আমি বিদায় নিলে খামের মুখ ছিঁড়ে, চিঠি পড়ে মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়ত। আতঙ্কে কুঁকড়ে যেত, মুচ্ছা যেত অথবা রাগে ফুঁসতে থাকত।
আর চিঠি পড়ে তাদের কেউ কেউ এমন প্রতিজ্ঞাও করে বসত, ববি টমকিন বা টস ডবসনকে হাতের কাছে পেলে গাল টিপে ধরবে।
আমি পরিস্থিতির চাপে পড়ে এ-ব্যবসা থেকেও সরে দাঁড়াবার চিন্তা করলাম। আওে ধ্যুৎ! কথায় কথায় নতুন এ ব্যবসাটার নাম বলতেই ভুলে গেছি। যাক্ গে, এ ব্যবসটার নাম দিয়েছি–নকল ডাকঘর।
নকল ডাকঘর ব্যবসাটা বন্ধ করে এবার হাত দিলাম নতুন আর একটা ব্যবসায়। এর নাম দিলাম–সেকুর আইন। সেকুর কথার অর্থ যে বিড়াল, আশা করি তা আর কাউকে বলে দিতে হবে না।
ব্যাপারটা হচ্ছে, শহরের বিড়াল এত বেড়ে গেছে যে, একেবারে গিজগিজ করছে। লোকে অতিষ্ট হয়ে পড়েছে। অতএব শহরের একটা কর্তাব্যক্তি বা আইন করলেন। একটা করে বিড়াল ধরে দিলেই নগদ চার পেনি মিলবে।
গোড়ার দিকে আইন ছিল, এক একটা বিড়ালের জন্য নগদ চার পেনি পাওয়া যাবে। তারপর বলা হলো গোটা বিড়াল না দিলেও চলবে, বিড়ালের মাথা জমা দিলেই চার পেনি পাওয়া যাবে।
কয়দিন পরে আইন একটু বদলে নিয়ে বলা হল–বিড়াল বা বিড়ালের মাথা নয়, শুধুমাত্র বিড়ালের লেজটা জমা দিলে চলবে। আর লেজের বদলেও চার পেনিই মিলবে।
বিড়ালের প্রতিটা লেজের জন্য নগদ চারটি পেনি কম কথা!
ব্যস, আর দেরি নয়, আমি বিড়াল জড়ো করে আস্তানা ভরে ফেললাম। ইঁদুর খাইয়ে খাইয়ে তাদের তাগড়া করে তুলে বছরে তিন-চারবার তাদের লেজ কেটে প্রতিটার জন্য চারটি করে পেনি আদায় করতে লাগলাম। তবে তাড়াতাড়ি লেজ বাড়াবার জন্য ম্যাকাসার নামক কেশ তেল দিনে একবার করে তাদের লেজে মাখাতে হচ্ছে।
আজও আমি এ-ব্যবসাটাই আঁকড়ে ধরে রেখেছি। মোটা টাকা মুনাফা অর্জন করছি। সম্প্রতি আমি হাডসন নদীর তীরে একটা জায়গা কেনার জন্য দালাল নিযুক্ত করেছি।
বেরোনিস
দুঃখ বহুরকম। বিশ্বের মন্দভাগ্য বহুরকমের।
দুঃখ-দুর্দশা রংধনুর মতোই দৃঢ় দিগন্ত জুড়ে বিস্তৃত। আর তার রঙও ওই ধনুকের মতোই অদ্ভুত ধরনের, তবে একই রকম স্পষ্ট আর সংযোজিত। রঙধনুর মতোই। দিগন্ত জুড়ে অবস্থান করছে।
কিন্তু আমি অবাক হচ্ছি, এমনটা কি করে সম্ভব হলো যে সুন্দরের কাছ থেকেই আমি বিশেষ এক প্রকার অসুন্দরকে লাভ করলাম। এ যে রীতিমত অদ্ভুত, একেবারে। অবিশ্বাস্য কাণ্ড!
শান্তির চুক্তি সম্পাদিত হল। তাতে আমার ভাগ্যে শান্তি তো জুটলাই না, বরং অবর্ণনীয় দুঃখই পেলাম। নীতিশাস্ত্রে যেমন আছে, ভালো থেকেই আসে খারাপ, ঠিক তেমনিই বাস্তবেও আনন্দ-ফুর্তিই দুঃখ-যন্ত্রণাকে ত্বরান্বিত করে থাকে।
এক সময়ের অসীম আনন্দ আজ তা-ই অবর্ণনীয় দুঃখে পর্যবসিত হয়েছে। যদি–ই হয় তবে আজকের দুঃখ-যন্ত্রণার উদ্ভব ঘটেছিল অতীতের কোনো-না-কোনো অনাবিল আনন্দ-ফুর্তি থেকে।
আমি এক সময়, দীক্ষা নিয়েছিলাম। অতএব আমার একটা দীক্ষান্ত নাম অবশ্যই আছে–এগাউসসেটা। কিন্তু আমার পারিবারিক নামটা যেন আবার জানতে চাইবেন না। দুঃখিত ওটা আমি বলতে পারব না, মানে ইচ্ছে করেই বলব না।
অথচ এ-কথা খুবই সত্য যে, উত্তরাধিকার বলে পাওয়া আমার বসতবাড়িটা জরাজীর্ণ, ধূসর আর বিষণ্ণ হলঘরগুলোর চেয়ে বেশি প্রশংসিত ও সম্মানিত কোনো বাড়ি এদেশে নজরে পড়ে না। আমার বংশটা নাকি স্বপ্নবিলাসী। স্বপ্ন দেখে দেখেই আমার পূর্বসূরীরা নাকি জীবন কাটিয়ে দিয়েছেন।
আমার পূর্বপুরুষদের রেখে-যাওয়া প্রাসাদটার বৈশিষ্ট্যগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য প্রধান ঘরটার দেওয়ালের গায়ে অঙ্কিত ফ্লেস্কো চিত্র, যা যে কোনো শিল্পরসিকের মনকে প্রভাবিত করার ক্ষমতা রাখে। আর শোবার ঘরগুলো কেবলমাত্র যে বৈচিত্র্যে ভরপুর তাই নয়। এদের শিল্পনৈপুণ্যও অপলক চোখে তাকিয়ে দেখার মতোই বটে। অস্ত্রাগারে গেলে নিতান্ত বে-রসিককেও তার গায়ের ভাস্কর্যশৈলী চাক্ষুষ করে থমকে দাঁড়িয়ে পড়তে হবে। এত কিছু সত্ত্বেও বিশেষ করে প্রাচীন শিল্পরীতিতে অঙ্কিত চিত্রাবলী চিত্রসংগ্রহশালার দরজায় হাজির হলে চোখ দেখানো অবশ্যই দায় হয়ে পড়বে। এবার গ্রন্থাগার-কক্ষটার গঠন বৈচিত্র্যের মুখোমুখি চোখে-মুখে বিস্ময়ের ছাপ ফুটে উঠবে, কোনো সন্দেহই নেই। আর সব শেষে গ্রন্থাগারে সংরক্ষিত গ্রন্থগুলোর প্রত্যেকটা এমন স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য ধারণ করছে যে, বহু চেষ্টা করেও একের সঙ্গে অন্যের এতটুকুও সাদৃশ্য খুঁজে পাওয়া ভার। বসতবাড়িটার যা-কিছু বিবরণ দিলাম, সবকিছুই মানুষের সে বিশ্বাসের যথেষ্ট স্বাক্ষর বহন করছে, স্বীকার করতেই হবে।
আমার জীবনের গোড়ার দিককার স্মৃতি সে কক্ষটা আর গ্রন্থাগারটার বইগুলোর সঙ্গেই জড়িত, সীমাবদ্ধও বটে। তবে সে সম্বন্ধে আমি আর মোটেই মুখ খুলছি না।
আমার মা এ-প্রাসাদটাতেই দেহ রেখেছিলেন। আমিও এখানেই ভূমিষ্ঠ হয়েছিলাম। কিন্তু এমন কথা বলা সম্পূর্ণ অর্থহীন যে, ইতিপূর্বে আমার কোনো অস্তিত্বই ছিল না। আত্মার অতীত অস্তিত্ব থাকা সম্ভব নয়। এ-মতবাদে আপনারা কী বিশ্বাসী? ভালো কথা, এ ব্যাপারে আমরা একমত না-ই হলাম। মানুষে মানুষে মতো পার্থক্য তো থাকতেই পারে। এ-ব্যাপারে আমি আস্থাভাজন বিশ্বাস আছে বলে অন্যকে জোর করে বিশ্বাস করাবার তিলমাত্র ইচ্ছাও আমার নেই।
