আমি একটা কথার টু শব্দটিও করলাম না। সে ধীর-পায়ে এগিয়ে আমার মুখোমুখি দাঁড়াল। ধীর-মন্থরভাবে আমার হাতটা চেপে ধরল। তার হাতে মানুষের নখের আঁচড়।
সে দেয়ালে হেলান দিয়ে কাৎ করে রাখা একটা জিনিসের দিকে অঙ্গুলিনির্দেশ করে আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করল।
আমি মিনিট কয়েক অপলক চোখে সে দিকে তাকিয়ে দেখলাম, একটা কোদাল কাদামাখা বড়সড় একটা কোদাল।
আমি বিকট আর্তনাদ করে অতর্কিতে লম্বা একটা লাফ দিয়ে আবার টেবিলটার কাছে ফিরে গেলাম! বাক্সটাকে দুহাতে চেপে ধরলাম। সেটাকে খোলার জন্য প্রাণান্ত প্রয়াস চালাতে লাগলাম। ব্যর্থ হলাম। শেষপর্যন্ত হতাশ হয়ে হাল ছেড়ে দিতেই হল।
আমার কাঁপা কাঁপা হাতের বন্ধন থেকে ফসূকে গিয়ে বাক্সটা অকস্মাৎ মেঝেতে পড়ে গেল। চোখের পলকে সেটা ভেঙে খানখান হয়ে গেল। আর সঙ্গে সঙ্গে তার ভেতর থেকে কয়েকটা দাঁত তোলার যন্ত্রপাতি মেঝেতে ছড়িয়ে পড়ল। আর? হাতির দাঁতের সাদা, ঝকঝকে চকচকে অথচ ছোট কয়েকটা বস্তু মেঝের ওপর ছড়িয়ে পড়ল। আমি আতঙ্ক মিশ্রিত বিস্ময় বিস্ফারিত চোখে সেগুলোর দিকে অপলক চোখে তাকিয়ে রইলাম।
ভন কেমপেলেন অ্যান্ড হিস ডিসকভারি
আরাগো কর্তৃক লিখিত প্রতিটা বিষয় নিয়ে বিস্তারিতভাবে লেখা প্রবন্ধের পর ‘সিলিম্যানংস জার্নাল’-এ প্রকাশিত সংক্ষিপ্ত বিবরণীর কথা না-ই উল্লেখ করলাম, আর লেফটেন্যান্ট মাউরি-র সবেমাত্র প্রকাশিত বিবরণীর যদি ভন্ কেমপেলেনের আবিষ্কারের ব্যাপারে সামান্য কিছু মন্তব্য পেশ করলে অবশ্যই কেউ ভাববেন না যে, ব্যাপারটাকে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করার কোনো আগ্রহ বা পূর্ব-পরিকল্পিত ইচ্ছা আদৌ আমার নেই। সত্যি কথা বলতে কি, তার আবিষ্কারের ব্যাপারটা উত্থাপনের ব্যাপারে আমি আগেভাগে কোনো চিন্তাভাবনাই করে রাখিনি।
প্রথমত আমার উদ্দেশ্য কিন্তু খুবই সহজ-সরল। বছর কয়েক আগে ভ কেমপেলেনের পরিচয়ের সৌভাগ্য আমার হয়। আমি তার সম্বন্ধে কিছু বলতে উৎসাহি। কারণ, বর্তমানে তার সম্পর্কিত সবই অবশ্যই আকর্ষণীয় হয়ে উঠবে। আর দ্বিতীয়ত, সে আবিষ্কার ফলাফলগুলোকে সাধারণ দৃষ্টিভঙ্গি আর দার্শনিকের চোখ দিয়ে দেখে বিচার বিশ্লেষণ করা।
কট অ্যান্ড মুনরো, লন্ডন-এর একশো পঞ্চাশ পৃষ্ঠায় ছাপা ডায়েরি অব স্যার হামফ্রে ডেভি’র সঙ্গে মিলিয়ে দেখলেই তেপান্ন আর বিরাশি পৃষ্ঠায় লক্ষ্য করা যাবে; এ বিখ্যাত রসায়নবিদের যে ব্যাখ্যাটাকে কেন্দ্র করে চারদিকে ভন্ কেমপেলেনের জয়ধ্বনি ঘোষিত হচ্ছে, সে ব্যাপারটা প্রথম তার মাথায় জেগেছিল ওই ডায়েরি থেকে, তাই নয়, এর মধ্যে বিষয়টি নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যাপারে তিনি অনেকখানি এগিয়ে গেছেন।
এ-ব্যাপারে তিনি একটা কথা না বললেও আমি নির্দিধায় বলছি, প্রয়োজনে এর প্রমাণও দিয়ে দিতে পারি, অন্তত নিজের প্রচেষ্টায় তিনি যে প্রথম ইঙ্গিতটা দিয়েছেন তার জন্য ‘ডায়রি’র কাছে তিনি কৃতজ্ঞ।
স্বীকার করছি কাজটা কিছুটা পারিভাষিক! তবুও আমি নিতান্ত বাধ্য হয়েছি স্যার হামফ্রি ডেভির একটা সমীকরণসহ ‘ডায়রি’-র দুটো অংশ সংযোজন করতে।
খবরের কাগজের পাতায় ‘কুরিয়ার অ্যান্ড এন্কয়ারার’-এর অনুচ্ছেদটা ছাপা হয়েছে এবং পাঠকদের হাতে হাতে ঘুরছে, আর এ আবিষ্কারটাকে যাতে মেইন পাথরের ব্রান্সউইক-এর অধিবাসী কোনো এক মি. কিসাস আবিষ্কার করেছেন বলে দাবি করা হচ্ছে সে অনুচ্ছেদটাকে আমি বহু কারণের জন্য নকল ভাবছি এবং ব্যক্ত করছি। তবে এ-কথাও বলছি যে, সে বিবরণটা মোটেই অসঙ্গত বা অযৌক্তিকতা দোষে দুষ্ট নয়।
আর এ-কথাও বলছি যে, এ ব্যাপারটার বিস্তারিত বিচার বিশ্লেষণ করার ইচ্ছা আমার আদৌ নেই।
সে অনুচ্ছেদটা সম্পর্কে আমার মতামত জানতে চাইলে বলব, প্রধানত তার ব্যক্ত করার কায়দা-কৌশলের ওপরেই প্রতিষ্ঠিত। সেটাকে কিন্তু সত্য বলে মেনে নিতে উৎসাহ পাওয়া যায় না। স্বীকার না করে উপায় নেই, যারা ঘটনার বিবরণমাত্র ব্যক্ত করে তা কিন্তু দিন, তারিখ, সময় আর ঘটনাস্থলের কথা মি. কিসাসের মতো হুবহু ঠিকঠাকভাবে তুলে ধরতে প্রয়াসী হয় না।
এ ছাড়াও বলছি, মি. কিসাসের বক্তব্যের ওপর ভিত্তি করে বলা যায়, যদি তিনি সত্যি প্রায় আট বছর পূর্বের কোনো একটা নির্দিষ্ট সময়ে আবিষ্কারটার সন্ধান পান তবে এটা কি করে ঘটা সম্ভব যে, এত বড় একটা আবিষ্কারের ফলস্বরূপ সঙ্গে সঙ্গে দুহাতে ফায়দা, অর্থপোর্জনের জন্য তিনি তৎপর হলেন না? এমন কোনো ঘটনার কথা যে ভুলেও ভাবা সম্ভব নয়?
কিন্তু কোনো বুদ্ধিমান ও বিচক্ষণ ব্যক্তির কথা না হয় ছাড়ানই দিলাম, যে কোনো সাধারণ বিবেক-বুদ্ধিসম্পন্ন মানুষের মাথায় তো ব্যাপারটা খেলবে যে, ঠিক সে মুহূর্তেই তৎপরতার সঙ্গে সে পথে পা-বাড়ালে তিনি একদম একাই এ আবিষ্কারটার কৃতিত্বের অধিকারী হতে পারতেন, ঠিক কি না? অর্থাৎ এ আবিষ্কারটার ফায়দা তিনি একাই লুটতেন।
অন্য কেউ কি বলত জানি না। আমি কিন্তু বলব, আমার কাছে ব্যাপারটা মোটেই বিশ্বাসযোগ্য মনে হচ্ছে না। বিশ্বাস করতে তিলমাত্র উৎসাহও পাচ্ছি না যে, সে আবিষ্কারটা মি. কিসারে দ্বারা সম্পন্ন হয়েছে বলে বলা হচ্ছে, সেটা যে কোনো বুদ্ধিমান লোকের দ্বারাই সম্ভব। অথচ পরবর্তীকালে তিনিই একটা কচি শিশুর মতো–একটা পঁাচার মতোই আচরণ করেছেন, অসম্ভব! একেবারেই অসম্ভব ব্যাপার।
