প্রসঙ্গক্রমে বলছি, কে এই মি. কিসাস? তার পরিচয় কি? কোথায়ই বা তার বাড়ি। আরও একটা কথা আছে, ‘কুরিয়ার অ্যান্ড এনকয়ারারের ব্যাপার-স্যাপার সম্বন্ধে যে অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, আলোড়ন সৃষ্টি করাই যার উদ্দেশ্য সেটা মনগড়া ধাপ্পার ব্যাপার-স্যাপার হওয়া সম্ভব নয় তো? এমনও তো হতে পারে পুরো ব্যাপারটাই নিছক একটা ধাপ্পাবাজি–সম্ভব কি?
তবে আর যা-ই হোক না কেন, এ-কথা তো মেনে না নিয়ে উপায় নেই যে, পুরো ব্যাপারটাকে কেমন যেন উদ্ভট, পাগলের প্রলাপ বলেই মনে করা যেতে পারে। আর যে, যা বলে বলুক গে, আমি কিন্তু বলব, এর ওপর সামান্যতমও আস্থা রাখা সম্ভব নয়।
যাক গে, কথা বাড়িয়ে লাভ নেই, আমরা বরং স্যার হামফ্রে ডেভির প্রসঙ্গে আবার আলোচনা শুরু করি। ডেভি বলতে তার ডায়রির কথা বলতে চাচ্ছি।
বইটা কিন্তু জনসাধারণের দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য মোটেই লেখা হয়নি। এমনকি লেখকের মৃত্যুর পরও সাধারণ মানুষের নজরে আসুক, এ উদ্দেশ্যও ছিল না।
আর একটা কথা, লেখার কায়দা কৌশল লক্ষ্য করলেই যে কেউ বুঝে নিতে পারবেন, কে এর লেখক। কেন এমন কথা বলছি; তাই না? কারণ, লেখাটার কয়েকটা ছত্র পড়লেই অবশ্যই বোঝা যাবে, তার প্রতিটা বাক্যই গঠনগত ভুল ভ্রান্তিতে ভরা।
প্রকৃত কারণ সম্বন্ধে সহজেই সিদ্ধান্ত নেওয়া যেতে পারে। বলাবাহুল্য, স্যার হ্যামফ্রে ডেভি কোনোদিনই বিজ্ঞানের প্রসঙ্গ নিয়ে লেখাঝেকা করতে অভ্যস্ত ছিলেন না। অর্থাৎ বৈজ্ঞানিক নিবন্ধ লিখতে তিনি কখনই পটু ছিলেন না।
আমার দৃঢ় বিশ্বাস, জীবদ্দশায় তিনি যদি ঘৃণাক্ষরেও বুঝতে পারতেন যে, তাঁর পরলোকগমনের পর এ-ডায়রিটা আগুনে পুড়িয়ে ভস্মীভূত করে দেওয়ার অতি ইচ্ছা তিনি অন্তরে পোষণ করেন, তাকে বাস্তবায়িত করার জন্য কেউই উৎসাহি হবেন না। তবে তিনি জীবনের শেষের দিনগুলো যারপরনাই মর্মপীড়ার মধ্য দিয়ে কাটাতেন, অর্ন্তজ্বালায় তিলে তিলে দগ্ধ হতেন। এটা নিছকই কথার কথা নয়। আমি এটা হলফ করে বলতে পারি।
তবে এও সত্য যে, ডায়রিটা আগুনের শিখার শিকার না হয়ে কেন যে আজও নিজের অস্তিত্ব বজায় রেখে চলতে পারছে, কি নিছক সৌভাগ্যের জন্য সম্ভব হয়েছে, নাকি দুর্ভাগ্যের ব্যাপার তা আজও জানা সম্ভব হয়নি।
কিন্তু এ বিষয়ে তিলমাত্রও সন্দেহ নেই যে, ডায়রিটা ব্যবহার করে ভন্ কেপেনে আর তার ঘনিষ্ঠ সুহৃদরা মোটা মালকড়ি কামিয়ে নেবেন। কেউ যদি এর বিপরীত কথা বলেন তবে তার বিচার-বুদ্ধিকে আমি অবশ্যই ঘষে মেজে পরিষ্কার করে নিতে বলব। তবে অবাক না হয়ে পারব না যে, এত বড় আহাম্মক সে হলো কি করে!
আমি এ প্রসঙ্গে এও নিশ্চিত করে বলতে পারি যে, এ ডায়রিটা ভাঙিয়েন্ি কেমপেলেন আর ঘনিষ্ঠ বন্ধুরা বৃহদায়তন বহু বাড়ি, জমি, গাড়ি অন্যান্য সম্পত্তি কিনে যে তারা আমির-ওমরাহ বনে যাবে না এমন দুর্বল চিত্তের অধিকারী তারা অবশ্যই নয়। এককথায় তারা আখের গুছিয়ে নিয়ে ভবিষ্যতের ভোগ-বিলাসের পথ উন্মুক্ত করে নিতে অবশ্যই ভুলবে না।
তবে প্রেসবুর্গের অধিবাসী বলে ‘দ্য লিটারেরি ওয়ার্ডনামক পত্রিকা ব্যক্ত করেছে। যেহেতু কথাটা আমি তার মুখেই শুনেছি, তাই রীতিমত দৃঢ়তার সঙ্গেই বলতে পারি, প্রেসবুর্গে অবশ্যই নয়,নিউ ইয়র্কের উটিকা অঞ্চলে তিনি জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তবে আমি কিন্তু বিশ্বাস করি, তার মা-বাবা প্ৰেসবুর্গ পরিবারেই জন্মগ্রহণ করেছিলেন। সেখানেই তাঁর বাল্য-কৈশোর-বার্ধক্য কাটে। মৃত্যুও হয় সে জায়গাতেই।
ওই প্রেসবুর্গ পরিবারের সঙ্গে কোনো-না-কোনোভাবে সম্পর্কযুক্ত ছিলেন শ্রুতিধর দাবাড় যন্ত্রের আবিষ্কারক মায়েল জেল।
লোকটা ছিলেন খুবই বেঁটে। দেহসৌষ্ঠব ছিল লক্ষ্য করার মতো। আমিও শক্তিধরও বটে। মুখটায় সর্বদা হাসির প্রলেপ মাখানো থাকে। চোখ দুটো নীল আর ফোলা ফোলা। আর দাঁতগুলো রীতিমত ঝঙ্ক করে। তবে একটা পায়ে খুঁত আছে। তার চেহারা-ছবি, কথাবার্তা, আদব কায়দা এবং কাজকর্ম দেখে ভুলেও ভাবা যায় না লোকটাকে-মানবদ্বেষী। কারো মনে যদি এরকম কোনো ধারণা জন্মায় তবে তাকে বিশ্বনিন্দুক ছাড়া আর কোনো আখ্যা দিতে উৎসাহই পাওয়া যাবে না।
প্রায় সপ্তাহ দুয়েরই কথা বলছি, আমরা দুজন এক সপ্তাহ কালরোড দ্বীপভূমির প্রভিডেমের আলগ হোটেলে এক সঙ্গে থেকেছিলাম। আমার স্পষ্ট মনে পড়ছে, বিভিন্ন ।’ সময়ে আমরা তিন-চার ঘণ্টাবাক্যালাপ করে কাটিয়েছি।
উপরোক্ত হোটেলে অবস্থানকালে আমি তার সঙ্গে দীর্ঘসময় ধরে বাক্যালাপের মধ্যে দিয়ে কাটিয়ে যে ধারণা নিতে পেরেছি তার ওপর নির্ভর করে বলছি, তিনি প্রধানত সমসাময়িক প্রসঙ্গ নিয়েই কথাবার্তা বলতেন। আরও একটা কথা, তার বক্তব্যের মধ্যে বৈজ্ঞানিক জ্ঞান ও ধ্যানধারণার নাম-গন্ধ কোনোদিন পাইনি।
আমি হোটেল ছাড়ার আগেই তিনি হোটেল ছাড়েন।
হোটেল ছেড়ে যাবার সময়ই তার ইচ্ছা ছিল, প্রথমে নিউ ইয়র্কে যাবেন। তারপর সেখান থেকে যাত্রা করে যাবেন ব্রেসেল ন্যাসেন।
তাঁর উদ্দেশ্য ব্রেসেল নগরেই তিনি নিজের আবিষ্কারের কথা প্রচার করবেন। শেষপর্যন্ত করলেনও তা-ই। এ নগরের অধিবাসীরাই সবার আগে তাঁর মহান কীর্তি, আবিষ্কারের কথা জানতে পারল।
