যুবক জমিদার কয়েক মুহূর্ত প্রধান ফটকের সামনে দাঁড়িয়ে নীরবে বেয়াড়া ঘোড়াটা এবং অশ্বপালকদের কাণ্ডকারখানা দেখলেন। এবার তার কাছে পর্দার গায়ে দেখা ঘোড়ার ছায়াটার রহস্য খোলসা হল। নিঃসন্দেহ হলেন। ঘরের পর্দার গায়ে দেখা সে ছায়াটা যে চোখের সামনে দেখা হিংস্র ঘোড়াটারই প্রতিকৃতি।
এবার তিনি দুপা এগিয়ে গিয়ে অশ্বপালকদের বললেন–‘কি ব্যাপার হে।
অশ্বপালকদের একজন কাজ থামিয়ে বললেন–হুঁজুর, হতচ্ছাড়া ঘোড়াটা এমন বেয়াড়া যে, তাকে বাগে আনতে আমরা তিন তিনজন লোক রীতিমত হিমসিম খাচ্ছি।
‘হ্যাঁ, সে তো নিজের চোখেই দেখছি। কিন্তু ঘোড়াটা কার? এটাকে কোথায় পেলে তোমরা?
‘হুজুর এটা আপনারই সম্পত্তি, আপনারই সম্পত্তি।
‘আমার? আমার ঘোড়া?’
‘হ্যাঁ, ঠিক তাই। অন্য কেউ অন্তত এটাকে আগে দাবি করেনি, আজও দাবি করবে না।’
‘সে না হয় বুঝলাম। কিন্তু এটাকে পেলে কোথায়?
‘এ-পথে দৌড়ে যাবার সময় আমরা একে ধরে ফেলেছি।
‘দৌড়ে যাচ্ছিল? কিন্তু কোথা থেকে আসছে, অনুমান করতে পারছ কিছু?
‘আমরা অনুমান করছি, বার্লিকিজিং দুর্গের জ্বলন্ত আস্তাবল থেকে কোনোক্রমে দড়ি ছিঁড়ে পালিয়ে এসেছে।
‘বার্লিকিজিং দুর্গ?
‘তাই অনুমান করছি। হ্যাঁ, যে কথা বলছিলাম, ঘোড়াটা উন্মাদের মত দৌড়াতে দৌড়াতে এ-পথ দিয়ে যাবার সময় আমরা বহু চেষ্টা করে ধরে ফেলেছি। তারপরের দৃশ্য আপনি তো নিজের চোখেই দেখছেন হুজুর।
অন্য আর একজন অশ্বপালক বলল–‘আমরা যখন এটাকে প্রথম দেখতে পাই তখন এর সর্বাঙ্গ প্রচণ্ড ক্রোধে কাঁপছিল। আর শরীর ফেনায় মাখামাখি হয়ে গিয়েছিল।
আমরা প্রথমে ভেবেছিলাম, বুড়ো কাউন্ট এর মালিক। আর কোনো বিদেশি ঘোড়ার মালিক। তাই আমরা এটাকে ধরে জোর করে তার আস্তাবলেই ফিরিয়ে নিয়ে গিয়েছিলাম।’
‘তাই নাকি? তারপর?
‘তারা কিন্তু কিছুতেই এটাকে তাদের ঘোড়া দাবি করল না।
‘হুম!
‘ব্যাপারটায় আমরা খুবই অবাক হলাম।’
‘কেন?’
‘কারণ, ঘোড়াটা যে অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে কোনোক্রমে আস্তাবল থেকে বেরিয়ে এসেছে এরকম বহু চিহ্নই তার গায়ে দেখা যাচ্ছে। হুজুর একটু লক্ষ্য করলে আপনিও আমাদের কথার সত্যতার প্রমাণ পাবেন।’
‘হ্যাঁ, আমিও তো তাই দেখছি।
ঘোড়াটার কপালের দিকে আঙুল নির্দেশ করে।
প্রথম অশ্বপালক এবার বলল–‘হুজুর, এই যে দেখুন, এর কপালে দাগিয়ে ডব্লউ ভি বি অক্ষরগুলো খুবই স্পষ্টভাবে লিখে দেওয়া হয়েছে।’
‘হুম।
পুর্ব প্রসঙ্গের জের টেনে প্রথম অশ্বপালক বলে চলল ‘হুজুর, আমি তাই ভেবেছিলাম। যে অক্ষরগুলোর কথা বললাম, সেগুলো ‘উইলহেলম্ ভন্ বার্লিকিজিং নামের আদ্যক্ষর।’
‘হুম।
‘কিন্তু হুজুর, ঘোড়াটাকে দেখে দুর্গের সবাই পরিষ্কার জা নিয়ে দিয়েছে, ঘোড়াটা তাদের তো নয়ই এমনকি তারা ঘোড়াটাকে চেনে না, দেখেওনি কোনোদিন।
যুবক জমিদার–‘অদ্ভুত কথা তো! বড়ই আশ্চর্যজনক ব্যাপার।
‘আমরাও তো তাই বলাবলি করছিলাম হুজুর।
‘আর একটা কথা, ঘোড়াটার দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ রেখেই তিনি এবার বললেন– ‘হ্যাঁ, তোমাদের কথা শতকরা একশো ভাগই সত্য।
‘কোন্ কথা? কীসের ইঙ্গিত দিতে চাইছেন হুজুর?
‘ওই যে বললে অদ্ভুত ঘোড়া, বাস্তবিকই ঘোড়াটা খুবই অসাধারণ! আবার নিখোঁজ হয়ে যাওয়াটা সন্দেহজনকই বটে।
‘হ্যাঁ হুজুর। ব্যাপারটা সন্দেহজনক তো অবশ্যই।
তবে ঘোড়াটা এবার থেকে আমারই হোক।
মুহূর্তের জন্য ঘোড়াটার আপাদমস্তক চোখ বুলিয়ে নিয়ে তিনি এবার বললেন– ‘ঘোড়াকে দেখে আমি যা বুঝলাম, হয়তো ফ্রেডারিক মেজেংগারস্টিনের মতো একজন সুদক্ষ ব্যক্তির পক্ষে পাজি ঘোড়াটাকে বশ করা কোনো সমস্যাই হবে না।’
‘হুজুর, অপরাধ নেবেন না, আপনার হয়তো ভুল হচ্ছে।
‘ভুল? মানে আমি ভুল করছি?
‘আমাদের মনে হচ্ছে আপনার ভুলই হচ্ছে। হুজুর, আমরা তো বলছিই, ঘোড়াটা কাউন্টের আস্তাবল থেকে আসেনি। আর তাই যদি হয়ে থাকে তবে তো ঘোড়াটাকে অবশ্যই আপনার বা আপনার পরিবারের কারো কাছে হাজিরই করতাম না। হুজুর, আপনি কি আমার সঙ্গে একমত হচ্ছেন?
‘হ্যাঁ, কথাটা অবশ্য ঠিকই বলছ’ যুবক জমিদার আমতা আমতা করে বললেন।
তার কথাটা শেষ হতে না হতেই অদূরবর্তী শোবার ঘর থেকে বাহক ভৃত্যটা লম্বা লম্বা পায়ে প্রাসাদের ভেতর থেকে বেরিয়ে এলো।
জমিদার ভৃত্যের ব্যস্ততা লক্ষ্য করে সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে তার মুখের দিকে তাকালেন।
সে মন্দিরের দিকে কয়েক পা এগিয়ে এসে অনুচ্চ কণ্ঠে, প্রায় কানে কানে বলল– ‘হুজুর, একটা জরুরি কথা বলার জন্য আমি আপনার কাছে ছুটে এসেছি।’
চোখে মুখে উকণ্ঠার ছাপ এঁকে জমিদার জিজ্ঞাসা করলেন–‘জরুরি কথা! এমনকি জরুরি কথা যে তুমি এমন হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এসেছ?
‘হুজুর, প্রাসাদের হলঘরটার পর্দার ছোট্ট একটা অংশ হঠাৎ অদৃশ্য হয়ে গেছে।
‘পর্দা? পর্দার অংশ অদৃশ্য হয়ে গেছে?
‘তবে আর বলছি কি হুজুর! কি করে যে সেটা একেবারে বেপাত্তা হয়ে গেল, তা তো আমার মাথাই আসছে না।’
জমিদারের মুখে উকণ্ঠার ছাপ ফুটে উঠল। তিনি কপালের চামড়ায় পরপর কয়েকটা ভাঁজ এঁকে নীরবে ভৃত্যটার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।
উভয়ের মধ্যে অনুচ্চ কণ্ঠে কথাগুলো হলেও কাছাকাছি দাঁড়িয়ে থাকা কৌতূহলী অশ্বপালকরা প্রায় সব কথাই শুনতে পেল।
