আমি আতঙ্কিত মন নিয়ে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে গেলাম। সত্যি কথা বলতে কি, আসন্ন একটা ঝড়ের আশঙ্কা সবকিছুর মধ্যেই প্রকটভাবে লক্ষিত হতে লাগল।
আমি পায়ে পায়ে ক্যাপ্টেনের সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। ফ্যাকাশে বিবর্ণ মুখে তার দিকে তাকালাম, বার-কয়েক ঢোক গিলে আমার ভয়ের কথা তার কাছে ব্যক্ত করলাম।
ক্যাপ্টেন আমার কথা ধৈর্য ধরে সবকিছু শুনলেন বটে। আমার মুখের কথা শেষ হতেই তিনি ঠোঁটের কোণে তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটিয়ে তুললেন। অবাক না হয়ে পারলাম না। তিনি আমার কথা ফুঙ্কারে উড়িয়ে দিলেন। এতটুকুও আমল দিলেন না।
ক্যাপ্টেনের আচরণে আমি আরও বেশি অবাক হলাম, আমার কথার ভালো-মন্দ কোনো জবাব দেবার প্রয়োজনই বোধ করলেন না।
অস্থিরতা আমার মধ্যে ভর করল। বিছানায় শুয়ে আমি বার বার অস্থিরভাবে এপাশ-ওপাশ করতে লাগলাম। সত্যিকথা বলতে কি পুরোপুরি মানসিক অস্থিরতার শিকার হয়ে পড়লাম। ঘুমানো তো দূরের কথা দুচোখের পাতা পর্যন্ত এক করতে পারলাম না। সে যে কী নিদারুণ যন্ত্রণাদায়ক পরিস্থিতি একমাত্র ভুক্তভোগি ছাড়া অন্য কারো পক্ষে অনুভব করা সম্ভব নয়। আর ভাষার মাধ্যমে কাউকে বুঝিয়েও বলা যাবে না।
মাঝরাত পর্যন্ত নির্ঘুম অবস্থায় কাটিয়ে নিরবচ্ছিন্ন অস্থিরতার হাত থেকে অব্যাহতি পাবার জন্য আমি বিছানা ছেড়ে উঠে পড়লাম। ক্যাবিন থেকে বেরিয়ে এক পা-দুপা করে এগোতে এগোতে সিঁড়ির কাছে গেলাম। কিছু সময় সেখানে থমকে দাঁড়িয়ে থাকলাম।
এক সময় অন্যমনস্কভাবে সিঁড়ির ওপরের ধাপটায় পা ঠেকাতেই আচমকা একটা গুঞ্জনধ্বনি আমার কানে এলো। যন্ত্রচালিতের মতো থমকে দাঁড়িয়ে পড়লাম। গুঞ্জনধ্বনিটা রীতিমত জোরালো।
দুরু দুরু বুকে উৎকর্ণ হয়ে সে গুঞ্জনধ্বনিটার উৎস ও প্রকৃতি সম্বন্ধে ধারণা নেওয়ার চেষ্টা করলাম। কলকারখানার চাকা খুব জোরে ঘুরলে এরকম শব্দের সৃষ্টি হয়।
আমি ব্যাপারটা নিয়ে গভীরভাবে ভাবনা চিন্তা করে তার কারণ সম্বন্ধে ধারণা করার আগেই পুরো জাহাজটা দুলতে লাগল। মুহূর্তে সেটা এমনভাবে দুলতে লাগল একেবারে বেসামাল হয়ে পড়ার উপক্রম হলাম।
এদিক-ওদিক ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাতে না তাকাতেই চোখের পলকে প্রবল ফেনায়িত জলোচ্ছ্বাস আমাকে, কেবলমাত্র আমাকেই বলি কেন, আমাদের এক আছাড় মেরে একেবারে দূরে নিয়ে গিয়ে ফেলল। আর জলরাশি আমাদের ওপর দিয়ে বয়ে গিয়ে পুরো ডেকটাকেই ভাসিয়ে দিল। মনে হলো সমুদ্রের সবটুকু পানি বুঝি জাহাজটার ওপর উঠে এসেছে।
তবে ওটা অবশ্যই সত্য যে, ঝড়ের এ দাপটের জন্যই জাহাজটা অনেকাংশে রক্ষা পেয়েছে। জাহাজটা পুরোপুরি ডুবে যাওয়া সত্ত্বেও মিনিটখানেকের মধ্যেই সেটা আবার সমুদ্রের ভেতর থেকে উঁকি দিল। আর ঝড়ের দাপটে বার বার টলতে টলতে এক সময় খাড়াভাবে দাঁড়িয়ে পড়ল।
আমি নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে জানে বেঁচে গেলাম কিন্তু কোনো অলৌকিক কারণে যে আমি সমূহ ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা পেলাম তা কিছুতেই বলতে পারব না।
পানির সে প্রচণ্ড ধাক্কাটা সামাল দিয়ে উঠেই আমি বুঝতে পারলাম, জাহাজের পিছন দিককার মাস্তুল আর হালের মাঝখানে আমি বন্দি হয়ে পড়েছি। সে দুটো যেন আমাকে দুদিক থেকে সাঁড়াশির মতো আঁকড়ে ধরে রেখেছে।
অনেক কসরৎ করে তবে মাস্তুল আর হালের কাঠগড়া থেকে নিজেকে মুক্ত করতে পারলাম। হাতের ওপর ভর দিয়ে কোনোরকমে উঠে দাঁড়ালাম।
এদিক-ওদিক দৃষ্টি ফিরিয়ে আমাদের তখনকার অবস্থা সম্বন্ধে ধারণা করে নিতে চেষ্টা করলাম। দৃষ্টি ঝাপসা। ঝাপসা দৃষ্টিতে চারদিকটা অনুসন্ধিৎসু নজরে তাকিয়ে বুঝতে পারলাম, আমারা ঢেউয়ের মধ্যে অবস্থান করছি। আকাশ ছোঁয়া সফেন। ঢেউয়ের যে ঘূর্ণিপাকে আমরা আটকে পড়েছি, তার ভয়ঙ্করতা কল্পনায় আনা যায় না।
আমি ভয়াবহ সে পরিস্থিতি থেকে আত্মরক্ষার উপায় ভাবতে লাগলাম। কিছুক্ষণ বাদে কার যেন কণ্ঠস্বর আমার কানে এলো। উকর্ণ হয়ে কণ্ঠস্বরটা সম্বন্ধে ধারণা করে নেওয়ার চেষ্টা করলাম। হ্যাঁ, আমি নিঃসন্দেহ হলাম, এক সুইডেনবাসীর কণ্ঠস্বরই বটে।
হ্যাঁ, আমরা দুটো প্রাণী ছাড়া জাহাজটার এতগুলো মানুষের মধ্যে আর কেউই জীবিত নেই।
জাহাজের গাঁট্টাগোট্টা জোয়ান মরদ ক্যাপ্টেন আর মেটরা তো ঘুমন্ত অবস্থাতেই পরপারে পৌঁছে গেছে। ব্যাপারটা সম্বন্ধে তো এতটুকুও দ্বিধা থাকার কথাও নয়। কারণ, তাদের কেবিনগুলোকে চোখের সামনেই সমুদ্রের বুকে, ঢেউয়ের তালে তালে নাচানাচি করতে দেখছি।
একটু-আধটু সাহায্য ছাড়া জাহাজটার নিরাপত্তার ব্যাপারে আমাদের নেই বলতে–কিছুই করার নেই। শত চেষ্টা করলেও কিছু করা সম্ভব নয়।
সত্যি কথা বলতে লজ্জা নেই, গোড়ার দিকে পানিতে ডুবে মরার আশঙ্কায় আমাদের মধ্য থেকে যেন যাবতীয় ক্ষমতা নিঃশেষে উবে গিয়েছিল। কি করব, কি-ই বা করা উচিত কিছুই মাথায় এলো না। উত্তাল উদ্দাম সমুদ্রের বুকে প্রচণ্ড দোলায় আমরা অসহায়ভাবে এমন দোলা খেতে লাগলাম যা একেবারেই বর্ণনাতীত। একের পর এক পর্বত প্রমাণ ঢেউ এসে আমাদের ওপর সবেগে আছড়ে পড়তে লাগল। একটা ঢেউয়ের আক্রমণ কোনোরকমে মোকাবেলা করতে না করতেই প্রচণ্ড আক্রোশে আর একটা ঢেউ এসে আমাদের ওপর আছড়ে পড়তে লাগল।
