শেষপর্যন্ত সে স্বপ্নের ঘোরে স্পষ্ট আমার কানে বাজতে লাগল ভয়ঙ্কর আতঙ্ক মিশ্রিত দুঃখে এক করুণ চিত্তার। পরমুহূর্তেই বাতাসের কাঁধে ভর করে ভেসে এলো বহু সমবেত কণ্ঠের চিল্লাচিল্লির আওয়াজ; সে সঙ্গে দুঃখ-যন্ত্রণামিশ্রিত, ভাঙা-ভাঙা স্বর।
আমি যন্ত্রচালিতের মতো ঝট করে এক লাফে চেয়ার ছেড়ে খাড়াভাবে দাঁড়িয়ে পড়লাম।
লাইব্রেরির একটা দরজার পাল্লা ফাঁক করে দেখলাম ঠিক পাশের ঘরটাতে এক পরিচারিকা দাঁড়িয়ে প্রায় বিলাপ ছেড়ে কেঁদে চলেছে।
দরজায় আমাকে দেখে বলল–‘হায়! বেরেনিস—
‘বেরেনিস! কী হয়েছে।’
আমাকে কথা শেষ করতে না দিয়েই সে আবার বলতে শুরু করল—
‘বেরেনিস ইহলোক ত্যাগ করেছেন।‘
‘সে কী! এমনকি ঘটল যে হঠাৎ সে ইহলোক ত্যাগ করেছে!’
‘খুব সকালেই তার দেহে তাপম্মার রোগের প্রকাশ ঘটে। আর এখন রাত শেষ হয়ে ভোরের আলো ফুটতে না ফুটতেই কবর খোঁড়ার কাজ মিটে গেছে।
আমি কি বলব ভেবে না পেয়ে ফ্যাল ফ্যাল করে নীরব চাহনি মেলে তার মুখের। দিকে তাকিয়ে রইলাম।
সে বলে চলল–এদিকে সমাধির আয়োজনও সম্পূর্ণ হয়ে গেছে, আমি কপালের চামড়ায় কয়েকটা ভাজ এঁকে বজ্রাহতের মতো নিশ্চল-নিথরভাবে দাঁড়িয়ে রইলাম।
.
আমি ঘরটার চারিদিকে দৃষ্টি ফিরিয়ে দেখলাম, আমি লাইব্রেরিতে, চেয়ারটায় শরীর এলিয়ে দিয়ে নীরবে বসে রয়েছি আর একা, একদম একাই বসে রয়েছি।
সে মুহূর্তে আমার মনে হল, উত্তেজনাপূর্ণ স্বপ্ন দেখে যেন এইমাত্র জেগেছি।
আমি জানি, সময় এখন মাঝরাত। আর এও ভালোই জানি, সূর্যপাটে বসলেই বেরেনিসের মৃতদেহটাকে সমাধিস্থ করা হয়ে গেছে।
কিন্তু তার মাঝখানের ভয়ঙ্কর সময়টা সম্বন্ধে স্পষ্ট কিছু আমার জানা নেই, ধারণাও নেই। কিন্তু সত্যি কথা বলতে কি, সে বিশেষ সময়টার স্মৃতি বিভীষিকাময়। আর সে সম্বন্ধে স্পষ্ট কোনো ধারণা না থাকার কারণেই সে বিভীষিকা আরও অনেক, অনেক ভয়ঙ্কর হয়ে উঠেছে। আর অধিকতর দ্ব্যর্থবোধক হওয়াতেই আতঙ্কটা আরও দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে।
আমার জীবনের সে অতীত-কাহিনী সম্পূর্ণটা লেখা হয়েছে সেটা অস্পষ্ট, ভয়ঙ্কর ও দুর্বোধ্য টুকরো-টুকরো স্মৃতি গেঁথে গেঁথে, সেদিনের স্মৃতিটা সে কাহিনীরই ভয়ঙ্কর একটা পাতা। আমি সেটাকে পড়ার জন্য বহুবার চেষ্টা করেছি, কিন্তু পারিনি। আমার পক্ষে কিছুতেই পড়া সম্ভব হয়নি। অথচ মাঝে-মধ্যেই বাতাসে ভেসে-আসা দূরাগত শব্দের ভূতের এক মেয়েলি গলার কর্কশ ও বুকফাটা আর্তচিৎকার আমার কানে একনাগাড়ে বেজেই চলল।
আমি একটা কাজ সমাধা করেছি। কি সেটা, তাই না? প্রশ্নটা আমি বার বার গলা ছেড়ে নিজেকেই নিজে করেছি। আর ঘরের অনুচ্চ কণ্ঠের প্রতিধ্বনি উত্তর দিয়েছে– ‘কি? কি সেটা?
বাতিদানে একটা মোমবাতি জ্বলছে। পাশের টেবিলে বাতিদানটা রক্ষিত আছে। আর তার গায়েই ছোট্ট একটা বাক্স রয়েছে। সত্যি বিচিত্র ধরনের সে বাক্সটা। এটাকে আমি ইতিপূর্বেও বহুবার দেখেছি। কারণ আমাদের পারিবারিক চিকিৎসক এটা নিয়েই প্রতিবার আমাদের বাড়ি আসতেন। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এটা এখানে, আমার টেবিলের ওপর আসার কারণটি কি? আরও আছে। এটাকে দেখামাত্র আমার সর্বাঙ্গে কম্পন অনুভূত হলই বা কেন? বহু চিন্তা-ভাবনা করেও এর রহস্যভেদ করতে পারলাম না। আসলে এ সবের কোনোই ব্যাখ্যা নেই।
শেষমেশ একটা বইয়ের খোলা-পাতায় আমার নজর গেল। সে মুহূর্তেই নিচে দাগ-দেওয়া একটা বাক্য সবচেয়ে বেশি করে আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করল!
বাক্যটা পড়তে পড়তে আমার মাথার চুলগুলো সজারুর কাটার মতো খাড়া হয়ে উঠল। এর কারণ কি? আর কেনই বা আমার প্রতিটা শিরা-উপশিরার রক্ত জমাট বেঁধে গেল। এ-সব রহস্য ভেদ করার শত চেষ্টা করেও আমাকে পুরোপুরি হতাশ হতে হল।
আমি চেয়ারটায় শরীর এলিয়ে দিয়ে উদ্ভত রহস্যগুলোর সমাধানের ব্যর্থ প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছি ঠিক তখনই লাইব্রেরির দরজায় বার-কয়েক মৃদু টোকা হল। আমি যন্ত্রচালিতের মতো তড়া করে সোজা হয়ে বসে পড়লাম। দরজার দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ রেখে উকর্ণ হয়ে রইলাম। ঠিক তখনই সমাধিস্থ মৃতের মতো আলতোভাবে পা টিপে টিপে ফ্যাকাশে বিবর্ণ মুখে এক চাকর ঘরে ঢুকে এলো।
চাকরটার চোখে-মুখে আতঙ্কের ছাপ সুস্পষ্ট। গলা নামিয়ে কাঁপা কাঁপা গলায় কথা বলল। একে সগতোক্তিও বলা চলে।
সে কি বলল, তাই না? কেবলমাত্র টুকরো টুকরো কয়েকটা বাক্য আমার কানে এলো।
তার মুখে শুনলাম, সুতীব্র ও তীক্ষ্ণ একটা আর্ত চিৎকারে রাতের নীরবতা ভেঙে গেল। পড়ি কি মরি করে বাড়ির সবাই ছুটে এসে এক জায়গায় জড়ো হল। শব্দের উৎসটাকে লক্ষ্য করে এগিয়ে গিয়ে খোঁজও করা হল। কথাটা বলতে বলতে উত্তেজনায় তার চোখ-মুখ লাল হয়ে উঠল। আর কণ্ঠস্বর স্পষ্ট হয়ে এলো। সে অনুচ্চ কণ্ঠে, প্রায় ফিসফিস করে বলল–একটা সমাধি খুঁড়ে ফেলা হয়েছে, কালো কাপড়ে মোড়া শবদেহ যারপরনাই বিকৃত হয়ে গেছে, অথচ সে স্বাভাবিক শ্বাসক্রিয়া চালিয়ে যাচ্ছে। বুক দ্রুত ওঠা-নামা করছে জীবিত, এখনও সে জীবিত রয়েছে।
সে আমার দিকে অঙ্গুলিনির্দেশ করল, আমার পোশাক পরিচ্ছদের দিকে ইশারা করল। আমার পোশাকের অর্ধাংশ কাদায় মাখামাখি। আর তার বহু জায়গায় রক্তের ছোপ, জমাট বাঁধা রক্ত।
