এদিকে আমি জলাভূমির লতানো গাছের ঝোঁপঝাড়ের আড়াল থেকে স্থির দৃষ্টিতে সে লোকটার কাণ্ডকারখানা দেখতে লাগলাম।
আর সে নির্জন নিরালায় থর থর করে কাঁপতে আরম্ভ করল।
এদিকে রাত শেষ হতে চলেছে। প্রকৃতির বুকে ভোরের আলো ফুটে না উঠলেও এটুকু অন্তত বুঝা যাচ্ছে ভোর হতে আর বেশি দেরি নেই। লোকটা কিন্তু উঠল তো
-ই বরং একই ভঙ্গিতে পাহাড়ের শীর্ষে আগের মতোই ঠায় বসেই রইল। ওঠা তো দূরের কথা, সামান্য নড়াচড়াও করল না।
আমি সেখানে আর থাকার দরকার বোধ করলাম না। তাই লতানো গাছের ঝোঁপের আড়াল থেকে বেরিয়ে জলাভূমির ওপর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে হাজির হলাম এমন একটা জায়গায়, যেখানে জলহস্তীর মেলা বসেছে।
জলহস্তির পালকে সামনে দেখে আমার মধ্যে কৌতূহলের সঞ্চারও হল। আনন্দও কম হলো না।
আমি মুখে বিচিত্র এক শব্দ করে তাদের কাছে ডাকলাম। তারা মুখ তুলে আমার দিকে তাকাল। তারা সেখান থেকে বেরিয়ে এসে পাহাড়টার পাদদেশে চাঁদের আলোয় দাঁড়িয়ে বুক কাঁপানো ভয়ঙ্কর তর্জন গর্জন শুরু করে দিল।
আমি সেখান থেকে দৃষ্টি তুলে নিয়ে পাহাড়ের শীর্ষদেশে বসে থাকা লোকটার দিকে তাকালাম। দেখলাম, সে এখনও নির্জনতা ও নিঃসঙ্গতায় বসে আগের মতোই অনবরত কেঁপেই চলেছে।
এদিকে রাত বাড়তে বাড়তে ক্রমেই ফুরিয়ে আসছে। আর সে-ও পাহাড়ের শীর্ষে আগের মতো একই ভঙ্গিতে বসে রয়েছে। আমি এবার আর নিজেকে সংযত রাখতে পারলাম না। নিতান্ত কোনো উপায় না দেখে প্রকৃতিকে উদ্দামতার অভিশাপ দিলাম।
ব্যাস, আর এক মুহূর্তও দেরি হলো না–ভয়ঙ্কর ঝড় উঠল, ঝড়ের প্রকোপে সবকিছু তোলপাড় হতে লাগল। অথচ কয়েকমুহূর্ত আগেও সেখানে ঝড় বা প্রবল বাতাস তো দূরের কথা একটা গাছও নড়তে দেখা যায়নি।
সে যে কী ভয়ঙ্কর ঝড়, প্রলয়কাণ্ড ঘটে চলেছে তা ভাষায় বর্ণনা করা সম্ভব নয়। ঝড়ের প্রকোপে কিছুক্ষণের মধ্যেই আকাশের রং পাল্টাতে পাল্টাতে ক্রমে সিসার রং ধারণ করল।
পাহাড়ের ওপরে অবস্থানরত লোকটার মাথায় টপ টপ করে বৃষ্টির ফোঁটা পড়তে লাগল।
কিছুক্ষণ মুষলধারে বৃষ্টি পড়ার পর নদী ভরে গেল, ফুলে ফেঁপে উঠল। দুকূল ছাপিয়ে বন্যা দেখা দিল আর রাশি রাশি ফেণা জমে উত্তাল-উদ্দাম রূপ ধারণ করল।
ঝড়ের তাণ্ডব আর পানির প্রচণ্ড ধাক্কায় বিশাল গাছগাছালি হুড়মুড় করে মুখ থুবড়ে পড়তে লাগল। চিরিক্-চিরিক করে বিদ্যুৎ ঝলকাতে লাগল, বিকট আওয়াজ করে বাজ পড়তে লাগল আর পাহাড়ের ভিত পর্যন্ত বার বার কেঁপে কেঁপে উঠতে লাগল। সব মিলে এমন প্রলয়কাণ্ড ঘটাতে লাগল তা আর কহতব্য নয়।
আমি সেখানে অবস্থান করেই সে লোকটার কার্যকলাপ দেখতে লাগলাম। সে আগের মতোই নির্জনতা আর নিস্তব্ধতায় সমানভাবে কেঁপেই চলেছে। কিন্তু এদিকে রাত বাড়তে বাড়তে ফুরিয়ে আসতে চলেছে তবুও সে ঠায় বসেই রয়েছে।
আমার পক্ষে আর ক্রোধ সম্বরণ করা সম্ভব হলো না। ক্রোধে ফোঁস ফোঁস করতে করতে তাকে অভিশাপ দিলাম। কেবলমাত্র তাকেই নয়, আমি অভিশাপ দিলাম নির্জনতা আর নৈঃশব্দকে, উত্তাল-উদ্দাম নদীকে, লতানো ফুলগাছকে, প্রবল বাতাসকে, অরণ্যের আকাশছোঁয়া গাছগুলোকে, কুয়াশার আস্তরণে ঢাকা আকাশকে, গুরুগম্ভীর স্বরের বজ্রকে, অতি উজ্জ্বল বিদ্যুচ্ছটাকে।
ক্রোধান্মত্ত আমার অভিশাপে জর্জরিত হয়ে তারা গতি হারিয়ে স্থিও নিশ্চল-নিথর হয়ে পড়ল।
চাঁদ আর আগের মতো কাঁপতে কাঁপতে আকাশপথে হেঁটে বেড়াচ্ছে না, বজ্রের অপমৃত্যু ঘটল, বিদ্যুৎ থমকে গিয়ে আর চমকাতে পারল না, মেঘের দল গতি হারিয়ে নিশ্চল হয়ে আকাশের গায়ে অলসভাবে ঝুলতে লাগল। একটু আগে ফুলে ফেঁপে থাকা জলরাশি আবার নেমে গিয়ে স্বাভাবিক হয়ে গেল, সুউচ্চ গাছগুলো আর দাপাদাপি করছে না, লতানো গাছের ফুলগুলো দীর্ঘশ্বাস ছাড়া বন্ধ করে দিয়েছে আর অন্তহীন মরুপ্রান্তরে সামান্যতম শব্দও হচ্ছে না।
আমি আবার ঘাড় ঘুরিয়ে পাহাড়ের গায়ে খোদিত অক্ষরগুলোর দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করলাম। নিঃসঙ্গতা শব্দটাকে খুঁজে পাওয়ার জন্য বার বার চেষ্টা করতে লাগলাম। হতাশই হতে হলো আমাকে। আগেকার সে অক্ষরগুলো যেন কোথায় হারিয়ে গেছে। আর সে জায়গাটা দখল করেছে কয়েকটা নতুন অক্ষর। নতুন একটা শব্দ আমার চোখের সামনে ফুটে উঠল–‘নৈঃশব্দ। অবাক না হয়ে পারলাম না।
আমি আবার মুখ তুলে পাহাড়ের ওপরে অবস্থানরত লোকটার দিকে তাকালাম। তার মুখের ওপর আমার দৃষ্টি নিবদ্ধ হল। লক্ষ্য করলাম, আকস্মিক আতঙ্কে তার মুখটা যেন চকের মতো ফ্যাকাশে হয়ে গেছে।
তার দিকে আমার চোখ পড়তেই সে অতর্কিতে সচকিত হয়ে পড়ল। যন্ত্রচালিতের মতো হাতের ওপর থেকে মাথাটাকে তুলে নিল। তেমনি ব্যস্ততার সঙ্গে উঠে দাঁড়িয়ে পড়ল। কিন্তু সুবিস্তীর্ণ মরু অঞ্চলগুলোয় কোনো শব্দই নেই।নিস্তব্ধতা বিরাজ করছে মরুভূমির বুকে। আর? আর পাহাড়ের গায়ে খোদাই করা শব্দ-নৈঃশব্দ’।
লোকটা সচকিত হয়ে পড়ল। তার সর্বাঙ্গে অবর্ণনীয় শিহরণ জেগে উঠল। অনবরত থর থরিয়ে কাঁপতে লাগল। ঘাড় ঘুরিয়ে বার কয়েক এদিক-ওদিক তাকাল। তারপর ব্যস্ত পায়ে এগিয়ে চলল। হাঁটতে লাগল। ঘাড় ঘুরিয়ে বার কয়েক এদিক ওদিক তাকাল। তারপর ব্যস্ত পায়ে এগিয়ে চলল। হাঁটতে হাঁটতে দূরে, বহু দূরে চলে গেল। এক সময় সে একেবারে আমার দৃষ্টির বাইরে চলে গেল। তাকে আর এক মুহূর্তের জন্যও দেখতে পেলাম না।
