যুবক ফ্রেডারিকের বিভিন্ন আবেগ ভিড় করল। আবেগ-উচ্ছ্বাসে অভিভূত হয়ে তিনি উত্তেজিত হয়ে পড়লেন। কিন্তু সে উত্তেজনাকে প্রকাশ করলেন না। মুহূর্তের মধ্যেই বহু কষ্টে সেটাকে সামলে নিলেন।
পরমুহূর্তেই তার চোখে মুখে বিদ্বেষের ছাপ ফুটে উঠল।
নিজের মনকে শক্ত করে তিনি এবার হুকুম দিলেন–ওই হলঘরটাকে এ-মুহূর্তে যত শীঘ্র সম্ভব তালা বন্ধ করে দাও।’
‘হুজুরের আদেশ অক্ষরে অক্ষরে পালিত হবে।
‘আর একটা কথা, তালাবন্ধ করে চাবিটা এনে আমার হাতে তুলে দেবে, মনে থাকবে তো?
‘তাই হবে হুজুর।
ভৃত্য মনিবের নির্দেশ পালন করার জন্য আবার প্রাসাদের ভেতরে চলে গেল।
ভৃত্য সেখান থেকে চলে যাবার পরই যুবক ফ্রেডারিক বড়সড় বেয়াড়া ঘোড়াটাকে নিজের বলে গ্রহণ করার পরই সেটা আবার আগের মতোই লাফালাফি দাপা দাপি শুরু করে দিল। মনে হলো সে যেন একেবারে উন্মাদদশাপ্রাপ্ত হয়েছে।
আর মেজেংগারিস্টন প্রাসাদ থেকে তাদের আস্তাবল পর্যন্ত দীর্ঘ সম্পূর্ণ রাস্তাটায় ছুটোছুটি লাফালাফি করতে আরম্ভ করল।
ঘোড়াটার রকম সকম দেখে ফ্রেডারিকের এক সামন্ত মন্তব্য করল–‘হুজুর, একটা দুঃসংবাদ আছে।
ফ্রেডারিক সচকিত হয়ে বলে উঠলেন–‘দুঃসংবাদ? কী সে দুঃসংবাদ?
‘বৃদ্ধ শিকারি বার্লিকিজিং-এর মর্মান্তিক মৃত্যু
তাকে কথাটা শেষ করতে না দিয়েই তিনি বলে উঠলেন–‘মৃত্যু? কি বললেন, বৃদ্ধ শিকারি বার্লিংকিজিং মারা গেছেন।
‘সত্যি বলছি, তিনি মারা গেছেন। আর এ মৃত্যু সংবাদটা আশা করি আপনার কাছে দুঃখজনক নয়।’
ফ্রেডারিকের মুখে মুহূর্তের মধ্যে অভাবনীয় একটা হাসির ঝিলিক ফুটে উঠল।
মনের আকস্মিক আনন্দটুকু চেপে রেখে তিনি এবার বললেন–‘কিভাবে তার মৃত্যু হয়েছে, কিছু জানতে পেরেছ?
‘হ্যাঁ, তা জানতে পেরেছি বটে।
‘কিভাবে বল তো?
‘শুনেছি তিনি নিজেরই একটা শিকারি ঘোড়াকে উদ্ধার করতে গিয়ে বোকার মতো ছুটোছুটি করছিলেন। তখনই আচমকা আগুনের মধ্যে পড়ে যান। আর তাতেই তার মৃত্যু হয়।
‘আগুন! শিকারি ঘোড়া!
‘হ্যাঁ হুজুর। আগুনে পুড়েই তিনি মারা গেছেন।’
ব্যারণের মধ্যে এমন একটা ভাব লক্ষ্য করা গেল যেন তিলে তিলে উত্তেজক ধারণার সত্যতাকে উপলব্ধি করতে পেরেছেন।
বৃদ্ধ সামন্ত আবার বললেন–‘হুজুর, আমার কথাটা কিন্তু প্রকৃতই সত্য।
‘অবাক কাণ্ড তো! সত্যি অবাক হবার মতো ব্যাপারই বটে।
স্বাভাবিক কণ্ঠে কথাটা বলতে বলতে যুবক ফ্রেডারিক প্রাসাদের দিকে ধীর পায়ে এগিয়ে গেলেন।
এবার থেকে উদ্দাম-অসংযত চরিত্রের যুবক ফ্রেডারিক ভন মেজেংগারস্টিনের চলাফেরা আচার আচরণের আমূল পরিবর্তন ঘটতে লাগল। যাবতীয় প্রত্যাশাকে তার ব্যবহার যারপরনাই নিরাশ করে দিল। বস্তুত দেখা গেল, কারো মতামতের সঙ্গেই তা আর মিলল না। আর একটা কথা উল্লেখ করতেই হয়, প্রতিবেশী ভদ্র পরিবারগুলোর সঙ্গে তার আচরণ কেবলমাত্র সুখকরই নয়, শোভনও ছিল না।
সম্প্রতি যুবক ফ্রেডারিকের মধ্যে লক্ষণীয় পরিবর্তনগুলোর মধ্যে একটা উল্লেখযোগ্য ব্যাপার হচ্ছে, নিজের জমিদারির এলাকার বাইরে তাকে আর দেখা যায় না বললেই চলে। নিতান্ত জরুরি প্রয়োজন ছাড়া ইদানিং প্রাসাদের বাইরে, বিশেষ করে। জমিদারির বাইরে যান না বললেই চলে।
প্রাসাদের ভেতরে কাজকর্মের মধ্যে লিপ্ত থাকার ফলে কিছুদিনের মধ্যে পরিস্থিতি এমন হয়ে পড়ল যে, এত সামাজিক পরিবেশ থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিতে নিতে তিনি একেবারে নিঃসঙ্গ হয়ে পড়লেন। তবে এ-কথা যদি সত্য হয় যে, ওই উদ্দ্যাম, চঞ্চল, আর বাগ না মানা ঘোড়াটা, বর্তমানে তিনি যখন তখন যার পিঠে চাপেন, যদি কোনো রহস্যময় অধিকারে তার বন্ধুত্বের দাবি করতে পারেন সেটা অবশ্য অন্য কথা। সব মিলিয়ে বলতেই হয় যুবক জমিদার ফ্রেডারিকের চরিত্র যেন রাতারাতি এমন বদলে গেল, যা উৎসাহ করতেও ভরসা পাওয়া যায় না।
এদিকে প্রতিবেশীদের বাড়িতে তো মাঝে মাঝেই আনন্দ অনুষ্ঠানের আয়োজন হয়। তারা যুবক জমিদার ফ্রেডারিককে স্বাভাবিকভাবেই আমন্ত্রণ জানায়–‘মহামান্য জমিদার কি উপস্থিত হয়ে আমাকে আনন্দিতও সম্মানিত করবেন?
আবার কেউ বা আমন্ত্রণ জানাতে গিয়ে বললেন–‘মহামান্য জমিদার মশাই কি আমাদের শূকর-শিকার অনুষ্ঠানে যোগদান করে বাধিত করবেন?
জমিদার আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করতে গিয়ে কাউকে লোক মারফত লিখিতভাবে জানিয়ে দিতেন–মেজেংগারস্টিন উৎসব অনুষ্ঠান পছন্দ করেন না, ‘মেজেংগারস্টিন শিকার পছন্দ করেন না। এভাবে উদ্যত ও সংক্ষিপ্ত জবাবের মাধ্যমে তিনি প্রতিবেশী সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিদের আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করে নিজেকে প্রাসাদের চার-দেওয়ালের মধ্যে আবদ্ধ রাখতেন।
যুবক জমিদার কর্তৃক বার বার প্রত্যাখ্যাত হওয়ার ঘটনায় উদ্ধত প্রতিবেশী সম্ভ্রান্ত পরিবারগুলো এরকম অপমানকে স্বাভাবিক বলে মনে নিতে পারল না। মেনে নেওয়া সম্ভবও নয়। ফলে তাদের মধ্যে ক্ষোভ দানা বাঁধতে লাগল। দিনের পর দিন এভাবে একের পর এক ঘটনা ঘটতে ঘটতে এক সময় দেখা গেল এরকম আমন্ত্রণের সংখ্যা ক্রমে কমে আসতে আসতে এক সময় একেবারেই বন্ধ হয়ে গেল।
ব্যাপার যা-ই থাক না কেন, সদ্য জোগাড়-করা বেয়াদপ উদ্ধত প্রকৃতির ঘোড়ার প্রতি যুবক ফ্রেডারিকের অনুরাগ বিচক্ষণ ব্যক্তিরা শেষপর্যন্ত কুৎসিত এবং অস্বাভাবিক আসক্তি বলে মনে করতে লাগল। তারা কানাঘুষো করতে লাগল এর মধ্যে কোনো কুৎসিৎ ভাবনা না থাকলে অনুরাগ কিছুতেই এমন গম্ভীর হওয়া সম্ভব নয়।
