকে, আমরাও তাই করেছি। কখনও দক্ষিণ পূর্বে, আবার কখনও বা সোজা দক্ষিণে। তবে গোড়ার দিকের চারদিনই আমরা ওরকম করেছি, ব্যস। অতএব ইতিমধ্যে আমাদের দু-দুবার যাওয়ার কথা।
পঞ্চম দিন। সেদিন ঠাণ্ডাটা খুব বেশি রকমই পড়ল। হাত-পা কেমন যেন অবশ হয়ে আসতে লাগল। এমনভাব ঠাণ্ডা যে ভাবা যায় না।
পূব-আকাশের গায়ে হলুদ আভা ছড়িয়ে দিয়ে সূর্যটা নিজের উপস্থিতি জানান দিতে লাগল। দিগন্ত রেখা থেকে সামান্য কয়েক ডিগ্রি ওপরে সকালের তাজা সূর্যটা জ্বলজ্বল করতে লাগল।
আকাশ পরিষ্কার নির্মেঘ। আকাশের গায়ে মেঘের চিহ্নমাত্রও দেখা যাচ্ছে না। তবে বাতাসের বেগ ক্রমেই বাড়তে বাড়তে একটু পরেই লক্ষ্য করলাম, বাতাস কখনও বাড়ছে, পরমুহূর্তেই বাতাস যেন কমতে কমতে একেবারেই কমে যাচ্ছে।
এক সময় লক্ষ্য করলাম, সূর্যটা যেন কেমন বিবর্ণ হতে হতে কোথায় তলিয়ে যাচ্ছে। হ্যাঁ, ইতিমধ্যে কখন যে আকাশের গায়ে টুকরো টুকরো মেঘের আনাগোনা শুরু হয়ে গেছে লক্ষ্যই করিনি।
দুপুরের দিকে আবার আকাশ পরিষ্কার হয়ে গেল। সূর্যটা আবার স্পষ্ট হয়ে চোখের সামনে দেখা দিল। তবে আগের মতো আলো বিকিরণ করল না। কেমন যেন বিষণ্ণ–যাকে বলে ম্যাড়ম্যাড়ে আলো।
বিকেল হলো। সারাদিনের কর্মক্লান্ত সূর্যটা সমুদ্রের বুকে গা-ঢাকা দেবার আগে হঠাৎ যেন একেবারেইনিষ্প্রভ হয়ে গেল। মনে হলো কোনো অদৃশ্য দুটো হাত গোপন অন্তরাল থেকে সূর্যটাকেনিভিয়ে দিল, সমুদ্রের বুকে ডুবিয়ে দিল।
আমাদের জাহাজের ভাঙা-অংশটা উল্কার বেগে ছুটে চলেছে। সূর্যটা সমুদ্রগর্ভে ডুব দিল। অতল সমুদ্রের বুকে পুরোপুরি ডুবে যাওয়ার আগে একটা রূপার অস্পষ্ট বলয়ের মতো দেখা গেল। খুবই অস্পষ্ট, যেন একেবারেই ঝাপসা একটা বলয়।
পঞ্চম দিনের সন্ধ্যা। সন্ধ্যার অন্ধকার নেমে এলো উত্তাল-উদ্দাম অতল সমুদ্রের বুকে। ষষ্ঠদিন যে আসবেই, এরকম আশা করা যায় না। সত্যি সে আশা করা অর্থহীন। যা ভেবেছিলাম, কার্যত তাই হলো। না, আমার কাছে যে ষষ্ঠ দিনটা আর এলো না। কেবলমাত্র আমার কাছেই নয়, আমার একমাত্র সহযাত্রী সুইডেনবাসীর কাছেও আর কোনোদিনই সে দিনটা এলো না।
ব্যস, আমরা নিদ্রি অন্ধকারের অতল গহ্বরে তলিয়ে গেলাম। অন্ধকার এক ঘেরাটোপের মধ্যেই আমাদের প্রতিটা মুহূর্ত, প্রতিটা দিন কাটতে লাগল।
তবে আমাদের এগিয়ে চলা কিন্তু অব্যাহতই রইল। জমাটবাধা অন্ধকার আমাদের চারদিক থেকে ঘিরে রাখল। আমরা যেন অন্ধকার যক্ষপুরীতে অবস্থান করতে লাগলাম। তবে অবশ্যই নিশ্চল-নিথরভাবে নয়, বরং দারুণভাবে সচল। দুর্বার আমাদের গতি।
আশ্চর্য ব্যপার! অমাবস্যার রাতও বুঝি এত অন্ধকার হয় না।
এবার থেকে অন্তহীন নিচ্ছিদ্র অন্ধকারে যক্ষপুরি বাসিন্দার মতো আমাদের দিন কাটতে লাগল। দিন-রাতের পার্থক্য বোঝার মতো ক্ষমতা, না ক্ষমতার কথা বলব না, আসলে সামান্যতম সুযোগই আমাদের দিল না। জাহাজ থেকে দশ পা দূরের কোনো জিনিসই আমাদের নজরে আসছে না। অন্তহীন রাত আমাদের চারদিক থেকে ঘিরে রইল।
