হ্যাঁ, অদম্য উৎসাহে শিকারের ঝুঁকি নিয়ে বৃদ্ধ কাউন্ট রোজ সকালেই প্রাসাদ থেকে বেরিয়ে পড়তেন।
অন্যদিকে মেজেংগারস্টিন পরিবারের ব্যারনের নাম ফ্রেডারিক। তার বয়স তেমন বেশি নয়। তার বাবা ছিলেন মন্ত্রী। যৌবনকালেই তিনি ইহলোক ত্যাগ করে অনন্ত সুন্দরের উদ্দেশ্যে পাড়ি জমান। তার মা ছিলেন লেডি মেরি। তিনিও অচিরেই তাকে অনুসরণ করেন, ইহলোক ত্যাগ করে যান।
যখন মা-বাবাকে হারান তখন ফ্রেডারিকের বয়স ছিল আঠারো বছর। আঠারো বছর একটা শহরে জীবন-যাপন করার ক্ষেত্রে কিন্তু মোটেই বেশি নয়। তার ওপর বয়সটাও যদি থাকে ভরা যৌবন। কিন্তু অঞ্চলটা যদি শহর তো দূরের ব্যাপার বড়সড় কোনো গ্রাম না হয়ে অখ্যাত অজ্ঞাত এক অঞ্চল হয়–সে পুরানো অঞ্চলে খুবই জনহীনতার মধ্যে ঘড়ির দোলকের টিক্ টিক্ শব্দও সেখানে গভীরতর অর্থবহ হয়ে ওঠে। অতএব এরকম একটা অজ পাড়াগাঁয়ে সময় তো বোঝা হয়ে উঠতে বাধ্য।
বাবা পরলোক পাড়ি জমানোর সঙ্গে সঙ্গে ব্যারন ফ্রেডারিক কতকগুলো বিশেষ কারণের জন্য তার জমিদারির মালিক বনে গেলেন। জমিদার একজন সত্যিকারের জমিদার বলতে যা বোঝায় ঠিক তাই।
সত্যি কথা বলতে কি, ফ্রেডারিকের আগে অন্য কোনো সম্মানীয় ব্যক্তি এত বড় জমিদারির মালিক হতে পারেননি।
জমিদার ফ্রেডারিকের দুর্গ ছিল অসংখ্য। মেজেংগারস্টিন প্রাসাদের জাঁকজমকের কথা ভাষার মাধ্যমে প্রকাশ করার চেষ্টা না করাই ভালো। আর আকারের দিক থেকেও দ্বিতীয় কোনো নজির চোখের সামনে ছিল না যাকে মেজেংগারস্টিনের পাশাপাশি দাঁড় করানো যেতে পারে। অর্থাৎ এক কথায় বলতে গেলে সে আসলে মেজেংগারস্টিন প্রাসাদই ছিল নিকট ও দূরবর্তী অঞ্চলের মধ্যে শ্রেষ্ঠত্বের দাবিদার। আর একটা কথা, তাঁর জমিদারি ছিল এতই বিশাল যে, জমিদারির সীমানা কোনোদিনই সঠিকভাবে নির্ধারণ করা হয়নি, করা সম্ভবই হয়নি। সবকিছু ছেড়ে দিয়ে যদি তার পার্কটার কথাই বিবেচনা করা যায় তবে দেখা যাবে, পঞ্চাশ মাইল অঞ্চল ব্যাপী ছিল তার ব্যাস।
জমিদারির মালিক সুপরিচিত চরিত্রের যুবক। ফ্রেডারিক যখন উত্তরাধিকার সূত্রে এমন বিশাল একটা সম্পত্তির মালিক তখনই তাকে ঘিরে চারদিকে কানাঘুষো শুরু হয়ে গেল। কীসের কানাঘুষা? কেন কানাঘুষা? তার ভবিষ্যৎ জীবনযাত্রা–আচার আচরণ কেমন হবে এ নিয়েই কানাঘুষা। সত্যি কথা বলতে কি, দু-চারজন এক সঙ্গে হলেই ফ্রেডারিককে নিয়ে ফিসফিসানি শুরু করে দেয়।
সত্যি কথা বলতে কি, তিনটি দিন না যেতেই জমিদারির নতুন যুবক মালিকটির আচার-ব্যবহার হেরডকেও পিছনে ফেলে দুর্বার গতিতে এগিয়ে চলল। আরও আছে। আচার ব্যবহার তাঁর হিতাকাঙ্খী বন্ধু-বান্ধবদের প্রত্যাশাকে দ্রুত ছাড়িয়ে গেল।
তার নিজস্ব বল্গাহীন ব্যাভিচার চরমতম বিশ্বাসঘাতকতা আর অবর্ণনীয় ও অভূতপূর্ব অন্যায় উৎপীড়ন তার ভীত-সন্ত্রস্ত প্রজাদের অল্প সময়ের মধ্যেই বুঝিয়ে দিল যে, তারা যতই তার বশ্যতা স্বীকার করুক না কেন, তার নিজের বিবেক যতই সাফ সুতরা হয়ে উঠুক না কেন, কোনো প্রয়াসই এ সহজ-সরল আর অতি সাধারণ মাপের মানুষগুলোর নির্মম-নিষ্ঠুর আঘাত থেকে রেহাই দিতে পারবে না।
এভাবে নানা জল্পনা-কল্পনা আর আতঙ্কের মধ্য দিয়ে তিনটি দিন কেটে গেল।
চতুর্থ দিনের রাত এলো। সে রাতেই হঠাৎ দেখা গেল বার্লিংকিজিং দুর্গের আস্তাবলের মাথা দিয়ে আগুনের হলকা বের হচ্ছে। অতর্কিত আগুনে সবকিছু পুড়ে ছাড়খার হয়ে যাচ্ছে।
এমন নির্মম নিষ্ঠুর ঘটনাটার কারণ সম্বন্ধে নিশ্চিত হতে আশপাশের মানুষগুলোর মোটেই অসুবিধা হলো না। আর এ ব্যাপারে ছোট বড় সবাই একমত, ব্যারন অর্থাৎ ফ্রেডারিক এই দুষ্কর্মের জন্য দায়ী। আর তার ভয়ঙ্কর সব দুর্ব্যবহারও নির্মম নিষ্ঠুর। কাজের সংখ্যার সঙ্গে আস্তাবলের অগ্নিসংযোগের অপরাধটাকে জুড়ে দিয়ে আরও একটা সংখ্যা বাড়িয়ে দিল। আতঙ্কগ্রস্ত মানুষগুলো আড়ালে-আবডালে ছি ছি করতে লাগল।
তবে ব্যাপারটা কিন্তু এত সহজে মিটল না। ব্যাপারটাকে নিয়ে যখন সে অঞ্চলের সর্বত্র রীতিমত আলোড়ন সৃষ্টি হলো তখন যুবক জমিদার ফ্রেডারিক মেজেংগারস্টিন প্রাসাদের দোতলার একটা নির্জন কক্ষে ধ্যানমগ্ন ঋষির মতো গুম্ হয়ে বসে রইলেন।
দীর্ঘ ব্যবহারের ফলে জীর্ণ হয়ে-আসা মূল্যবান পর্দাগুলো দেওয়ালের গায়ে হালকা বাতাসে বার বার উড়ে বেড়াচ্ছে। আর তারই ওপরে অবস্থান করছে বহু খ্যাতিমান পূর্বপুরুষদের ফ্যাকাশে হয়ে পড়া সুবিশাল প্রতিকৃতিগুলো।
কোনো একটা ছবিতে হয়তো চিত্রশিল্পী তার নিপুন তুলির টানে ফুটিয়ে তুলেছেন পশমের বহুমূল্য পোশাকে সুসজ্জিত মহামান্য পোপ আর যাজকদের পদস্থ কর্মচারীরা স্বেচ্ছাচারী জমিদারের কাছাকাছি পাশাপাশি বসে কোনো এক রাজার বাসনাকে বানচাল করে দিচ্ছে।
আর একটা ছবিতে হয়তো ব্যক্ত করা হয়েছে, মহামান্য পোপনিজ ক্ষমতাবলে নির্দেশ জারির মাধ্যমে পরম শত্রু বিদ্রোহী রাজাকে সংযত করছেন। আবার অন্য আর একটি ছবিতে আঁকা হয়েছে, মেজেংগারস্টিন রাজা রাজরাদের অতিকায় সব প্রতিকৃতি। তাদের বলবান যুদ্ধের ঘোড়াগুলোর খুরের চাপে মৃত সৈন্যদের শবদেহ। এগুলোতে চিত্রশিল্পী এমন সব দৃশ্য ফুটিয়ে তুলেছেন যা চোখের সামনে দেখলে ঘনিষ্ঠ স্নায়ুর অধিকারী ব্যক্তিও স্তম্ভিত হয়ে পড়তে বাধ্য। আর একটা ছবিতে শিল্পী অতীতকালের বিলাসপরায়ণা রূপসিদের ভাবভঙ্গি চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। এতে দেখানো হয়েছে তারা দলবদ্ধভাবে নাচতে নাচতে অবিশ্বাস্যভাবে ক্রমে দূরে মিলিয়ে যাচ্ছে।
