কেবলমাত্র শাখা-প্রশাখা আর পাতার কথাই নয়, তাদের শেকড়ের তলায় বিচিত্র সব বিষফুল গা-জড়াজড়ি করে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন থাকে। আর মাথার ওপরে? মাথার ওপরে জমাটবাধা টুকরো টুকরো মেঘ নিশ্চিন্ত অলসভাবে পূর্ব থেকে পশ্চিমে ধেয়ে চলে। এমনিভাবে ধীর মন্থরগতিতে ভাসতে ভাসতে এগিয়ে গিয়ে দিগন্তের প্রাচীরের ওপর মুষলধারে অনবরত ঝরতে থাকে। আরও আশ্চর্য ব্যাপার হচ্ছে, সেখানে। তিলমাত্র বাতাসের অস্তিত্বও নেই।
আর জাইরে নদীর উভয় তীরে নিস্তব্ধতা তো নেই-ই বরং অভাবনীয় আনন্দ ফুর্তি হৈ-হল্লা বিরাজ করছে। সেখানকার প্রতিটা অঞ্চল, প্রতিটা বস্তির মানুষ যেন সর্বদা আনন্দে মশগুল। প্রকৃতির বুকে তখন রাতের অন্ধকার বিরাজ করছে। অনবরত বৃষ্টি পড়েই চলেছে। যখন পড়ছিল তখন তাকে বৃষ্টিই বলা চলে, তবে তারপর যা শুরু হলো তাকে রক্ত না বলে উপায় নেই।
আমি তখন লতানো গাছগাছালির লম্বা বিশভূমিতে দাঁড়িয়ে ছিলাম। একা আমি, একেবারে একাই দাঁড়িয়ে ছিলাম। আমার মাথায় টপ টপ করে বৃষ্টি পড়তে লাগল। আর নির্জনতা ও নিস্তব্ধতার বিমর্ষতা হেতু লতানো গাছের ফুলগুলো একে অন্যের দিকে ফিরে চাপা দীর্ঘশ্বাস বাতাসে ছড়িয়ে দিয়ে বাতাসকেও যেন বিষময় করে তুলছে।
হঠাৎ একেবারে হঠাই হালকা ও ভৌতিক কুয়াশার আস্তরণ ভেদ করে আকাশের গায়ে চাঁদ উঠল। রূপালি চাঁদটা দেখতে দেখতে রক্তবর্ণ ধারণ করল।
নদীর তীর ঘেঁষে যে সুউঁচু একটা ধূসর পাহাড় সদম্ভে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে রয়েছে সেটার দিকে আমার নজর গেল।
আমি কিছু সময় পাহাড়টার দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করে দাঁড়িয়ে রইলাম। তার গায়ে চাঁদের আলো পড়ায় সেটাকে ভালোভাবেই দেখা যাচ্ছে।
পাহাড়টা যে কেবলমাত্র উঁচু ও ধূসর রং বিশিষ্ট তা-ই নয় রীতিমত বিবর্ণও বটে।
চাঁদের আলোয় দেখা যাচ্ছে, পাহাড়টার সামনে, পাথরের গায়ে বড় বড় করে বহু অক্ষর খোদাই করে রাখা হয়েছে।
পার্বত্য উপত্যকার জলাজমির ওপর দিয়ে, লতানো ফুলগাছগুলোর ওপর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে আমি এক সময় তীরের কাছাকাছি একটা জায়গায় হাজির হলাম। আমার উদ্দেশ্য পাহাড়ের গায়ে খোদাই করা অক্ষগুলোর পাঠোদ্ধার করা। অতএব হাঁটতে হাঁটতে এমন একটা জায়গায় গিয়ে দাঁড়ালাম যাতে সে অক্ষরগুলোকে পড়া সম্ভব হয়। কিন্তু হায়! সে অক্ষরগুলো যে কোনো ভাষার তা-ই আমার পক্ষে উদ্ধার করা সম্ভব হলো না। অতএব পড়তে পারার প্রশ্নই ওঠে না।
আমি হতাশ হয়ে শেষপর্যন্ত জলাজমির দিকে ফিরে যাবার জন্য পা বাড়ালাম। সামান্য এগোতেই কুয়াশার হালকা আস্তরণ ভেদ করে চাঁদ উঠল। একেবারে রক্তিম তার বর্ণ।
চাঁদ উঠতেই আমি ঘাড় ঘুরিয়ে–আবার পিছন দিকে তাকালাম। পাহাড়টার ওপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করলাম। সামান্য পিছিয়ে গিয়ে আবার অক্ষরগুলোর কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম। চাঁদের আলো পড়ায় অক্ষরগুলো স্পষ্ট হয়ে উঠল।
একটু আগে যে অক্ষরগুলো আমার পক্ষে পাঠোদ্ধার করা তো দূরের কথা কোনো ভাষায় তাও বুঝতে পারছিলাম না, এবার চাঁদের আলোয় আমার সে সমস্যা আর রইল না। নিঃসঙ্গতা শব্দটাকে আমি অনায়াসেই পড়তে পারলাম।
মুখ তুলে ওপরের দিকে তাকালাম, পাহাড়টার দিকে। মনে হল, পাহাড়ের শীর্ষে একজন দাঁড়িয়ে রয়েছে দেখতে পেলাম।
অনুসন্ধিৎসু নজরে পাহাড়ের শীর্ষে দাঁড়িয়ে থাকা মনুষ্য মূর্তিটার দিকে তাকিয়ে থেকে শেষপর্যন্ত নিঃসন্দেহই হলাম, একটা মানুষই দাঁড়িয়ে রয়েছে।
সে লোকটার গতিবিধির ওপর গোপনে নজর রাখার জন্য আমি দ্রুত জলাজমির লতানো গাছের ঝোঁপের আড়ালে গা-ঢাকা দিয়ে দিলাম। ভালোভাবে দেখার পর আমি বুঝলাম, লোকটা দীর্ঘদেহী আর বিশাল বপুধারী। আর প্রাচীন রোমের টোগা দিয়ে তার আপাদমস্তক আবৃত।
আমি অনুসন্ধিৎসু নজরে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে লক্ষ্য করলাম, লোকটার দেহরেখা তেমন স্পষ্ট নয়। তবে দেবতার মতোই তার দৈহিক গঠন।
রাতের স্বচ্ছ আবরণ, হালকা কুয়াশার আবরণ আর কুয়াশার আড়াল থেকে উঁকি দেওয়া চাঁদ ও শিশিরের স্বচ্ছ আবরণ আর লোকটার মুখাবয়বটাকে ঢেকে দিতে পারেনি। তাই স্পষ্টই দেবতার মতোই দেহসৌষ্ঠবটাকে স্পষ্টই দেখা যাচ্ছে। এমনকি তার চিন্তায় উন্নত জঁ দুটো পর্যন্ত আমার নজরে পড়ল। তার চোখ দুটোর ওপর আমার দৃষ্টি নিবদ্ধ হতেই আমি লক্ষ্য করলাম, সে দুটো গভীর চিন্তায় উভ্রান্ত। আর তার চিবুক? চিবুকে কয়েকটা মাত্ৰ ভাঁজ পড়েছে। তাতেই দুঃখের কাহিনী পড়া আমার পক্ষে সম্ভব হল।–ক্লান্তি-অবসাদ, মনুষ্য সমাজের প্রতি বিরক্তি, নির্জনতা আর নিঃসঙ্গতার বাসনা।
আমি লোকটার দিকে অপলক চোখে তাকিয়েই রইলাম। সে পাহাড়টার শীর্ষে অদ্ভুত ভঙ্গিতে বসে রয়েছে। একটা হাত ভাঁজ করা। আর সেটার ওপর মাথাটাকে রেখে হেলান দিয়ে সে বসে।
লোকটা অদ্ভুত ভঙ্গিতে বসে জনমানবশূন্য প্রান্তরের দিকে উদাস-ব্যাকুল দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছে।
কয়েকমুহূর্ত প্রান্তরটার উপর দৃষ্টি নিবদ্ধ রেখে সে এক সময় সেখান থেকে চোখ দুটোকে তুলে এনে অশান্ত, দোদুল্যমান ঝোঁপঝাড়ের ওপর নিবদ্ধ করল। পর মুহূর্তেই ওপরে অবস্থানরত সুদীর্ঘ প্রাচীন বনভূমির ওপর দৃষ্টি স্থির করল। তারপর সে আরও, আরও ওপরে, আকাশের গায়ে ঝুলন্ত রক্তিম চাঁদটাকে দেখতে লাগল বিস্ময় মাখানো দৃষ্টিতে।
