অথবা উপরোক্ত বক্তব্যকে একটু ঘুরিয়ে বললে, সেখানকার মানুষই প্রথম সন্দেহ করে যে, তিনিই মহান আবিষ্কারটা করেছেন। ব্যস, আমি বর্তমানে মহাপ্রাণ ভন্ কেমপেলেনের ব্যাপারে এটুকুমাত্রই আমার জানা আছে। এর বেশি একটা শব্দও আমার পক্ষে জানা সম্ভব হয়নি।
একটা কথা আমি না বলে পারছি না, আবিষ্কারের ব্যাপারটা নিয়ে চারদিকে লোকের মুখে মুখে গালগল্পগুজব অর্থাৎ নিতান্তই কাল্পনিক এতে তিলমাত্রও সন্দেহের অবকাশ থাকতে পারে না।
তবুও একটা কথা খুবই সত্য বলে মেনে নেওয়া যেতে পারে যে, এ ব্যাপারটা সম্বন্ধে যা-কিছু কৃতিত্ব, খ্যাতি পাওয়া সম্ভব সম্পূর্ণরূপে তাঁরই প্রাপ্য, তথাপি আর একটা খুবই সহজ সরল যে, এসব ব্যাপারের পিছনে যে প্রকৃত সত্য লুকিয়ে থাকে তা কিন্তু উপন্যাসের কাহিনীর চেয়ে অনেক, অনেক বেশি বিস্ময় উৎপাদনের ক্ষমতা রাখতে পারে। আর কিছু না-ই বা মেনে নেওয়া হোক, অন্তত নিচে যে কাহিনীটা তুলে ধরা হচ্ছে, এটা এতেই প্রমাণিত যে, আমরা অনায়াসেই অন্তর থেকে স্বীকৃতি দিতে পারি।
একটা কথা গোড়াতেই বলে রাখছি ব্রেমেন নগরে অবস্থানকালে ভন কেমপেলেমের আর্থিক অবস্থা ভালো তো ছিলই না এবং আর্থিক সঙ্কটের মধ্য দিয়ে তিনি দিনাতিপাত করতেন। পরিচিত মহল এ কথা জানত, চোখের সামনে দেখেছেও যে, প্রায়ই সামান্য কিছু অর্থের সংস্থান করার জন্য তাঁকে যারপরনাই ফন্দি ফিকির করতে হত।
তখন গুটসমুখ অ্যান্ড কোম্পানির জালিয়াতির ব্যাপারকে কেন্দ্র নগরের সর্বত্র, এমনকি আনাচে কানাচে পর্যন্ত তুমুল হৈ হট্টগোল শুরু হয়ে যায়। সংক্ষেপে বললে; জালিয়াতির ব্যাপারটাকে কেন্দ্র করে নগর জুড়ে তুমুল আলোড়ন হতে থাকে। ব্যাপারটার জন্য ভন্ কেমপেলেনকেই দায়ী করা হয় যাবতীয় সন্দেহ তার ওপরই বর্তাল।
জালিয়াতির ব্যাপারে ভন কেম্পেলেনকে সন্দেহ করার যুক্তি ছিল যথেষ্টই। কারণ, ব্যাপারটা ঘটে যাওয়ার পর পরই তিনি নগরের প্রায় কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত গ্যাসপেরি লেনে তিনি বেশ বড়সড় একটা বাড়ি খরিদ করেছিলেন। ব্যস, এটাই তার কাল হয়ে দাঁড়াল।
সন্দেহ যখন চরমে উঠল তখন তাকে টাকার ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদ করা শুরু হয়ে গেল। তাকে সরাসরিই জিজ্ঞাসা করা হল–এত বড় বাড়িটা খরিদ করতে যে দাম আপনাকে শোধ করতে হয়, তা আপনি কোন্ সূত্র থেকে পেয়েছেন, বলুন?
প্রশ্নটা শুনে বেচারা ভন্ কেমপেলেন কেবল আমতা আমতা করতে লাগলেন।
বার বার ধমক খেয়েও তিনি প্রশ্নটার সন্তোষজনক উত্তর দিতে পারলেন না। শেষপর্যন্ত হাতকড়া পরিয়ে তাকে জেলে ভরে দেওয়া হল।
ভন্ কেমপেলেনের বিরুদ্ধে উপযুক্ত সাক্ষী প্রমাণ সংগ্রহ করতে না পারায় শেষমেশ তাকে মুক্তি দেওয়া হল।
জেলখাটার দায় থেকে অব্যাহতি পেলেও টিকটিকির দল কিন্তু তার পিছন ছাড়ল না। আর পুলিশ তো ধরতে গেলে আঠালির মতো তার গায়ের সঙ্গে সেঁটে রইল। তারা তার গতিবিধির ওপর লক্ষ্য রেখে দেখল, তিনি বাড়ির সদর দরজা দিয়ে বেরিয়ে ভাণ্ডার ঘাট নামক সঙ্কীর্ণ গলিপথ ধরেন। গলিটার গোলকধাঁধা অতিক্রম করার সময় অনুসরণকারী পুলিশের চোখে ধূলো দিয়ে হঠাৎ কোথায় যে উধাও হয়ে যায়, তার হদিসই তারা পায় না।
ব্যস এবার জোর তল্লাসি শুরু হয়ে গেল। গৃহকর্তা ভন্ কেমপেলেনকে হাতকড়া পরিয়ে কেবলমাত্র তার থাকার ঘরটাই নয়, বরং কথাচ্ছলে সব কয়টা ঘরই তন্নতন্ন করে খোঁজা হল। এর যথেষ্ট যুক্তিও ছিল। কারণ, বাড়িটার সবগুলো ঘরই তার দখলেই ছিল। নীরব দর্শকের মতো দাঁড়িয়ে থাকা ছাড়া তাঁর তো কিছু করারও ছিল না।
ভন্ কেমপেলেনকে যে চিলেকোঠা থেকে খুঁজে বের করে হাতকড়া পরিয়ে দেওয়া হয়েছিল তারই লাগোয়া দশ ফুট দৈর্ঘ্য ও আট ফুট প্রস্থবিশিষ্ট ছোট্ট একটা কামরা ছিল। সেটাতে কিছু রাসায়নিক সরঞ্জাম রক্ষিত ছিল। কামরাটার ভেতরে ঢুকে অনুসন্ধিৎসু নজর মেলে তাকালে চোখে পড়ল এক কোণে একটা উনুন জ্বলছে। তার ওপর বসানো ছিল একটা নল দিয়ে সংযোগ সাধন করা দুটো পাইপ।
পাইপ দুটোর একটাতে সিসর ছিদ্র ছিল, আর অন্যটাতে কোনো একটা তরল পদার্থ অনবরত ফুটছিল। আর তা থেকে গলগল করে ধোঁয়া বের হচ্ছিল।
লোকটি গ্রেপ্তার হবার ভয়ে সতর্কতা অবলম্বন করতে গিয়ে মুহূর্তের মধ্যে দুটো পাইপ দুহাতে ধরে ভেতরের পদার্থগুলোকে ঘরের মেঝেতে ছড়িয়ে দেয়।
পুলিশ তার অপরাধ সম্বন্ধে নিঃসন্দেহ হবার পর মুহূর্তমাত্র দেরি না করেই তার হাতে হাতকড়া পরিয়ে দিল। এবার তার প্যান্ট ও জ্যাকেটের পকেটে হাত চালিয়ে খোঁজাখুঁজি করা হল। শেষমেশ জ্যাকেটের পকেটে একটা কাগজের পার্সেল বের করে আনা হল। এ ছাড়া আর কিছু পেল না।
পরবর্তীকালে আরও ভালোভাবে পরীক্ষা করে দেখা গেল; জ্যাকেটের পকেটে পাওয়া গিয়েছিল রসাঞ্জনে এবং একটা অজ্ঞাত পদার্থের মিশ্রণ।
পুলিশ অফিসাররা এবার হাতকড়া পরিহিত বন্দিকে নিয়ে তাঁর রসায়নাগার থেকে বেরিয়ে শোবার ঘরে গেলেন। ঘরের সবগুলো বাক্স পেটারা ঘাঁটাঘাঁটি করে, তন্নতন্ন করে খোঁজাখুঁজি করে কিছু সোনা ও কিছু রূপার মুদ্রা ছাড়া বিশেষ কিছু বের করতে পারল না।
এবার বিছানাপত্র ঘাঁটাঘাঁটি করে বিছানার তলা থেকে বিশাল একটা বাক্স দেখতে পেলেন। কিন্তু গায়ের জোরে টানাটানি করেও সেটাকে বাইরে আনতে পারলেন না।
