আমার যে বিষয়কেন্দ্রিক উন্মত্ততা রোগটাকে মনোমালিন্য বলে অভিহিত করা যেতে পারে। আর যদি মনোম্যানিয়া নামেই রোগটা বর্ণনা দিতে হয়–এক বিশেষ ধরনের মানসিক বিকার।
এ তো আরও একেবারে অসম্ভব-অবিশ্বাস্য কোনো ব্যাপার নয়, যে আমার রোগটার যথাযথ বিবরণ দিয়ে আমার পক্ষে বোঝানো সম্ভব হচ্ছে না। আসল সমস্যাটা কোথায় জানেন? এ ব্যাপারে অজ্ঞ, অর্থাৎ সাধারণ মানুষের মনে এ বিশেষ রোগটা সম্বন্ধে ধারণা দান করা সম্ভব নয়, কিছুতেই নয়।
ক্লান্তি অবসাদবিহীনভাবে একটা বইয়ের বিশেষ অলংকরণ বা অক্ষরগুলোর দিকে নিরবচ্ছিন্ন মনোযোগের দিকে অপলক চাহনি মেলে চেয়ে-থাকা; প্রচণ্ড গ্রীষ্মে প্রায় সারাদিন ঘরের মেঝে বা পর্দার গায়ে তির্যকভাবে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়া ছায়ার দিকে চেয়ে চেয়ে একনিষ্ঠভাবে কাটিয়ে দেওয়া, চুল্লির জ্বলন্ত একটা অঙ্গার বা মোমবাতির শিখার দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ রেখে সারাটা দিন স্থবিরের মতো বসে নিজেকে সম্পূর্ণরূপে হারিয়ে ফেলা, আর একনাগাড়ে বার বার দীর্ঘ সময় ধরে একটা কথাই বলে-বলে শেষপর্যন্ত তাকেই ভুলে-যাওয়া, নতুবা দীর্ঘ সময় ধরে কর্মহীনভাবে শরীরটাকে পুরোপুরি সুস্থির করে রাখার ফলে গতিশক্তির অথবা শরীরটার অস্তিত্ববোধকেই হারিয়ে ফেলা রোগের প্রভৃতি লক্ষণ অন্যান্য অনেকগুলো লক্ষণের মধ্যে সবচেয়ে স্বল্প ক্ষতিকারকও খুবই সাধারণ উপরোক্ত লক্ষণগুলো সত্যিই তেমন ক্ষতিকারক নয়।
আমার রোগের বিবরণ কিঞ্চিৎ হলেও দিলাম তো বটেই। যাক, আমার ব্যাধি যন্ত্রণার সাময়িক বিরতির ফুরসতটুকুতে আমার বোন বেরেনিসের ব্যাধির প্রকোপ দেখে আমি সত্যি খুবই মর্মাহত হই, তার শান্ত-স্বাভাবিক জীবনের সে পরিণতি আমার মনের ওপর গভীর প্রভাব বিস্তার করে। মন-প্রাণকে অস্থির করে তোলে। আর আমি গালে হাত দিয়ে বিষণ্ণ মনে বসে তার নিষ্ঠুর ব্যাধির অসহনীয় যন্ত্রণার কথা ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে ভাবি। কেবল ভাবনা আর ভাবনা। এ-ভাবনার বুঝি আর শেষ নাই, সীমা নাই।
তবে একটা কথা খুবই সত্য যে, বেরেনিসের শারীরিক যাবতীয় পরিবর্তনের চেয়ে তার দৈহিক পরিবর্তনের ব্যাপার, বিশেষ করে তার ব্যক্তিসত্তার ভয়ঙ্কর বিকৃতির ব্যাপারটা নিয়ে ভাবনা-চিন্তা করতে আমার মন বেশি উৎসাহি। তার শারীরিক পরিবর্তনটুকু দেখে আমার মন-প্রাণ যে কী পরিমাণ বিষিয়ে ওঠে, তা ভাষায় ব্যক্ত করা অর্থাৎ কথার মাধ্যমে কারো মধ্যে ধারণার সঞ্চার আমার পক্ষে অন্তত সম্ভব নয়।
তার অত্যুজ্জ্বল দিনগুলোতে, তার সর্বাঙ্গ দিয়ে রূপের জৌলস ঠিকরে বের হত, যখন সে সত্যিকারের রূপসি ছিল তখন কিন্তু আমি তাকে ভুলেও ভালোবাসিনি, কোনোদিনই না একটা মুহূর্তের জন্যও নয়।
প্রথম প্রত্যূষের ধুসর আলোকরশ্মির ভেতর দিয়ে মধ্যাহ্নে লতাপাতা আর ঝোঁপ ঝাড়ের ছায়ায়, রাতে আমার গ্রন্থাগারের অখণ্ড নীরবতার মধ্যে হঠাৎই সে আমার চোখের সামনে উদয় হত। আমি কিন্তু তাকে তখন অবশ্যই জীবিত বেরেনিসরূপে পেতাম না। তবে কোন কোন রূপে? ঘুমের ঘোরে স্বপ্নরাজ্যের বেরেনিসরূপে! ইহলোকের কোনো পার্থিব জীবরূপে নয়, তার বিমূর্ত সত্তা হিসেবে।
বেরেনিস তখন প্রশংসার যোগ্য, প্রশংসার বিষয় ছিল না, ছিল বিশ্লেষণ করার মতো বিষয়। আর অন্তরের ভালোবাসা দান করার উপযুক্ত পাত্র নয়, জটিল ভাবনা চিন্তা করার মতো পাত্র। তার আকস্মিক উপস্থিতিতে।
কিন্তু এখন? এখন তাকে দেখামাত্র আমি সচকিত হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ি, শিউরে উঠি, গায়ের রোমগুলো অতর্কিতে একসঙ্গে খাড়া হয়ে ওঠে। যদি হঠাৎ দেখতে পাই, সে গুটিগুটি আসছে তবে মুহূর্তের মধ্যে আমার মুখ কালো হয়ে ওঠে। তবে এও সত্য যে, তার এ-রূপ চাক্ষুষ করামাত্র আমার বুকটা যেন ফেঁটে যেতে চায়, ঠেলে কান্না বেরিয়ে আসার উপক্রম হয়। হ্যাঁ, ঠিক তখনই–সে মুহূর্তেই আমার মনে পড়ে যায়, বেরেনিস আমাকে ভালোবাসত, দীর্ঘদিন ধরেই সে আমাকে ভালোবাসত। আর আমি? আমি এক অশুভ মুহূর্তে তার কাছে বিয়ের প্রস্তাবও করেছিলাম। আর আমি মনের দিক থেকে অনেকখানি এগিয়েও গিয়েছিলাম।
বেরেনিস আমার প্রস্তাবে সহজেই রাজি হয়ে গেল। শেষপর্যন্ত আমাদের উভয়ের সম্মতিক্রমে বিয়ের দিন নির্ধারিত হল। বিয়ের ব্যাপারে তার আগ্রহ আমার চেয়ে কোনো অংশে কম ছিল না।
আমাদের বিয়ের দিন ক্রমে এগিয়ে আসতে লাগল। আর সে সময়ই এক শীতের বিকালে আমি লাইব্রেরির ভেতর দিককার একটা ঘরে বসে। হাতে একটা খোলা-বই। হঠাৎ বইটা থেকে চোখ তুলে দরজার দিকে তাকাতেই দেখলাম, বেরেনিস আমার কাছাকাছি, একেবারে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে। সে যে কখন চুপি চুপি ঘরে ঢুকেছে, বুঝতেই পারিনি।
হঠাৎই আমার মধ্যে কেমন একটা অভাবনীয় পরিবর্তন, অদ্ভুত ভাবান্তর ঘটে গেল, বলতে পারব না। আমার উত্তেজনাপূর্ণ কল্পনার জন্য, কুয়াশার চাদরে মোড়া স্যাঁতাতে আবহাওয়ার জন্য, ঘরের ভেতরের সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসার পূর্বমুহূর্তের আলো-আঁধারির জন্য, নতুবা ছাই রংবিশিষ্ট পর্দাগুলো তার চারদিকে ঝুলে থাকার জন্যই হোক, কিন্তু কেন যে তার অবয়বটা এমন অস্পষ্ট হয়ে দোল খাচ্ছিল আমার পক্ষে বলা সম্ভব নয়। আসলে বহুভেবেও আমি নিশ্চিত কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারলাম না।
