প্রতিবেশীদের মনে এমন এমন অস্বাভাবিক ধারণা দানাবাধার পিছনে যুক্তিও আছে যথেষ্টই। কারণ, দুপুরের গা-জ্বালা-করা রোদে, গভীর রাতের নিস্তব্ধতায়, রোগাক্রান্ত বা সুস্থ স্বাভাবিক অবস্থায় প্রচণ্ড ঝড়-তুফানের মধ্যে বা শান্ত আবহাওয়ায় যে কোনো পরিস্থিতিতে যুবক ফ্রেডারিককে দেখা যেত ঘোড়াটার পিঠে চেপে কোথায় যেন ছুটে চলেছেন। কোনোদিকেই তাঁর ভ্রূক্ষেপমাত্র নেই। কিন্তু কোথায়? কেনই বা তিনি কোনোকিছুকে তোয়াক্কা না করে ছুটে যান? অতএব তারা ঘোড়াটার বেয়াদপির সঙ্গে তার নিজের চরিত্রের সাদৃশ্য খোঁজার চেষ্টা করে। তবে তেমন উল্লেখযোগ্য। কোনোকিছুর সন্ধান না করতে পেরে কানাঘুষো করতে থাকে ‘নির্ঘাৎ এর পিছনে এমন কোনো গোপন রহস্য জড়িয়ে আছে যার হদিস আমরা পাচ্ছি না। তবে এ রহস্যভেদ করতেই হবে।’
আর একটা লক্ষ্যণীয় ব্যাপার হচ্ছে, যুবক জমিদার ফ্রেডারিকের অশ্বশালায় যত ঘোড়া রয়েছে প্রত্যেকেরই এমন একটা করে নাম রয়েছে যা কোনো-না-কোনো অর্থবহ। কিন্তু সদ্য সংগৃহীত এ ঘোড়াটার কোনো নামকরণই তিনি করেননি। কেন? এর পিছনে এমন কোন অন্তর্নিহিত কারণ লুকিয়ে রয়েছে?
আরও ব্যাপারের দিকে সবার দৃষ্টি নিক্ষিপ্ত হল–এ ঘোড়াটার জন্য আলাদা একটা আস্তাবল তৈরি করা হয়েছে? আর সেটার অবস্থান অন্য সব ঘোড়ার আস্তাবলের চেয়ে বেশ কিছুটা দূরে। আরও আছে, অন্য ঘোড়াগুলোর রক্ষণাবেক্ষণের জন্য পালক নিযুক্ত রয়েছে। তারাই সেগুলোর যাবতীয় পরিচর্যা করে। কিন্তু এর রক্ষণাবেক্ষণ, এমনকি দলাই মলাই পর্যন্ত যুবক জমিদার নিজেই করেন কেন? কেন এ-কাজ অন্যের ওপর দিলেন না?
কেবলমাত্র পরিচর্যার ব্যাপার স্যাপারের কথাই বা বলি কেন? তার আস্তাবলে তিনি নিজে ছাড়া অন্য কারো প্রবেশাধিকার পর্যন্ত ছিল না।
উপরোক্ত কারণ ছাড়া আরও একটা ব্যাপার নজরে পড়ে। ব্যাপারটা হচ্ছে, বার্লিকিজিং-এর আস্তাবলে অগ্ন্যুৎপাত ঘটলে সেটা থেকে প্রাণ রক্ষা করার জন্য। ঘোড়াটা সেদিন দড়ি ছিঁড়ে পালিয়ে যায়। তার যে তিনজন অশ্বপালক সে উদ্ধত প্রকৃতির ঘোড়াটাকে ধরে ফেলেছিল, তারা সে সময় যে লাগাম আর ফাস ব্যবহার করেছিল তা ছিল মোটা শেকলের তৈরি। অথচ সে তিনজন অশ্বপালকের মধ্যে একজনের পক্ষেও বলা সম্ভব নয় যে তথন বা তার পরেও যুবক ফ্রেডারিক কোনোসময় ভুলেও তার গায়ে হাত দিয়ে দেখেছেন। ব্যাপারটা বাস্তবিকই গোলমেলে।
জমিদার ফ্রেডারিকের অনুচরদের মধ্যে এমন একজনও ছিল না যে এ ঘোড়াটার প্রতি যুবক ফ্রেডারিকের অতিমাত্রায় ভালোবাসার ব্যাপারে সামান্যতম সন্দেহ পোষণ করত, অন্তত একমাত্র ওই কদাকার ভৃত্যটা ছাড়া অন্য কারোরই সন্দেহের প্রশ্নই ওঠে না।
ভৃত্যটা কদাকার খুবই সত্য। তার শারীরিক বিকৃতি নিয়ে নানাজন বহুরকম কথা বলে থাকে। কেউ বা আড়ালে আবার কেউ বা সামনাসামনিই তার চেহারা নিয়ে নানা রকম মন্তব্যের ম্যধ্যমে হাসিঠাট্টা করে। তার কথা নিয়ে কেউ মাথা তো ঘামাই না, এমনকি তিলমাত্র পাত্তাও কেউ করে না। মোদ্দা কথা, তার কোনো গুরুত্ব আছে বলে ছোট-বড় কেউ-ই মনে করে না।
কেই বা বলতে পারে, সে-ই দুঃসাহসে ভর করে বলেছিল, তার মনিব যখনই সে ঘোড়াটার সওয়ার হলো না কেন তখনই তিনি নিতান্ত অহেতুক সচকিত হয়ে পড়েন, শরীর বার বার শিউরে ওঠে।
আরও আছে, সে এও বলেছিল তার মনিব যতবারই ঘোড়াটার সওয়ার হয়ে দীর্ঘপথ পাড়ি দিয়ে প্রাসাদে ফিরে আসেন, ততবারই তাঁকে অতিমাত্রায় হাসিখুশি দেখায়। সত্যি কথা বলতে কি, তার মনে হয় মনিব বুঝি এমন কোনো কাজ হাসিল করে এসেছেন, যা রাজ্য জয়ের সমানই আনন্দদায়ক।
এক মধ্যরাতের কথা। তখন ভয়ানক ঝড় উঠেছে। প্রলয়ঙ্কর ঝড়। মেজেংগারস্টিন তখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। হঠাৎ-ই তার ঘুম ভেঙে যায়। উদ্রান্তের মতো খাট থেকে নেমে এলেন। দুই লাফে দরজার কাছে ঝট করে সিটকিনিটা খুলে ফেললেন। বদ্ধ উন্মাদের মতো দৌড়ে ঘর থেকে বেরিয়ে নিচে নেমে আসলেন।
তারপর একই রকম ব্যস্ততার সঙ্গে সোজা আস্তাবলে ঢুকে গেলেন। ঘোড়াটার দড়ি খুলে বাইরে নিয়ে এলেন।
ব্যস, আর মুহূর্তমাত্রও সময় নষ্ট না করে এক লাফে ঘোড়ার পিঠে চেপে তাকে বনের দিকে ছুটিয়ে দিলেন। চোখের পলকে অতিকায় তেজি ঘোড়াটা বনের মধ্যে ঢুকে গাছগাছালির আড়ালে অদৃশ্য হয়ে গেলেন। এরকম ঘটনা আজ নতুন নয়, বরং প্রায়ই ঘটে বলা যেতে পারে। তাই ব্যাপারটা নিয়ে কেউ মাথা তো ঘামানই না এমনকি ঘাড় ঘুরিয়ে দেখারও দরকার মনে করল না।
মেজেংগারস্টিন ঘোড়াটার পিঠে অন্য দিনের মতোই প্রাসাদ ছেড়ে যাবার ব্যাপারটা তেমন কেউ লক্ষ্য না করলেও তার বাড়ি ফিরতে অস্বাভাবিক দেরি হওয়ায় প্রাসাদের সবাই খুবই চিন্তায় পড়ে গেল।
এক ঘণ্টা-দুঘণ্টা করে ক্রমে বেশ কয়েক ঘণ্টা কেটে যাবার পর এক অভাবনীয় কাণ্ড ঘটতে দেখা গেল। হঠাৎ দেখা গেল, মেজেংগারস্টিন প্রাসাদের ছাদের মনোহরী প্রাচীরগুলো ভয়ঙ্কর এক অগ্নিকাণ্ডের ফলে দুম দুম্ শব্দে ভেঙে পড়তে আরম্ভ করেছে, আর এরই ফলে প্রাসাদটার ভীত পর্যন্ত বার বার কেঁপে উঠছে। সে-কী প্রলয়ঙ্কর কাণ্ড শুরু হয়ে গেল তা ভাষায় ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়।
