এদিকে মহামান্য জমিদার ফ্রেডারিক যখন বার্লিংকিজিং-এর আস্তাবল থেকে উদ্ভুত ক্রমেই বেড়ে চলা হৈ-হট্টগোল শুনছিল বা শোনার বাহানা করছেন বা নতুনতর কোনো নষ্টামিতে নিজেকে লিপ্ত করার কথা ভাবছেন, তখন নিজের অন্যমনষ্কতার মধ্যেই সম্পূর্ণ নিজের অজান্তেই হঠাই তার নজর গেল তুলির টানে অস্বাভাবিক রং আর কৌশলে আঁকা অতিকায় একটা ঘোড়ার ছবির দিকে।
সে ঘোড়াটাকে পর্দার ওপরে এমনভাবে দেখানো হয়েছে যেন সেটা চিরশত্রু ও প্রতিদ্বন্দ্বী আরবি পূর্বপুরুষদের সম্পত্তি। বাস্তবিকই অদ্ভুত ভঙ্গিতে সেটা দাঁড়িয়ে রয়েছে।
ছবিটার সামনের দিকটায় ঘোড়াটা দাঁড়িয়ে রয়েছে অবিকল পাথরের মূর্তির মতোই নিশ্চল-নিথরভাবে। সত্যি সেটা যেন এতটুকুও নড়াচড়াও করছে না।
আরও আছে। ঘোড়াটার ঠিক পিছনেই দেখা যাচ্ছে মেজেংগারস্টিন পরিবারের কোনো সৈনিকের ছুরির আঘাতে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে রয়েছে তার হতভাগ্য পরাজিত মৃত সওয়ার। রক্তে তার পোশাক পরিচ্ছদই কেবল নয়, সবুজ তৃণভূমির বেশ কিছু অংশও ভিজে গেছে।
নিজের অজান্তে দৃষ্টি কোথায়, কীসের ওপর পড়েছিলেন ফ্রেডারিক তা বুঝতে পারার ফলেই তার মধ্যে ধূর্ত ভাবে জগে উঠেছিল। কিন্তু বুঝতে পেরেও তিনি সেদিকে আর চোখ ফেরালেন না। তিনি চোখ ফেরালেন তো না-ই বরং তিনি কিছুতেই বুঝতে পারলেন না তার মধ্যে অন্তহীন উদ্বেগ উৎকণ্ঠা মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। আর তা ইন্দ্রিয়গুলোকে এমনভাবে আচ্ছন্ন করে তুলছে।
সে দৃশ্যটার দিকে তিনি যতবার, যতভাবেই তাকাতে লাগলেন ততবারই বেশি করে মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে পড়তে লাগলেন। আর এ-কারণেই তাঁর পক্ষে পর্দার আকর্ষণ থেকে নিজের চোখ দুটোকে ফিরিয়ে আনা অসম্ভব হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
ইতিমধ্যে বাইরের হৈ হট্টগোল বাড়তে বাড়তে এমন এক চরম সীমায় পৌঁছে যাওয়ার ফলে তিনি জোর করে মনকে জ্বলন্ত আস্তাবলটার ওপর থেকে ফিরিয়ে আনলেন। সেখান থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে তিনি ঘরের জানালা দিয়ে ভেতরে চলে আসা অত্যুজ্জ্বল আলোটার দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করলেন।
তবে সেদিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ রেখে তার পক্ষে বেশিক্ষণ থাকা সম্ভব হলো না। নিজে থেকেই দৃষ্টি ঘুরে গেল। এবার দৃষ্টি গিয়ে পড়ল দেওয়ালের ওপর।
তার মধ্যে আকস্মিক ভীতির সঞ্চার ঘটল, বিস্মিতও কম হলেন না। এবার চোখের তারায় ভীতি মিশ্রিত বিস্ময়ের ছাপ এঁকে তিনি অতিকায় ঘোড়াটার মাথার দিকে তাকালেন। বিস্ময়ে তার কপালের চামড়ায় পর পর কয়েকটা ভাঁজ আঁকা হয়ে গেল। তিনি লক্ষ্য করলেন, ঘোড়ার মাথাটার অবস্থান যেন ক্রমেই বদলে যাচ্ছে। এরকম অভাবনীয় পরিবর্তনটা তার মধ্যে এমনই ভীতির সঞ্চার করল যা তিনি একটু আগেও কল্পনা করতে পারেননি।
একটু আগেই তিনি যে দৃশ্য দেখেছিলেন তা হচ্ছে, ঘোড়ার মাথাটা যেন সহানুভূতিতে আপ্লুত হয়ে ঘাড়টাকে বাঁকিয়ে কাত হয়ে ঝুলে পড়েছে। আর সেটা ঝুলে পড়েছে নিজের প্রভুর এলিয়ে পড়ে-থাকা দেহটার ওপর।
আর এখন? এখন দেখছেন, সে ঘোড়াটা জমিদার ফ্রেডারিকের দিকে কিছু এগিয়ে এসেছে। আর কয়েক মুহূর্ত আগেও যে চোখ দুটো নজরের আড়ালে অবস্থান করছিল, এখন তাতে লক্ষিত হচ্ছে এক মানবিক ভাবের অভিব্যক্তি। চোখ দুটো দিয়ে যেন আগুনের শিখা জ্বল জ্বল করছে। চোখের মণি দুটো রীতিমত ঝিকমিক করছে।
আরও আছে, ক্রোধোন্মত্ত ঘোড়াটার বিস্ময়ে বিস্ফারিত মোটা-সোটা ঠোঁট দুটোর ফাঁক দিয়ে বিরক্তিকর দাঁতের পাটি দুটো পুরোপুরি এবং স্পষ্ট নজরে পড়ছে।
যুবক জমিদার আকস্মিক ভয় ভীতিতে কর্তব্য হারিয়ে ফেললেন। তিনি কি করবেন স্থির করতে না পেরে ধীর পায়ে দরজার দিকে এগিয়ে গেলেন। তার পা দুটো রীতিমত কাঁপছে। সোজাভাবে দাঁড়িয়ে থাকাই যেন তার পক্ষে মহা সমস্যার ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে।
নিজেকে কিছুটা সামলে নিয়ে দরজার পাল্লাটায় ধাক্কা দিলেন। সামান্য চাপ পড়তেই দরজাটা দুম্ করে খুলে গেল।
দরজাটা খুলে দেওয়ামাত্র লাল একটা আলোকরশ্মি ঘরের ভেতরে ঢুকে গেল। আলোকরশ্মিটা ঢুকে পড়ামাত্র ঝুলন্ত পর্দার ওপর নিজের ছায়াটা শিল্পীর আঁকা হালকা ছবির মতো ভেসে উঠল।
তবে এও সত্য যে, তিনি তখনও পুরোপুরি ঘরের ভেতরে না ঢুকে দরজার চৌকাঠের ওপর দাঁড়িয়ে রয়েছেন। তবু তার যেন মনে হলো যেখানে আরবি বার্লিংকিজিং-এর নির্মম নিষ্ঠুর ঘাতকের মূর্তি আঁকা আছে ঠিক সে জায়গাটায়ই গিয়ে পড়েছে। তিনি একই জায়গায় স্থবিরের মতো দাঁড়িয়েই সবিস্ময়ে সেটার দিকে তাকিয়ে রইলেন।
জমিদার অস্বাভাবিক অস্থিরতার মধ্যে কয়েক মুহূর্ত পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে থাকলেন। কিন্তু বেশিক্ষণ তার পক্ষে সেখানে দাঁড়িয়ে থাকা সম্ভব হলো না। নিদারুণ অস্থিরতা তার মধ্যে ভর করল।
কিন্তু বেশিক্ষণ তার পক্ষে সে-চাপ সহ্য করা সম্ভব হলো না। তিনি উদ্রান্তের মতো সেখান থেকে বেরিয়ে এসে বাইরে খোলা বাতাসে দাঁড়ালেন।
প্রাসাদের প্রধান ফটক ডিঙিয়ে বাইরে যাবার আগেই অশ্বপালের সঙ্গে তার দেখা হয়ে গেল। তারা প্রহরায় নিযুক্ত।
অশ্বপালকরা একটা ঘোড়াকে বশে আনার জন্য মরিয়া হয়ে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। সুবিশাল একটা বেয়াড়া ঘোড়া। তাকে সহজে বাগ মানানোই সমস্যার ব্যাপার। তাই তারা দীর্ঘসময় ধরে বহু পরিশ্রম ও কষ্টের মাধ্যমে কোনোরকমে তাকে তীব্র উত্তেজনায় বার বার লাফিয়ে ওঠা থেকে বিরত করার জন্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
