ম্যাগির বইটা আসলেই খুব ভালো। তার বইতে অনেক ভালো ভালো গল্প আছে। তার লোহা-বাঁধানো বিষণ্ণ বইটার গল্পগুলোর কথা বলছি। সত্যি গল্পগুলো ভালো। আমি সে-সব গল্প মনোযোগ দিয়ে পড়েছি। আমি বলছি, তাতে লেখা আছে আকাশের গল্প, পৃথিবীর গল্প আর মহাসাগরের গৌরবময় ইতিকথা–আর আছে সেসব জিনদের গল্প যারা সমুদ্র, পৃথিবী আর আকাশকে শোষণ করত।
সাইবিলসও বহু কাহিনী–গল্প বলে গেছেন। প্রাচীন পুঁথিপত্রের পাতায় পাতায় বহু ভালো ভালো কথা লেখা আছে। কিন্তু আল্লাহর কৃপায়, সমাধির গায়ে বসে দৈত্য। আমাকে যে গল্পটা বলেছিল সেটাকেই আমি সবচেয়ে অদ্ভুত ও আশ্চর্য মনে করছি।
গল্পটা শেষ করে দৈত্য উঠে আবার কবরের মুখের কাছে গেল। সরবে হেসে উঠল।
আমি কিন্তু তার সঙ্গে গলা মিলিয়ে হাসতে পারলাম না। আর এরই জন্য দৈত্য ক্রোধে ফুঁসতে লাগল। আমাকে অভিশাপ দিল। আর ভামটা এতদিন কবরে গর্ত খুঁড়ে বাস করত সে হুড়মুড় করে গর্ত থেকে বেরিয়ে এলো। তারপর ছুটতে ছুটতে এগিয়ে গিয়ে দৈত্যের পায়ের কাছে টান টান হয়ে শুয়ে পড়ল। তারপর নিষ্পলক চোখে তার মুখের দিকে চেয়ে রইল। নিশ্চল নিথর তার দৃষ্টি।
মেজেংগারস্টিন
বিভীষিকা!
বিভীষিকা আর ভবিতব্যতা সত্যি যদি সবকালে সমানভাবে চলেই থাকে তবে আমি এখন যে গল্প ফাঁদতে চলেছি তার তারিখ উল্লেখ করার প্রয়োজন কি, বুঝছি না তো। আর কেনই বা আমি এ-কাজে উৎসাহি হব?
আমি যা বুঝেছি তা হচ্ছে, কেবলমাত্র এ-কথা উল্লেখ করলেই তো যথেষ্ট যে, আমি বর্তমানে যে সময়ের কথা বলছি তখন হাঙ্গেরির মাঝামাঝি এক অঞ্চলের মানুষের মনে জন্মান্তরবাদের একটা দৃঢ়বিশ্বাস জগদ্দল পাথরের মতো চেপে বসেছিল। তবে সে বিশ্বাসটা যতই নিশ্চিত হোক না কেন গোপনও ছিল বটে। তবে একটা কথা গোড়াতেই বলে রাখছি, সে মতবাদ–মানুষের মনের নিশ্চিত অথচ গোপন সে বিশ্বাস মিথ্যা বা আদৌ সম্ভাব্য কি না, সে প্রসঙ্গে আমি হ্যাঁ বা না কোনো বক্তব্যই পেশ করতে নারাজ–করবও না। অর্থাৎ আমি শুধুমাত্র ঘটনাটাকে আপনাদের সামনে সাধ্যমত সহজ সরল ভাষায় খোলাখুলিভাবে ব্যক্ত করব। ব্যস, এর বেশি কিছুই নয়।
কুসংস্কার!
তবে এও সত্য যে, হাঙ্গেরির সে কুসংস্কারের মধ্যে এমন কোনো বক্তব্যই ছিল না যা যুক্তিবিরুদ্ধ অসঙ্গতির দিকে যারপরনাই দ্রুততালে এগিয়ে যাচ্ছিল।
তবে আমি এ-কথাও বলতে পারি যে, এ প্রসঙ্গে প্রাচ্যের পণ্ডিত ব্যক্তিদের মতামতের সঙ্গে হাঙ্গেরিয় বিশেষজ্ঞদের মতামতের বহুদিক থেকে মূলগত পার্থক্য বর্তমান। আর সে পার্থক্য কিন্তু একটু-আধটুই নয়, অনেক বেশিই ছিল।
আজ থেকে নয়, বেশ কয়েক শতক ধরেই মেজেংগারস্টিন আর বার্লিংকেজিং পরিবার দুটোর মধ্যে শক্ততা চলছে। পরিবার দুটোর মধ্যে শত্রুতা বর্তমানে যেমন মারাত্মক রূপ ধারণ করেছে, আগে কিন্তু এত প্রকট ছিল না।
পরিবার দুটোর মধ্যে শত্রুতার প্রকৃত কারণ এবং উৎস খুঁজতে গেলে আমাদের বহুদূরে পিছিয়ে যেতে হবে। দেখা যাবে, একটা প্রাচীন ভবিষ্যদ্বাণীতে তাদের শত্রুতার উদ্ভবের প্রকৃত কারণ লুকিয়ে রয়েছে।
সে ভয়ঙ্কর ভবিষ্যদ্বাণীটা হচ্ছে–‘ঘোড়সওয়ারে জয় যেমন তার ঘোড়ার ওপর নির্ভর করে, ঠিক একই রকমভাবে বার্লিংকজিং পরিবারের অমরত্বের ওপর যখন মেজংগারস্টিন পরিবারের মরণশীলতা জয়ী হবে, তখনই একটা সহজ নামের মারাত্মক পতন ঘটে যাবে।’
বিচার বিবেচনা করে দেখলে আসলে কিন্তু এসব কথা তিলমাত্রও অর্থবহ ছিল না। তবে? তবে বহুদিন আগের কয়েকটা খুবই সামান্য কারণ থেকেই এরকম কিছু ঘটনার উদ্ভব ঘটেছিল, খুবই সত্য। আর যে কারণ ছিল তা হচ্ছে, জমিদারি দুটোর কাছাকাছি, পাশাপাশি অবস্থানও এর জন্য কম দায়ী নয়। তাদের পাশাপাশি অবস্থানের। জন্য তাদের শাসনকার্য পরিচালনা এবং অন্যান্য কাজের দিক থেকেও উভয়পক্ষের মধ্যে একটা প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক মানসিকতার সূত্রপাত হয়। আর তা তিলে তিলে বাড়তে বাড়তে বর্তমানের তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার রূপ নেয়।
শুধু কি এই? আরও আছে। তার ওপর বাস্তব ক্ষেত্রে দেখা যায়, নিকট প্রতিবেশীরা খুব কম ক্ষেত্রেই বন্ধুভাবাপন্ন হয়ে থাকে।
আর দেখা গেছে বালিংকেজিং দুর্গের অধিবাসীরা তাদের প্রাসাদের খুবই উঁচু জানালা থেকে চারদিকে ভালোভাবে দৃষ্টিপাত করতে পারত। তাই বংশপরম্পরা হিংসা ও বিদ্বেষের বিষ বুকে নিয়ে দিনাতিপাতের মাধ্যমে বিবাদের ফলে পরিবার দুটো যখন আগে থেকেই বিবাদে লিপ্ত ছিল তখন ভবিষ্যদ্বাণীর বক্তব্য যে তাদের আরও অনেক অনেক বেশি রেষারেষিতে অনুপ্রাণিত করবে, আরও বেশি দূরে সরিয়ে নিয়ে যাবে, তাতে আর অবাক হবারই বা কি থাকতে পারে?
এখন কথা উঠতে পারে, ভবিষ্যদ্বাণীটার অর্থ কি? প্রকৃতপক্ষে যদি তা অর্থবহ হয়ে থাকে অর্থাৎ এর যদি কোনো অর্থ থাকে তবে তা শেষাবধি জয়লাভ করবে। আর এ কারণেই স্বল্প প্রভাব প্রতিপত্তিশালী ও দুর্বলতর পক্ষই পরিবার দুটোর তিক্ততার শত্রুতাকেই অন্তরের অন্তরতম কোণে পোষণ করে চলেছে।
বার্লিকেজের কাউন্ট উইলহেলম তিনি উচ্চ কুলোদ্ভব হয়েও এ কাহিনীর সময়ে তিনি ছিলেন বার্ধক্যের ভারে জর্জরিত অথর্ব, পঙ্গু এক বৃদ্ধ।
শত্ৰু পরিবারের প্রতি অস্বাভাবিক শত্রুতা ছাড়া আর কোনো লক্ষ্যণীয় বৈশিষ্ট্য বৃদ্ধ কাউন্টের মধ্যে ছিল না। আর এ শত্রুতা তিনি দীর্ঘদিন যাবত্র অন্তরের অন্তরতম কোণে সযত্নে পোষণ করে চলেছেন। তবে স্বীকার না করে উপায় নেই যে, ঘোড়ায় চড়া আর শিকারের প্রতি উৎসাহ তার এত বেশি মাত্রায় ছিল যে বার্ধক্য, অথর্ব-প্রায় পঙ্গু শরীর আর মানসিক অসমতা সত্ত্বেও তিনি রোজই শিকারের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়তেন। এটাকে নিতান্তই ঝুঁকি নেওয়া ছাড়া আর কি-ই বা বলা যেতে পারে?
