আর আমার বড় ভাই, সে যে কেমন করে প্রাণে বেঁচে গেল তা বলতে পারব না। কারণ একটাই, তার মৃত্যু যে কিভাবে ঘটেছিল তা জানার কোনো উপায়ই আমার ছিল না। আর এক মুহূর্তের জন্য ফুরসৎ পাইনি যে, তার খোঁজ করব।
আর আমি, পরিস্থিতি খারাপ বুঝে ব্যস্ত হয়ে ডেকের ওপর চলে গেলাম। কোনোরকমে পালের দড়িদড়া কেটে ফেললাম। ব্যস, এবার টান টান হয়ে ডেকের ওপর শুয়ে পড়লাম। ডেকের সঙ্গে নিজেকে লেপ্টে দিয়ে অদৃষ্ট সম্বল করে শুয়ে পড়ে থাকলাম। হাতড়ে হাতড়ে কোনোরকমে সামনের মাস্তুলের বলয় দুটোকে বের করলাম। সে দুটোকে দুহাতে শক্ত করে ধরে দাঁতে দাঁত চেপে ডেকের ওপর পড়ে রইলাম।
কিন্তু হায়! কয়েক মুহূর্তের জন্য হলেও আমরা পুরোপুরি পানিতে ডুবে যাই। সে সময়টুকুতেও আমি হাত থেকে বলয় দুটোকে কিছুতেই বিচ্ছিন্ন হতে দিইনি। শ্বাসরুদ্ধ করে বলয় দুটোকে ধরে রাখলাম। কিন্তু এভাবে আর কতক্ষণই বা থাকা সম্ভব? উপায়ান্তর না দেখে আমি কোনোরকমে ডেকের ওপরে হাঁটু গেড়ে বসলাম। হাত দুটোর ওপর শরীরের ভার সঁপে দিলাম।
যাক, এভাবে কোনোরকমে মাথাটাকে তো রক্ষা করা গেল। কিছুক্ষন বাদে, একেবারে হঠাৎই আমাদের ছোট জাহাজ ভুস করে ভেসে উঠল। পানিতে-ডোবা কুকুর যেভাবে দুম করে পানি থেকে ভেসে ওঠে ছোট জাহাজটাও যেন একই রকমভাবে পানি থেকে নিজেকে মুক্ত করে নিল। সে নিশ্চিত সলিল সমাধির কবল থেকে নিজেকে রক্ষা করল।
ইতিমধ্যে আমার মনে জমাটবাধা ভীতি–মনে অবর্ণনীয় ঘোরটা কেটে গেল।
এবার আমি বিষণ্ণ মনে ভবিষ্যৎ কর্তব্য সম্বন্ধে ভাবতে লাগলাম। এমন আচমকা, একেবারে হঠাৎই কে যেন আমার একটা হাত চেপে ধরল। প্রথমটায় আমি যারপরনাই ঘাবড়ে গেলাম। তারপর আতঙ্ক ও বিস্ময়ের ঘোরটুকু কাটিয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকানোমাত্র চমকে গেলাম। দেখলাম, আমার বড় ভাই আমার হাতটাকে সাড়াশির মতো আঁকড়ে ধরে রেখেছে। চরম বিপদের মুহূর্তে মানুষ যা করে থাকে সে তাই করেছে। তাকে দেখামাত্র আমার বুকের ভেতরে খুশির জোয়ার বয়ে যেতে লাগল।
আমি নিঃসন্দেহ হয়ে পড়েছিলাম, আমার দাদাভাই নির্ঘাৎ পানিতে পড়ে অতল গহ্বরে তলিয়ে গেছে।
কিন্তু আমার আনন্দ-উচ্ছ্বাসটুকু মোটেই দীর্ঘস্থায়ী হলো না। বরং মুহূর্তের মধ্যেই হতাশায় আমার বুকটা ভরে উঠল। আতঙ্কে আমি একেবারে চুপসে গেলাম। উন্মুক্ত সমুদ্রের বুকেও যেন দম বন্ধ হয়ে আসতে চাইল। কারণ, আমার দাদাভাই কানের কাছে মুখ এনে অনুচ্চ অথচ স্পষ্ট ও কাঁপা কাঁপা গলায় উচ্চারণ করল–মস্কো স্ট্রাম; মস্কো স্ট্রাম! কথাটা শোনামাত্র আমি শিউরে উঠলাম। আর শরীরের সব কটা স্নায়ু যেন এক সঙ্গে সচকিত হয়ে উঠল। রক্তের গতি হয়ে পড়ল দ্রুততর, আর শ্বাসক্রিয়া স্তব্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হলো।
সত্যি কথা বলতে কি, সে মুহূর্তে আমার মানসিক পরিস্থিতি যে কোন জায়গায় গিয়ে পৌঁছেছিল তা কেউ, কোনোদিন জানতে পারবে না।
মুহূর্তের মধ্যেই আমার মধ্যে এক নতুনতর উপসর্গ দেখা দিল। আমার সর্বাঙ্গ থরথরিয়ে কাঁপতে আরম্ভ করল। মনে হলো বুঝি কাঁপুনি দিয়ে জ্বর আসছে।
মস্কো-স্ট্রাম শব্দটার মাধ্যমে আমার দাদাভাই কী মর্মে মর্মে উপলব্ধি করেছিল তা আমি ভালোই জানতাম। আর সে আমাকে কি বোঝাতে চেষ্টা করেছিল তা-ও আমার জানা ছিল।
আমি স্পষ্ট বুঝতে পারলাম, যে বাতাস আমাদের ঠেলে নিয়ে চলছে তাতে স্ট্রামের ঘূর্ণাবর্তে গিয়ে অবশ্য হুমড়ি খেয়ে পড়ব, আর সে চরম মুহূর্তের আর দেরিও বেশি নেই। পৃথিবীতে এমন কোনো শক্তি নেই যা আমাদের নিশ্চিত মৃত্যুর কবল থেকে রক্ষা করতে পারবে।
কিন্তু ইতিমধ্যেই ঝড়ের প্রথম তাণ্ডব অনেকাংশে কমে গেল। কেবলমাত্র যে ঝড়ের প্রকোপই কমল তাই নয়। আকাশেও দেখা দিল, অভাবনীয় পরিবর্তন। এটুকু সময়ের মধ্যে যে এত পরিবর্তন ঘটতে পারে, তা বাস্তবিকই ভাবা যায়নি।
এতক্ষণ দিগন্ত পর্যন্ত আলকাতরার মতো কালো একটা পর্দা যেন প্রকৃতিকে ঢেকে রেখেছিল। কিন্তু হঠাৎ–একেবারে হঠাৎই আমাদের মাথার ওপরে এক টুকরো প্রায় বৃত্তাকার পরিষ্কার আকাশ দেখা দিল। এক টুকরো স্বচ্ছ নীল আকাশ। স্বীকার না করে পারছি না, এত পরিষ্কার আকাশ আমি আগে কোনোদিন দেখিনি। উজ্জ্বল নীল আকাশের গায়ে দেখা দিল অত্যুজ্জ্বল রূপালি চাঁদ। আর তার গা থেকে ঝলমলে আলো ঠিকরে বেরিয়ে আসতে লাগল।
কেবলমাত্র সমুদ্রের জলরাশির গায়েই নয়। চারদিকের সবকিছু যেন উজ্জ্বল আলোকচ্ছটার দৌলতে ঝলমলিয়ে উঠল। কিন্তু, কিন্তু হায় আল্লাহ। সে মনোলোভা উজ্জ্বল আলোকচ্ছটার কী দৃশ্যই যে শেষমেশ দেখলাম তা বর্ণনা করার মতো ভাষা আমার জানা নেই। আমি এবার ভাইয়ের সঙ্গে কিছু কথা বলার চেষ্টা করলাম। কিন্তু তখন কোলাহল এমন তুঙ্গে উঠে গিয়েছিল যে, তার কানের কাছে মুখ নিয়ে সাধ্যমত গলা চেঁচিয়ে কথা বলা সত্ত্বেও সে আমার একটা শব্দও শুনতে পেল না। কিছু না শুনে, কিছু না বুঝেই সে কেবলমাত্র মাথাটা নাড়ল।
আমি তার মুখের দিকে চোখ ফেরাতেই–নজরে পড়ল, তার মুখটা চকের মতো সাদা হয়ে গেছে। কীসের যেন এক আতঙ্ক তার মন জুড়ে রয়েছে।
আতঙ্কিত চোখে সে নীরব চাহনি মেলে আমার মুখের দিকে তাকাল। যেন সে কিছু একটা বলতে চাইছে। আমি শুধুমাত্র এটুকুই বুঝলাম যে, সে আমাকে বলতে চাইছে শোনো, কি বলছি। প্রথম দিকে কিছু আমার বোধগম্য হলো না। ঠিক তখনই ভয়ঙ্কর একটা ভাবনা আমার মাথাচাড়া দিয়ে উঠল। আমি ব্যস্ত হাতে পকেট হাতড়ে ঘড়িটা বের করলাম। সেটাকে চোখের সামনে তুলে ধরে দেখলাম, বন্ধ হয়ে রয়েছে।
