আগেভাগেই এমন একটা বক্তব্যের অবতারণা করছি কেন, তাই না? হ্যাঁ, এর পিছনে সঙ্গত কারণ তো অবশ্যই আছে। কি সে কারণ? কারণটা হচ্ছে, এ যদি না করতাম তবে আমি এখন যে অবিশ্বাস্য কাহিনীটা আপনাদের সামনে তুলে ধরতে চলেছি, তাকে নিছক অলীক কল্পনার আবেগে উচ্ছ্বাস বলে গণ্য করতে পারেন।
দীর্ঘদিন পরদেশে ঘুরে ঘুরে আঠারো সালে খুন্দা দ্বীপপুঞ্জে যাওয়ার ইচ্ছা হলো।
রীতিমত সমৃদ্ধ দ্বীপ জাভা।
জাভার বাটাভিয়া বন্দরটাও কম সমৃদ্ধ নয়। এটা জনবহুল জাভা দ্বীপের কর্মচঞ্চল বন্দর। প্রতিদিন কাজের তাগিদে জনসমাগমও এখানে কম ঘটে না। বন্দরের বুকে উদয়াস্ত কর্মব্যস্ততা যেন লেগেই থাকে।
আমি কর্মব্যস্ত বাটাভিয়া বন্দর থেকে একদিন জাহাজে চেপে বসলাম।
তখন স্নায়ুবিক উত্তেজনা আমাকে প্রতিমুহূর্তে এখান-ওখানে ছুটিয়ে নিয়েছে। আর সে তাড়নার শিকার হয়েই আমি সে-জাহাজটার যাত্রী হয়েছিলাম।
বন্দর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ধীর-মন্থর গতিতে জাহাজটা গভীর সমুদ্রের দিকে এগিয়ে চলল। বন্দর আর জাহাজটার মধ্যে ব্যবধান ক্রমেই বেড়ে চলল।
জাহাজটা অতিকায়। প্রায় চারশো-টনের সুদৃশ্য একটা জাহাজ। আর সেটাকে তামার পাত দিয়ে মুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। মালাবার সেগুন কাঠ দিয়ে বোম্বাইয়ের কারখানায় তৈরি।
লাক্ষাদ্বীপ থেকে সংগৃহীত তেল আর তুলা দিয়ে অতিকায় জাহাজটাকে বোঝাই করা হয়েছে। আর যা-কিছু জাহাজে তোলা হয়েছে, সেগুলো হচ্ছে, ইয়া মোটামোটা কাছি, নারকেল, তাল-গুড়, ঘি আর আফিমের পেটি কয়েকটা।
মালপত্র সাজিয়ে-গুছিয়ে না রেখে এলোমেলো রাখার জন্য জাহাজটা বার বার এদিক-ওদিক টলতে লাগল।
বাতাসের চাপেই যাত্রী আর মালপত্র বোঝাই জাহাজটা হেলেদুলে এগিয়ে যেতে লাগল। জাভার পূর্ব উপকূল পথেই আমাদের অনেকগুলো দিন কেটে গেল। খুন্দা দ্বীপপুঞ্জ থেকে আসা কয়েকটা ছোট ছোট জাহাজের সঙ্গে মাঝে-মধ্যে আমাদের দেখা হতে লাগল বটে। তবে আমাদের চলার পথে এরকম ঘটনা ছাড়া আর কোন ঘটনাই ঘটল না যাতে আমরা একঘেয়েমি কাটিয়ে নতুনক্ষের স্বাদ পেতে পারি।
আমাদের অতিকায় জাহাজটা উত্তাল উদ্দাম সমুদ্রের বুকে ভাসছে তো ভাসছেই। এ ভাসার, এ চলার যেন আর শেষ নেই। আমাদের চারদিকে কেবল পানি আর পানি। আর অফুরন্ত ঢেউয়ের খেলা।
জাহাজটা হেলে দুলে এগিয়ে চলেছে। এক সন্ধ্যায় আমি জাহাজের পিছন দিকের রেলিঙে ভর দিয়ে অন্যমনস্কভাবে দাঁড়িয়ে ছিলাম। আমার চোখের মণি দুটো একবার নিচের সফেন জলরাশির পর মুহূর্তেই আবার মাথার ওপরের সুবিশাল আকাশটার গায়ে ঘুরে বেড়াতে লাগল।
এক সময় উত্তর-পশ্চিম আকাশের গায়ে আমার চোখের মণি দুটো থমকে গেল। অদ্ভুত এক টুকরো মেঘ আমার নজরে পড়ল, অপলক চোখে আমি মেঘের টুকরোটাকে দেখতে লাগলাম। বাটাভিয়া থেকে পানি আসার পর এই প্রথম মেঘ চোখে পড়ল। আরও আছে। জমাটবাধা ওই মেঘের টুকরোটার রঙটাও বাস্তবিকই খুব অদ্ভুত।
সারাদিনের কর্মক্লান্ত সূর্যটা পশ্চিম আকাশের গায়ে আত্মগোপন করার পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত আমি ওই বিচিত্র মেঘের টুকরোটার দিকে অপলক চোখে তাকিয়ে রইলাম।
জমাটবাধা নিশ্চল-নিথর মেঘের টুকরোটা আকাশের পূর্ব-পশ্চিম অংশে ছড়িয়ে পড়ল। আকাশের একটা বড় ভগ্নাংশই মেঘে ঢাকা পড়ে গেল।
তারপর? তারপর মুহূর্তের মধ্যে এক টুকরো কুয়াশা মেঘটাকে এমনভাবে ছেয়ে ফেলল যে, সেটাকে নিচু উপকূলের লম্বা একটা রেখা বলেই মনে হতে লাগল। অত্যল্প সময়ের মধ্যেই চাঁদের গোধূলি রাঙা রূপ আর সমুদ্রের একটা বিচিত্র চরিত্রের দিকে আমার নজর গেল, দৃষ্টি আকৃষ্ট হয়ে পড়ল।
লক্ষ্য করলাম, সমুদ্রের রূপ খুব তাড়াতাড়ি বদলে যাচ্ছে। আর উত্তাল সমুদ্রের জলরাশি ক্রমেই অস্বাভাবিক স্বচ্ছ হয়ে আসছে।
পানিবাহিত বাতাসও অসহ্য গরম বোধ হতে লাগল। উত্তপ্ত লোহার গা-বেয়ে বয়ে-আসা বাতাসের মতোই গরম বোধ হতে লাগল। ঠিক যেন আগুনের হল্কা এসে আমার গায়ে লাগছে। অবাক না হয়ে পারলাম না। প্রকৃতির এ কী অভাবনীয় খেলা!
ক্রমে সমুদ্রের বুকে, রাতের অন্ধকার নেমে আসতে লাগল। কোনো অদৃশ্য হাত যেন দিগন্ত জোড়া সমুদ্রের ওপর কালো চাদর বিছিয়ে দিয়েছে। চারদিকের, এমনকি খুব কাছের জিনিসও দেখা যাচ্ছে না।
বাতাস কমতে কমতে একেবারেই সরে গেল। কেমন যেন অভাবনীয় একটা গুমোট ভাব অনুভব করতে লাগলাম। শুধু কি এই? চারদিক এত বেশি থমথমে হয়ে গেল যা কল্পনাও করা যায় না।
ঘাড় ঘুরিয়ে বাতি-দানের জ্বলন্ত মোমবাতিটার দিকে তাকালাম। অবাক না হয়ে পারলাম না। মোমবাতির শিখাটা এতটুকুও কাঁপছে না, একেবারেই স্থির, অচঞ্চল। বুড়ো আঙুল আর অন্য আর একটা আঙুলের সঙ্গে একটা চুল ঝুলিয়ে রেখে অনুসন্ধিৎসু নজরে লক্ষ্য করতে লাগলাম–না, সেটা এতটুকুও নড়ছে না, কাঁপছেও না।
আমি যখন হতভম্বের মতো দাঁড়িয়ে অত্যাশ্চর্যজনক ব্যাপারটা নিয়ে ভাবনা চিন্তায় মগ্ন, তখন ক্যাপ্টেন এসে জানালেন, বিপদের কোনো আশঙ্কা নেই।
তারপর আমরা যখন উপকূল ঘেঁষে সোজা এগিয়ে চলেছি, তখন কপ্তেনই নির্দেশ দিলেন, নোঙর তুলে পাল উড়িয়ে দেওয়া হোক।
যাত্রীদের অধিকাংশই মালয়বাসী। ক্যাপ্টেনের নির্দেশ কানে যাওয়া মাত্র তারা ডেকের ওপর সটান শুয়ে পড়ল।
