আগুনের হল্কা চারদিকে ছড়িয়ে পড়তে লাগল। আর সে আগুনের শিখা যখন ক্রমে বাড়তে বাড়তে যখন চরম পর্যায়ে গেল তখন বিধ্বংসী অগ্নিকাণ্ডের ব্যাপারটা নিয়ে সবাই উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ল।
অগ্নিকাণ্ডের ব্যাপারটা নজরে পড়ামাত্র প্রাসাদের বিশেষ একটা ঘটনাকে রক্ষা করার জন্য বহু চেষ্টা করা সত্ত্বেও সবই ব্যর্থ হল।
সে অঞ্চলের মানুষগুলো, প্রতিবেশীরা ব্যাপারটা দেখে বিস্ময়বোধ করলেও সহানুভূতিহীন চোখে নীরব দর্শকের মতো দূরে দাঁড়িয়ে মজা দেখতে লাগল। কেউই বাড়িটাকে রক্ষা করার জন্য এগিয়ে তো এলোই না, এমনকি এতটুকুও আহা-উঁহু পর্যন্ত করল না।
তবে নতুন আর ভয়ঙ্কর কিছু অল্পক্ষণের মধ্যেই সে দিকে দৃষ্টি আকৃষ্ট হল।
দূরবর্তী বন থেকে মেজেংগারস্টিন প্রাসাদের প্রধান ফটক পর্যন্ত ওক গাছের ছায়ায় ছায়ায় দীর্ঘপথ পাড়ি দিয়ে ঝড়ের গতিকেও ছাড়িয়ে একটা ঘোড়া উদ্রান্তের মত ছুটে আসছে। তার পিঠে অবস্থানরত সওয়ারের মাথায় টুপিটা পর্যন্ত নেই। আর সে রীতিমত বিপর্যস্ত।
ব্যাপারটা দেখে স্পষ্টই মনে হয়, ঘোড়সওয়ার যে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলার মতো দ্রুতগতিতে ঘোড়া ছুটিয়ে এসেছে সে বিষয়ে সন্দেহের কিছুমাত্র অবকাশও নেই। তার চোখে-মুখে দুঃখ যন্ত্রণার ছাপ। অমানুষিক পরিশ্রম আর সর্বাঙ্গের ক্লান্তি অবসাদের ছাপ অস্পষ্ট হয়ে ফুটে উঠেছে। তবে একটামাত্র আর্তস্বর তার রক্তাপুত ঠোঁট দুটো দিয়ে আর কোনো শব্দই বের হলো না। আর মুখটা যেন একেবারে ছিন্ন ভিন্ন হয়ে পড়েছে।
তার মুখের এ-দশা কেন হল? আকস্মিক তীব্র আতঙ্কই এর একমাত্র কারণ। অতিমাত্রায় আতঙ্কিত হয়ে সে ঠোঁট দুটোকে দাঁতে চেপে ধরেছিল। তীক্ষ্ণ দাঁতগুলোর চাপে ঠোঁট কেটে গিয়ে অনবরত রক্তক্ষরণ হয়ে চলেছে।
মুহূর্তের ব্যাপার। হ্যাঁ একটামাত্র মুহূর্ত! ঝড়ের শোঁ-শোঁ শব্দ আর আগুনের লেলিহান শিখাকে ছাপিয়ে ঘোড়ার খুরের খটখট শব্দ প্রতিধ্বনিত হতে লাগল। মুহূর্তের মধ্যেই উদ্ৰান্ত তেজি ঘোড়াটা প্রাসাদের ধসে-পড়া সিঁড়িটার ওপর হাজির হয়ে পড়ল। তারপরই পিঠের অবস্থানরত সওয়ারটাকে নিয়ে লম্বা একটা লাফ দিয়ে আগুনের রাজ্যে গিয়ে পড়ল। আর ঠিক সে মুহূর্তেই ঝড় থামা শুরু হয়ে গেল। আর তা থামতে থামতে একেবাওে নিস্তব্ধ হয়ে গেল। সেখানে নেমে এলো মৃত্যুর স্তব্ধতা।
কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই সাদাটে আগুন শবাচ্ছাদনের মতো বাড়িটাকে ঢেকে ফেলল।
আর পরমুহূর্তেই অভাবনীয় একটা আলোকরশ্মি দূর থেকে দূরান্তে ছড়িয়ে পড়ল। ক্রমেই তা দূর থেকে দূরান্তে ছড়িয়ে পড়তে লাগল।
অচিরেই আকাশের গায়ে দেখা দিল ঘন কালো এক টুকরো মেঘ। ক্রমে সেটা এগিয়ে আসতে আসতে প্রাসাদের ছাদের ওপর ভিড় করল। আর সেটা থেকেই মুহূর্তের মধ্যেই সৃষ্টি হলো অতিকায় একটা মূর্তি-সুবিশাল একটা ঘোড়া, ঘোড়ার মূর্তি।
মেনাস্ক্রিপ্ট সাউন্ড ইন এ বটল
আমার দেশ আর আমার পরিবারের কথা বলার মতো কিছুই নেই। নিতান্তই মামুলি ব্যাপার মনে করতে পারেন। বদনাম আর দীর্ঘ বেশ কয়েক বছরের ব্যবধানের ফলে আমাকে একটা থেকে বিতাড়িত হতে হয়েছে আর অন্যটা থেকে দূরে সরিয়ে দিয়েছে। এসব কথা আর দশজনের কাছে ফলাও করে বলারই বা কি থাকতে পারে?
উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া টাকাকড়ি আমাকে যে শিক্ষা দিয়েছে তাকে নিতান্ত সাধারণ ব্যাপার বলে মনে করা যাবে না। আর জীবনের গোড়ার দিকে খুবই পরিশ্রমের মাধ্যমে যে বিদ্যা আমি রপ্ত করেছিলাম, তাকে যথোপযুক্ত পথে চালিত করেছে চিন্তা-ভাবনা আর আমার মন। এ সবের চেয়ে আমাকে ঢের, ঢের বেশি মনের খোরাক জুগিয়েছে জার্মান নীতিবিদদের সুচিন্তিত বক্তব্যসমৃদ্ধ গ্রন্থাবলী। হ্যাঁ, অকপটে স্বীকার করে নিচ্ছি সে সব গ্রন্থ আমার মন-প্রাণকে খুশিতে কাণায় কাণায় ভরে দিয়েছে।
তবে এও সত্য যে, জার্মান নীতিবিদদের লিখিত গ্রন্থাবলী থেকে যে আমি অপার আনন্দ পেয়েছি তার কারণ, তাদের বল্গাহীন উন্মত্ততার অহেতুক আকর্ষণ যতটা নয় তার চেয়ে অনেক বেশি তাদের ভাবনা চিন্তাকে বোধগম্য করে তোলার মতো আমার কঠোর ধীশক্তি ও চিন্তা করার সহজাত প্রবৃত্তি আর অনুশীলন।
অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আমার প্রতিভার রসহীন কাঠিন্যবশত আমি নিশ্চিত হয়ে পড়েছি, আমার চরিত্রের সীমিত কল্পনাশক্তি অপরাধ বলে চিহ্নিত করা হয়েছে।
সত্যি কথা বলতে কি, আমি যে সব মতামত প্রকাশ করেছি, তাতে নাস্তিকতাই প্রকাশ পেয়েছে। আর এরই জন্য আমি কুখ্যাত হয়ে পড়েছি।
আসলে, আমার বিশ্বাস, পদার্থ-বিষয়ক দর্শনশাস্ত্রের প্রতি আমার অত্যাধিক আকর্ষণই আমার এ পরিণতির জন্য দায়ী। আর তাই আমাকে এ আমলের মামুলি ভ্রান্তিতে জড়িয়ে ফেলেছে। ব্যাপারটা আসলে কি তাই না? আমি বলতে চাইছি, ব্যাপারটা হচ্ছে, খুবই সামান্য, একেবারেই নগণ্য ব্যাপারকেও সে বিষয়ক বিজ্ঞানের মৌলিক নীতি প্রয়োগ করে বিচার-বিবেচনা করার অভ্যাস।
মোদ্দা কথা হচ্ছে, কুসংস্কারে অন্ধ হয়ে বাস্তবতা, সত্যের কঠিনতা থেকে সরে যাবার অভিযোগ আমার বিরুদ্ধে যতখানি প্রযোজ্য, ঠিক ততখানি অন্য করো বিরুদ্ধে নয়। সত্য কথা বলতে কি, সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র দৃষ্টিকোণ থেকে আমার বক্তব্যকে বিচার করা হয়েছে।
