যা-ই হোক, সে মুখে কুলুপ এঁটে ঠায় দাঁড়িয়ে রইল, টু-শব্দটাও করল না। যাকে বলে একেবারে নির্বাক নিষ্পন্দভাবে যে দাঁড়িয়ে রইল।
আর আমি? সমগ্র পৃথিবীটার বিনিময়েও আমি শত চেষ্টা করেও মুখে কোনো কথা, এমনকি অর্থহীন কোনো শব্দও জোগাতে পারলাম না। এমন অভাবনীয় একেবারেই অপ্রত্যাশিত একটা পরিস্থিতি মোকাবিলা করার ফলে আমার শরীরের সব কটা স্নায়ু যেন একই সঙ্গে সচকিত হয়ে পড়ল। আর ঘাড়ের কাছ থেকে একটা হিমেল স্রোত শিরদাঁড়া বেয়ে দ্রুত নিচের দিকে নেমে গেল।
একটা নিরবচ্ছিন্ন দুর্বিষহ উল্কণ্ঠা আমাকে চেপে ধরল। তীব্র কৌতূহল আমার মন-প্রাণ ছেয়ে ফেলল। কর্তব্য স্থির করতে না পেরে আমি কপালের চামড়ায় বিস্ময়ের ভজ এঁকে চেয়ারে হেলান দিয়ে নিশ্চল-নিথরভাবে অপলক চোখে তাকিয়ে রইলাম। আমার শ্বাসক্রিয়াও যেন বন্ধ হয়ে গেছে।
আমার ফুসফুস নিঙড়ে চাপা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো। প্রায় অস্ফুট স্বরে, উচ্চারণ করলাম–‘হায় ঈশ্বর! তার একী হাল দেখছি! শরীরটা যে শুকিয়ে একেবারে পোড়াকাঠ হয়ে গেছে। তার দেহের কোথাও আগেকার সে রূপ লাবণ্যের চিহ্নও যে নজরে পড়ছে না। এ আমি কাকে দেখছি! এ-ই কি আমার বাগদত্তা বেরেনিস, নাকি অন্য কেউ!
আমার জ্বলন্ত দৃষ্টি তার সর্বাঙ্গে বার কয়েক চক্কর মারার পর শেষপর্যন্ত তার মুখের ওপর স্থির হল।
আমি মুহূর্তে সচকিত হয়ে খাড়াভাবে বসে পড়লাম। অনুসন্ধিৎসু দৃষ্টি মেলে তার মুখের দিকে তাকালাম। দেখলাম, তা চকের মতো ফ্যাকাশে কপালটা যেন ঠেলে বাইরে বেরিয়ে আসতে চাইছে। আর চক-চকও করছে অস্বাভাবিক। অতীতের কুচকুচে কালো চুলের গোছার কিছুটা অংশ সামনের দিকে ঝুলে-পড়ে ফ্যাকাশে কপালটার বেশ কিছুটা অংশ ঢেকে দিয়েছে।
চোখের মণি দুটোনিষ্প্রভ, প্রাণহীন। মনে হচ্ছে চোখের কোটর দুটোতে মণির অস্তিত্বও বুঝি নেই।
তারনিষ্প্রভ চোখের মণি দুটো থেকে আমার দৃষ্টিকে তুলে নিয়ে তার পাতলা, কুচকুচে কালো ঠোঁট দুটোর ওপর রাখলাম। মুহূর্তেই ঠোঁট দুটো সামান্য ফাঁক হল। অর্থপূর্ণ হাসির ছোপ তার চোখে মুখে ফুটে উঠল। ঝকঝকে দাঁতগুলো আমার চোখের সামনে স্পষ্ট হল। পরমপিতার ইচ্ছায় যেন আমাকে আর কোনোদিন সে দৃশ্যের সম্মুখীন হতে না হয়। আজ যখন তা আমাকে দেখতেই হল, তার আগে আমার মৃত্যু হলো না কেন? কেন আমি পৃথিবী ছেড়ে লোকান্তরে চলে গেলাম না।
আমি ঝট করে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালাম, তাকিয়ে দেখলাম, আসলে আচমকা দরজা বন্ধ হওয়ায়, দরজার পাল্লা দুটোর ঠোকাঠুকির আওয়াজ হতেই আমাকে আচমকা ঘাড় ঘোরাতেই হল। দেখলাম, আমার বোন বেরেনিস ঘর ছেড়ে চলে গেছে। ঘর ছেড়ে গেছে বটে, কিন্তু আমার মনের গোপন কন্দর ছেড়ে তো চলে যায়নি। তাড়িয়ে দিলেও সে যাবে না। যেতে পারে না, দাঁতের পাটি দুটোর ভৌতিক ঝকঝকানি তো আমার মনের আড়ালে যাবে না। সাদা–একেবারে বরফের মতো সাদা, কোথাও তিলমাত্র দাগ নেই। এনামেলের ওপর সামান্যতম ছায়াপাতেও হয়নি। আরও আছে। কোথাও কিছুমাত্রও ক্ষয় হয়নি।
একটা কথা তো আর মিথ্যা নয়, তার সে ক্ষণিকের হাসিটুকুই যে দাঁতের পাটি আমার স্মৃতিতে সুস্পষ্ট ছাপ এঁকে দিয়েছে। তখন তার মনোলোভা দাঁতগুলোকে যেমন সুন্দর দেখেছিলাম এখন সেগুলোকেই স্পষ্টভাবে দেখতে পাচ্ছি।
দাঁত। দাঁতের পাটি। দাঁতের সে পাটি দুটো এখানে উপস্থিত, সেখানে উপস্থিত, সর্বত্র উপস্থিত–একেবারে আমার চোখের সামনে উপস্থিত, হাতের নাগালের মধ্যে উপস্থিত। লম্বা, সরু আর ঝকঝকে চকচকে দাঁতগুলো ঠোঁট দুটো দিয়ে চেপে ধরে রাখা হয়েছে।
ব্যস। সে মুহূর্তেই আমার মনোম্যানিয়া ভয়ঙ্কররূপে দেখা দিয়েছে। আমার প্রাণাধিকা বেরেনিসের অত্যাশ্চর্য অপ্রতিরোধ্য প্রভাবের বিরুদ্ধাচারণ, প্রতিরোধের যাবতীয় প্রয়াসই দারুণভাবে ব্যর্থ হয়ে গেছে। বাইরের জগতের অগণিত দ্রব্য সামগ্রির মধ্য থেকে দাঁত ছাড়া দ্বিতীয় কোনো ভাবনা আমার মনের কোণে স্থান করে নিতে পারে না। তার কবল থেকে অব্যাহতি পাবার জন্য আমি অস্থির হয়ে পড়লাম। অন্য যাবতীয় বস্তু, যাবতীয় উৎসাহ–আগ্রহ সে একটামাত্র চিন্তায় ডুবে গেল। আমার মনের চোখের সামনে অন্য সবকিছুর অস্তিত্ব লোপ পেয়ে গিয়ে তারাই শুধুমাত্র তাদের উপস্থিতিই অনুভব করতে পারছি। কেবলমাত্র তারাই আমার অন্তরের অন্তঃস্থলের মূলমন্ত্রে। পরিণত হয়ে গেল।
আমি সব রকমের আলোকরশ্মিতে, সব রকম প্রেক্ষাপটে তাদের চাক্ষুষ করলাম। তাদের বৈশিষ্ট্যকে বিচার-বিশ্লেষণ করলাম। আর তাদের গঠন প্রকৃতি নিয়েও কম ভাবনা-চিন্তা করলাম না। তাদের পরিবর্তনের ব্যাপার-স্যাপার নিয়েও আকাশ-পাতাল ভাবলাম। কেবল ভাবনা, ভাবনা, আর ভাবনায় আমি তলিয়ে রইলাম।
ক্রমে সন্ধ্যার আলো-আঁধারীর খেলা শুরু হয়ে গেল। আমাকে ঘিরে নেমে সন্ধ্যার অন্ধকার। সে অন্ধকার ক্রমে গাঢ় থেকে গাঢ়তর হল। ক্ষণিকের জন্য থমকে থাকল। তারপরেই চলে গেল। নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল আমার চারিদিকের অন্ধকার।
অন্ধকার কেটে গিয়ে ধীরে ধীরে দিনের আলো নেমে এলো। ফুটফুটে ঝকঝকে দিন। একটু একটু করে দ্বিতীয় রাতের চারদিকে জমতে লাগল, ক্রমে আমাকে ঘিরে ফেলল।
সে অন্ধকার নির্জন-নিরালা অন্ধকার ঘরটায় আমি চেয়ার আঁকড়ে বসে রয়েছি তখনও সে একই চিন্তা আমার মাথার চারদিকে ভিড় করে রয়েছে, আমি চিন্তার সমুদ্রে পুরোপুরি ডুবে রয়েছি। এমন সে ঝকঝকে দাঁতের পাটি দুটোর ভৌতিক উপস্থিতি বীভৎস স্পষ্টতায় পরিবর্তনশীল আলো-আঁধারীতে নিঃশব্দে ভেসে বেড়াচ্ছে।
