তবে একটা কথা, বায়বীয় একটা মূর্তির কথা আমার মনে আজও বদ্ধমূল হয়ে রয়েছে, বিদেহী আর অর্থপূর্ণ কয়েকটা চোখ, গানের কলির মতো সুরেলা অথচ অস্পষ্ট, পরিবর্তনযোগ্য, নির্দিষ্ট আকারবিহীন, অস্থির-চঞ্চল একটা গভীর স্মৃতি। আবার ছায়ার মতোই আমার সঙ্গে যেন প্রতিনিয়ত সেঁটে রয়েছে। যতদিন আকাশে সূর্যের অস্তিত্ব থাকবে, পৃথিবীতে সূর্যালোক বিরাজ করবে, ততদিন তার হাত থেকে। অব্যাহতি পাওয়া আমার সম্ভব নয়–কিছুতেই নয়।
যে ঘরে আমি ভূমিষ্ঠ হয়েছিলাম। পৃথিবীর আলো প্রথম দেখেছিলাম। সে কালকে অস্তিত্বহীন জ্ঞান করেছি হঠাই জেগে উঠেছিলাম এক বাড়ির মুল্লুকে- সম্পূর্ণ কাল্পনিক এক প্রাসাদে মঠসুলভ ভাবনা-চিন্তা আর পাণ্ডিত্যের এক অনৈসর্গিক মুলুকে। সে জন্যই তো অত্যাশ্চর্য এবং নিষ্পলক চাহনি মেলে চারদিক তাকিয়ে তাকিয়ে দেখেছিলাম। পুঁথিপত্র ঘেটে ঘেটে আমার শৈশব আর বাল্যকালটা কাটিয়েছি আর দিবাস্বপ্নে বিভোর থেকে যৌবনটাকে ব্যয় করে দিয়েছি। এটা তেমন বিশেষ করে বলার মতো ব্যাপারই নয়।
কিন্তু বিশেষ করে বলার মতো ব্যাপার একটা অবশ্যই আছে। কি সেটা? একের পর এক বছর অতিবাহিত হয়ে গেল, যৌবনের মাঝামাঝি পৌঁছেও আমি পূর্বপুরুষদের প্রাসাদটা আঁকড়েই আমি পড়ে রইলাম। অবাক হবার মতো ব্যাপার হচ্ছে, আমার । জীবনের আনন্দ-ফুর্তি আর উদ্দামতা চাপা পড়ে গেল স্থবিরতার চাপে পড়ে। আর আশ্চর্য ব্যাপার হচ্ছে, আমার যাবতীয় ভাবনা-চিন্তাগুলো কেমন একেবারে পাল্টে গেল।
এবার থেকে পৃথিবীর যাবতীয় বাস্তব ব্যাপার স্যাপার আমার কাছে স্বপ্নময় হয়ে উঠল, আর স্বপ্নের জগতের অস্বাভাবিক-অসংযত ধ্যান ধারণাগুলো কেবলমাত্র আমার নিত্যকার জীবনের সম্বলই যে হয়ে উঠল তা-ই নয়, আসলে আমার একান্ত অস্তিত্বে পরিণত হয়ে গেল। মোদ্দা কথা, আসল ছেড়ে আমি নকলকেই আঁকড়ে ধরলাম।
.
এবার আসল প্রসঙ্গে যাচ্ছি। বেরেনিস আর আমার সম্পর্কের কথাটা আপনাদের বলেই ফেলি। আমরা সম্পর্কে ছিলাম ভাই-বোন।
আমার পূর্বপুরুষের পৈত্রিক প্রাসাদেই আমরা দুজনে এক সঙ্গে কাছাকাছি পাশাপাশি বড় হয়েছি। তবে এও সত্যি যে, আমরা সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র পথে, স্বতন্ত্র উপায়ে গায়ে-গতরে বেড়ে উঠতে লাগলাম–আমি রোগাটে, মনমরা–আর সে বনহরিণীর মতো চঞ্চলা, রূপসি, তন্বী, প্রাণশক্তিতে ভরপুর, উচ্ছসিতা।
আমি মঠে পুঁথিপত্রের পাতা নিয়ে মঠের কক্ষে বন্দি থাকতাম, আর সে আপন খেয়াল খুশিতে এক পাহাড় থেকে অন্য পাহাড়ে ঘুরে ঘুরে বেড়াত।
আমি একান্তভাবে নিজের মধ্যে বাস করতাম। একাগ্র ধ্যানে দেহ-মন সঁপে দিয়ে দিন কাটাতাম, আর সে বাধা বন্ধনহীনভাবে জীবনের পথে পথে চক্কর মেরে বেড়াত। কিন্তু সে পথে যে কোনোদিন অন্ধকার কালো ছায়ায় চাপা পড়ে যেতে পারে সে। ভাবনা-চিন্তা মুহূর্তের জন্যও তার মাথায় আসত না।
বেরেনিস। তার নামটা স্মৃতির কোণে ভেসে উঠল, বেরেনিস। আর তার নামটা মনে পড়ামার স্মৃতির বিবর্ণ ধ্বংসস্তূপ থেকে হাজার হাজার কলহাস্য মুখর উদ্বেলিত মুখাবয়ব সে ডাক শোনামাত্র সচকিত হয়ে উঠল।
উফ! তার ছবি আমার সামনে কত স্পষ্ট হয়ে যে দাঁড়িয়েছে, ঠিক যেমনভাবে, সে রূপ নিয়ে যে প্রথম জীবনের আনন্দমুখর দিনগুলোতে আমার মুখোমুখি দাঁড়াত।
উফ! কী যে অদ্ভুত সৌন্দর্যের মূর্ত প্রতীক সে ছিল, তা ভাষায় বর্ণনা করা। বাস্তবিকই সাধ্যাতীত। আহা! তার রূপ-সৌন্দর্য এমন অবর্ণনীয় ছিল যে, মনে হত আলহিমের বনে যেন একটা পীর মনের খেয়ালে অবস্থান করছে। অনেক ঝর্ণার মধ্যে সে ছিল সবচেয়ে বেশি বেগবতী–চঞ্চলা।
তারপর? তারপরই সবই রহস্যে ঘেরা আর আতঙ্কে ভরপুর। সে কাহিনী এমন রহস্য আর আতঙ্ক সৃষ্টিকারী যা বলা সঙ্গত হবে না। রোগ, এক ভয়ঙ্কর রোগের কবলে সে পড়ল। আর দেখতে দেখতে আমার চোখের সামনেই তার ওপর দিয়ে পরিবর্তনের। এক তীব্র জোয়ার দ্রুত বয়ে গেল, তার দেহ-মন ছেয়ে ফেলল, তার অভ্যাস, চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যকে এক সূক্ষ্ম আর ভয়ঙ্কর প্রভাবের সঙ্গে তার সত্তাটাকে পর্যন্ত বিঘ্নিত ছিন্নবিচ্ছিন্ন করে ফেলল।
উফ্। মৃত্যু চোখের পলকে এলো আর চলে গেল। যাবার সময় তার শিকারকে– সে গেল কোথায়? কোথায় চিরদিনের মতো চলে গেল? আমার পক্ষে তাকে চেনা সম্ভব হত না, কিছুতেই না। আর যা-ই হোক, অন্তত বেরেনিস বলে তাকে চিনতে পারা আর আমার পক্ষে সম্ভব হয়নি।
হায়! ব্যাধি মারাত্মক! এক রোগই আমার বোনটার মধ্যে স্থায়ী আসন নিল। কিন্তু প্রধান রোগ তার দৈহিক আর নৈতিক সত্তায় মারাত্মক আলোড়ন সৃষ্টি করল, আর তার সহযোগি হয়ে যে সব রোগ তার শরীরে আশ্রয় নিয়েছে, তাদের মধ্যে এমন একটা রোগের নাম করা যেতে পারে, এমন একটা অনার রোগের যা সবচেয়ে যন্ত্রণাদায়ক আর অপ্রতিরোধ্য। আর একে অধিকাংশ লোকই ‘ভিমরি’ রোগ নামে অভিহিত করে থাকে। এর লক্ষণ, সংজ্ঞা হারিয়ে লুটিয়ে পড়া। আর সংজ্ঞা এমনই লোপ পেয়ে যায় যাকে একমাত্র মৃত্যুর সঙ্গেই তুলনা করা যেতে পারে। আর এ-রোগটার কবল থেকে অব্যাহতি পাওয়া যায় খুবই অল্পক্ষণের মধ্যে।
আর এরই মধ্যে আমার নিজের রোগ–হ্যাঁ, আমার নিজের রোগটা সম্বন্ধে আমাকে সতর্ক করে দেওয়া হয়েছে আমি যেন সেটার অন্য কোনো নামকরণ না করি। আর নিজের রোগটাও তখন লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়ে চলেছে। আর সেটা শেষপর্যন্ত একেবারে নতুনত্ব এবং অসম্ভব বিষয়কেন্দ্রিক উন্মত্ততা রূপ নিয়ে ঘণ্টায় ঘণ্টায় অনবরত বেড়েই চলল। আর আমাকে পুরোপুরি আচ্ছন্ন করে ফেলল।
