ব্যাপারটা পুলিশ অফিসারদের মনে বিস্ময়ের সঞ্চার করল। উপায়ান্তর না দেখে তাদের একজন প্রায় বুকে হেঁটে খাটের নিচে ঢুকে বাক্সটার ভেতরে দৃষ্টি নিবদ্ধ করে বলে উঠল–‘দেখুন, বাক্সটাকে টানাটানি করেও আমরা যে এক তিলও নড়াতে পারিনি তাতে অবাক হবার কিছুই নেই। কি করেই বা নড়াব? পুরনো পিতলের টুকরো দিয়ে বাক্সটা একেবারে বোঝাই।’
কথাটা বলেই সে এবার তার বলিষ্ঠ পা দুটোকে দেওয়ালে ঠেকিয়ে শরীরের সর্বশক্তি দিয়ে বাক্সটাকে ঠেলতে লাগল। আর তার সহকর্মীরা সবাই মিলে সেটার আংটা ধরে দাঁতে দাঁত চেপে টানতে লাগল।
এভাবে উভয়ের মিলিত প্রচেষ্টায় দুদিক থেকে টানাটানির ফলে বহুকষ্টে বাক্সটাকে বিছানার তলা থেকে বের করে আনা সম্ভব হল। এবার তার ভেতরে হাত চালিয়ে জিনিসপত্র ঘাঁটাঘাঁটি করে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হল।
বাক্সটার ভেতর থেকে বের করা হলো বেশ কয়েকটি মসৃণ ও চকচকে ধাতব টুকরো–এক-একটার আকার মটরদানা থেকে পর্যন্ত বিভিন্ন মাপের।
তদন্তকারী পুলিশ অফিসারদের মধ্যে কারোই মাথায় এলো না যে, ধাতব টুকরোগুলো পিতল ছাড়া অন্য কোনো ধাতু হতে পারে। আর এগুলো যে সোনা হওয়াও কিছুমাত্র বিচিত্র নয়, কেউ অনুমানও করতে পারল না।
পরদিন সকাল হতে না হতেই ব্রোমন নগরের মানুষ জানতে পারল যে, পুলিশ অফিসাররা যে সব পিতলের টুকরো গাড়ি ভর্তি করে থানায় নিয়ে গেল, অথচ সেগুলোর মধ্য থেকে কেউ একটা কণাও পকেটে ভরেনি সেগুলো সবই খাঁটি সোনা ছিল। খাঁটি সোনা বলতে বুঝাতে চাচ্ছি, যে সোনা মুদ্রা তৈরির কাজে ব্যবহার করা হয়, তার চেয়ে অনেক উস্কৃষ্ট ধরনের সোনা। খাঁটি, পুরোপুরি খাঁটি সোনা বলতে যা বোঝায়।
আমি এখানে ভন কেমপেলেনের স্বীকারোক্তি আর তার মুক্তি সংক্রান্ত বিশদ বিবরণ উল্লেখ করব না। কারণ? কারণ, একটাই। সে সব কথা তো আর কারোই অজানা নয়। তিনি যে একজন দার্শনিকদের পরশমণির হদিস পেয়েছিলেন, কোনো সুস্থ-স্বাভাবিক মানুষই তাকে সন্দেহ করবে না, ভুলেও না।
তবে সহজ কথাটা এই যে, আজ পর্যন্ত যত কিছু বিশ্লেষণ করা হয়েছে সবই দারুণভাবে ব্যর্থ হয়েছে। কিন্তু কিভাবে তা আমাদের পক্ষে জানা সম্ভব হবে? ভন কেমপেলেন নিজে থেকে এ-রহস্যটা আমাদের কাছে যতদিন সমাধান না করবেন ততদিন এ-ব্যাপারটা পর্দার আড়ালেই রয়ে যাবে।
তাঁর গবেষণার ব্যাপার স্যাপার দেখে ভালোভাবেই বুঝা গেল, কিছু সংখ্যক অজ্ঞাত পদার্থ অজানা অনুপাতে মিশিয়ে ইচ্ছানুযায়ী এবং তৎক্ষণাৎ খাঁটি সোনা তৈরি করা সম্ভব। ভন কেমপেলেন দীর্ঘ গবেষণার মাধ্যমে এ-তথ্যটাই আবিষ্কার করেছেন।
ভন্ কেমপেলেনের এ আবিষ্কার আর মুহূর্তের মধ্যেই তার ফলাফল লাভের ব্যাপারটা নিয়ে এরই মধ্যে নানা জল্পনা কল্পনা–চিন্তা ভাবনা আরম্ভ হয়ে গেছে।
আজ পর্যন্ত সোনা তৈরির ব্যাপারে ইউরোপে যে ফলাফল লক্ষিত হয়েছে তা হচ্ছে–বাজারে সিসার দর শতকরা দশ টাকা হারে বেড়ে গেছে। কেবল সোনার দরই নয়, রূপার দরও কম বাড়েনি। শতকরা পঁচিশ হারে বেড়েছে। আর হবে না-ই বা কেন? চারদিকে যে সোনা তৈরির জন্য প্রচেষ্টার দারুণ তোড়জোড় চলছে।
মাইলেন্সে ফেবল
দৈত্য!
বিশালদেহী আর ভয়ালদর্শন এক দৈত্য।
দৈত্যটা আচমকা আমার মাথায় তার হাতটা রাখল। তারপর বজ্রগম্ভীর স্বরে বলল–শোন, উৎকর্ণ হয়ে শোন।
আমি এক্ষেত্রে যে স্থানটার কথা উল্লেখ করছি, সেটা লিবিয়ার অন্তর্গত একটা মরুভূমি–বালির একাধিপত্য সেখানে। সে অঞ্চলটার অবস্থান জাইরে নদীর তীরে। আর সেখানে নিস্তব্ধতা তো বিরাজ করছেই, এমনকি সামান্যতম হৈ-হল্লাও কারো কানে আসে না।
জাইরে নদী দিয়ে প্রতিনিয়ত প্রবাহিত হয় বাদামি রংয়ের ঘোলা জলরাশি। আর তার গতি সাগরের দিকে তো নয়ই, বরং মাথার ওপর অবস্থানরত জ্বলন্ত অগ্নিপিণ্ড সূর্যের নিচে অবস্থান করে প্রতিনিয়ত উত্তাল-উদ্দাম রূপ ধারণ করে থাকে আর তার জলরাশি বিপুল বিক্রমে তোলপাড় করে।
নদীর উভয় তীর থেকে দুইমাইল দূরবর্তী অঞ্চল থেকে শুরু করে পরবর্তী বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে কেবল সোনালির ছড়াছড়ি। কেবল বালি আর বালি। রাশি রাশি বস্তাবস্তা বালি যেন কোনো অমিত বিক্রমশালী কোনো দৈত্য প্রচণ্ড ক্রোধের বশবর্তী হয়ে দুই তীরে সুবিশাল অঞ্চলে ছড়িয়ে ছিটিয়ে দিয়েছে। আর তারই মাঝে মাঝে বিরাট বিরাট আকার বিশিষ্ট বিবর্ণ মরু-ফুল নিজেদের অস্তিত্ব ঘোষণা করছে।
মরুভূমির নির্জনতা আর নিস্তব্ধতা লক্ষ্য করে সুবিশাল-বিবর্ণ মরু-ফুলগুলো যেন বিষাদ ক্লিষ্ট মনে, হতাশ দৃষ্টিতে একে অন্যের দিকে তাকিয়ে বার বার দীর্ঘশ্বাস ফেলছে।
শুধু কি তাই? তারা যেন লম্বাটে গলা তুলে আকাশের দিকে হতাশ দৃষ্টিতে তাকায় আর থেকে থেকে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে আর এদিক-ওদিক মাথা দোলাতে থাকে।
নীরস মাটির বুক নিঙড়ে বেরিয়ে আসা ফোয়ারার মতো মরু-ফুলগুলোর ভেতর থেকেই প্রায় অস্ফুট একটা মৃদু স্বর বেরিয়ে এসে বাতাসের সঙ্গে মিলেমিশে বিলীন হয়ে যায়।
মরুভূমির আয়তন বিশাল, সুবিশাল। কিন্তু বিশালেরও কোথাও-না-কোথাও শেষ আছে, সীমানা বলে কিছু একটার অস্তিত্ব অবশ্যই আছে। কিন্তু কি তাদের সীমানা নির্দেশ করছে? কালো, ভয়াল দর্শন বনভূমি আকাশচুম্বী গাছগাছালির ঘন বনভূমি। সেখানেও ব্রোইডিসের ঢেউয়ের মতোই লতাপাতা গাছগাছালির ঝোঁপঝাড় বাতাসে অনবরত আন্দোলিত হচ্ছে। তবে এও সত্য যে, কোথাও তেমন বাতাস নেই। তা সত্ত্বেও সেই আগেকার আমলে জন্মানো সুবিশাল গাছগুলো চিরটাকাল ধরে, প্রতিদিন। আর প্রতিনিয়ত একই রকমভাবে আন্দোলিত হয়ে আসছে। আর তাদের মাথা, প্রতিটা শাখা-প্রশাখা আর পাতাগুলোতে শিশিরবিন্দু পড়ে স্নান করিয়ে দেয়।
