এবার চাঁদের আলোয় নিয়ে গিয়ে ঘড়িটা ভালো করে দেখে নিঃসন্দেহ হওয়ায় সেটাকে চোখের সামনে ধরতেই আমার দুচোখের কোল ঘেঁষে পানির ধারা নেমে এলো। হঠাৎ করে কর্তব্য স্থির করে উঠতে না পেরে আমি সমুদ্রের জলে ঘড়িটাকে ছুঁড়ে দিলাম। সাতটা বেজে সেটা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। সমুদ্র প্রায় শান্ত, ঢেউয়ের উন্মাদনা না থাকায় সময়টা অতিক্রান্ত হয়ে গেছে।
স্ট্রামের ঘূর্ণাবর্ত এখন চরম রূপ ধারণ করেছে। পরিস্থিতি খুবই ভয়ঙ্কর।
আমরা এতক্ষণ সমুদ্রের ঢেউয়ের মাথায় খুবই দক্ষতার সঙ্গে এগিয়ে যাচ্ছিলাম।
সমুদ্র ক্রমেই উত্তাল-উদ্দাম রূপ ধারণ করল। সমুদ্র যেন দৈত্যের রূপ ধারণ করল। চরম উন্মত্ততা নিয়ে সমুদ্র যেন এবার আমাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। চোখের পলকে আমাদের এক ধাক্কায় যেন একেবারে পর্বতের চূড়ার সমান উচ্চাতায় তুলে দিল। উঁচুতে আরও উঁচুতে উঠে আমাদের মাথা যেন একেবারে আকাশের গায়ে ঠেকে যাওয়ার জোগাড় হলো।
আমার সামান্যতমও ধারণা ছিল না যে, কোনো সমুদ্র ফুলে-ফেঁপে এত ওপরে উঠে যেতে পারে। এরকম কথা কেউ বলেও আমার মধ্যে বিশ্বাস স্থাপন করতে পারত না। ব্যস, পরমুহূর্তেই সে ঢেউটা দুম্ করে ভেঙে গিয়ে আমাদের এক আছাড় মেরে একেবারে নিচে ফেলে দিল। আমরা পুরোপুরি ডুবে গেলাম।
আমার মাথাটা হঠাৎ ঘুরে গেল। ঝিমঝিম করতে লাগল। তখন আমার মধ্যে এমন একটা ধারণা জন্মাল যে, আমি যেন স্বপ্ন দেখছিলাম। আর সে স্বপ্নের মধ্যেই উঁচু একটা পর্বতের চূড়া থেকে হঠাৎই পা হড়কে একেবারে নিচে পড়ে গেছি।
কিন্তু ওপরে অবস্থানকালেই একবার এক পলকে চারদিকে দৃষ্টিপাত করেছিলাম। ঠিক তখনই আমাদের যথার্থ অবস্থানটা সম্বন্ধে ধারণা করে নিতে পারলাম। দেখলাম, মত্সকো স্ট্রাম ঘূর্ণাবর্তটা আমাদের থেকে খুব বেশি হলেও সামনে সিকি মাইলের মধ্যেই রয়েছে। সে-মুহূর্তে আকস্মিক অভাবনীয় আতঙ্কে আমার চোখ দুটো নিজে থেকেই বন্ধ হয়ে গেছে। আর প্রচণ্ড আতঙ্কে চোখের পাতা একসঙ্গ জুড়ে গেল। আসলে চোখের সামনে ভয়ঙ্কর সে দৃশ্যটাকে বরদাস্ত করতে আমাদের চোখ দুটো অক্ষম হয়ে পড়ল।
বেশিক্ষণ নয়, মাত্র দুমিনিট, দুমিনিট পেরোতে-না-পেরোতেই হঠাৎ লক্ষ্য করলাম, ঢেউ থেকে নেমে গিয়ে সমুদ্র প্রায় স্বাভাবিক হয়ে পড়েছে। আর সমুদ্রের একটা বড় ভগ্নাংশ, যতদূর চোখ যায় দেখা গেল ফেণা যেন ছেয়ে ফেলেছে।
আর আমাদের জাহাজটা বাঁ দিকে খাড়াভাবে বাঁক নিয়ে তীরগতিতে ছুটতে আরম্ভ করেছে। আর ঠিক বাতাসের কাঁধে ভর করে তখনই আচমকা সমুদ্রের তর্জন গর্জনকে ছাপিয়ে বুক-ফাটা এক আর্তস্বর এসে আমার মনে আঘাত হানল।
আমার মনে হলো হাজার কয়েক বাষ্পচারিত জাহাজ থেকে সবগুলো নল দিয়ে এক সঙ্গে তীর বেগে বাষ্প বের করে দেওয়া হয়েছে।
আমরা তখনও ঘূর্ণাবর্তের চারদিকের ফেণারাশির মধ্যেই অবস্থান করছি। আর এও মনে হলো, আর একটু পরেই তার অতল গহ্বরে আশ্রয় নেব, তলিয়ে গিয়ে চিরদিনের মতো নিশ্চিহ্ন হয়ে যাব।
না, যা আশঙ্কা করেছিলাম আসলে কিন্তু আদৌ তা হলো না। জাহাজটা ডুবল তো নাই বরং ঢেউয়ের শিখরে বুদ্বুদের মতো ভেসে চলতে লাগল।
যে শুনবে সেই আমার কথাটাকে গালগল্প বলেই উড়িয়ে দেবে, আমি ভালোই জানি। কিন্তু তা মনে হলেও যা সম্পূর্ণ সত্য, বাস্তব তাই তুলে ধরছি। আমার মধ্যে তখন একটা ভাবনারই উদয় হলো–এভাবে মৃত্যুবরণে কি মহত্বের ব্যাপার-স্যাপার কিছু আছে? আর সৃষ্টিকর্তার শক্তির এক অত্যাশ্চর্য প্রকাশের মুখোমুখি হয়ে নিজের জীবন রক্ষার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে নিজের জীবনরক্ষার উপায় ভাবাটা কি নিতান্তই নগণ্য ব্যাপার?
আমার ধারণা, সে মুহূর্তে কথাটা আমার মনের কোণে উঁকি দিতেই লজ্জায় আমার চোখ-মুখ রক্তিম হয়ে উঠল।
অল্পক্ষণের মধ্যেই আমি নিজেকে একটু সামলে-সুমলে নিলাম। প্রচণ্ড একটা কৌতূহল আমার মধ্যে ভর করল। একেবারেই অভাবনীয়, অবিশ্বাস্য সে কৌতূহল। কী সে কৌতূহল? ঘূর্ণাবর্তটার গভীরতা পরিমাপ করার জন্য আমার মধ্যে ইচ্ছা জাগল। আর তা আমাকে অস্থির করে তুলল।
নিজের চোখেই তো তুমি দেখলে, ঢেউয়ের পেটটা সমুদ্রের উপরিতল থেকে বেশ কিছুটা নিচু। আর সেটা এ মুহূর্তে আমাদের থেকেও উঁচু একটা কালো পাথরের দেওয়ালের মতো মাথা উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
একটা কথা বলছি, প্রবল ঝড়ের তাণ্ডবের মুখোমুখি যদি কোনোদিন না হয়ে থাক, সে সময় সমুদ্রে অবস্থান না করে থাক, তবে প্রবল বাতাস আর জলকণার একত্রে মেশামেশি হলে মনের কোণে সবকিছু কেমন গুলিয়ে যায় তা তোমার পক্ষে বোঝাই সম্ভব হবে না। তোমার চোখ দুটোকে তারা ধাঁধা লাগিয়ে যাবে। তোমাকে একেবারে বধির করে ফেলবে। আর দুহাতে সজোরে কণ্ঠনালী চেপে ধরবে। কাজ আর ভাবনা চিন্তা করার মতো ক্ষমতা লোপ করে দেয়।
সত্যি কথা বলতে কি, সেই ফেণার রাজ্যে কতবার সে চক্কর মেরেছি তা। বাস্তবিকই আমার পক্ষে বলা মুশকিল।
প্রায় একটা ঘণ্টা ধরে যে আমি কতবার ঘুরেছি, ভেসে বেড়ানোর পরিবর্তে উড়ে উড়ে বেরিয়েছি আর ক্রমেই তার ভেতরের ভয়ঙ্কর দিকটায় এগিয়ে চলেছি, এগোচ্ছি তো এগোচ্ছিই।
আমি কিন্তু সর্বক্ষণই বলয়টা জোর করে আঁকড়ে ধরেই থাকলাম।
