সে ঘটনায় ওই জানোয়ারটা আমার নাক ভেঙেছিল, সে মোট পঞ্চাশ সেন্ট দিয়েছে। যে হতচ্ছাড়াটা আমার কাঁধ ভেঙে একসার করে দিয়েছে, আর পা-টাও টুকরো করে দিয়েছে, সে পাঁচ ডলার ক্ষতিপূরণ দিয়েছে। নতুন একটা প্যান্ট খরিদ করতে খরচ করেছি পঁচিশ সেন্ট। সব মিলিয়ে পঁচাত্তর সেন্ট মুনাফা পেয়েছি। খারাপ পেলাম কি করে?
কিছুদিন কারবারটা চালাবার পর একদিন একটু বে-কায়দায় পড়ে গিয়েছিলাম। আমার দেহের জিয়োগ্রাফিই পুরো পালটে যাচ্ছিল–এমন আড়ং ধোলাই খেয়েছিলাম। আমার বাইরেটা যেন অন্য মানুষের দেহ হয়ে যাচ্ছিল। কিছু পালটে গেলও বটে। লোকে আমাকে চিনতেই পারছিল না।
তাই কয়দিন ধরে ভেবে, আমার উপ-মস্তিষ্কটাকে খাঁটিয়ে কারবারের নতুন একটা মতলব বের করে ফেললাম। একেবারেই অত্যাধুনিক মতলব বেরিয়ে এল।
এ সুযোগে সে দয়াবতী মহিলার নামটা মনে মনে স্মরণ করে নিচ্ছি, সে আমার কচি বয়সে–কারবারের গোড়াতেই আমাকে পদ্ধতি শিরোমণি তৈরি করে দিয়ে গেছে। আমি অকপটে অঙ্গীকার করছি, সে দয়াবতী মহিলার নাম মৃত্যুকালে কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করব।
আরও ভেবে রেখেছি, দুনিয়া ছেড়ে যাবার আগে তার নামে কিছু না কিছু অর্থ উইল করে যাবই যাব।
যাক গে, এরপর আমার নতুনতর কারবারটার কথা অল্প কথায় বলার চেষ্টা করছি।
অত্যাধুনিক কারবারটার নামকরণ করেছি–কাদা ছিটানো কারবার। টাইপ মেশিন সামনে নিয়ে বসে-থাকা ফুলবাবুদের গায়ে একটু-আধটু কাদা মাখিয়ে দিয়ে ভড়কিয়ে দেওয়া। ব্যস, নগদ ছয় পেনি আদায় করা।
এ কারবারটা ছ্যাচড়ামি ছাড়া কিছু নয়। কিন্তু উপায় উপার্জন কম হচ্ছিল না। আমার কর্মস্থল ছিল ব্যাঙ্ক আর বড় বড় বাণিজ্যিক অফিস।
কাদা কিন্তু আমি নিজে মাখতাম না। প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত একটা কুকুর সর্বক্ষণ আমার ধারে কাছেই থাকত।
ব্যাংক, বাণিজ্যিক অফিস বা দোকান থেকে কেতাদুরস্ত বাবু বেরোলেই কুকুরটাকে গোপনে ইশারা করে বসতাম।
ব্যস, মুহূর্তের মধ্যেই সে নিকটবর্তী ডোবা বা নালা থেকে গায়ে পানি-কাদা মেখে কেতাদুরস্ত বাবুটার সামনে হাজির হয়ে যেত। কাছে এসেই গা-ঝাড়া দিয়ে তার সারা গায়ে কাদা ছিটিয়ে একেবারে ভূত বা নিয়ে দিত।
কেতাদুরস্ত বাবু রেগেমেগে লাঠির খোঁজে ছোটাছুটি শুরু করে দিত। ঠিক সে মুহূর্তে আমি গুটি গুটি সেখানে হাজির হয়ে যেতাম। আমার এক হাতে থাকত ইয়া মোটা একটি লাঠি আর অন্য হাতে একটা ব্রাশ।
কেতাদুরস্ত লোকটার অনুরোধে আমি কুকুরটাকে তাড়িয়ে দিতাম। তারপরই লেগে যেতাম ব্রাশ চালিয়ে তাকে সাফ সুতরা করার কাজে। বিনিময়ে আদায় করতাম আমার মজুরি। নোংরা কাজের মজুরি তো একটু বেশিই দিতে হতো।
কারবারটা ভালোই চলছিল। ছয় পেনি আদায় করে তার অর্ধেক আমার কারবারের অংশীদার কুকুরটাকে খাবার কিনে দিতাম। পদ্ধতিটা আমার। অতএব অর্ধেক তো আমার পকেটে উঠবেই।
না, বেশিদিন এ কারবারে ধৈর্য রাখতে পারলাম না। বিরক্ত হয়ে মাথা থেকে এটাকে মুছে ফেললাম।
ঠিক এরকমই আর একটা কারবার নিয়ে কিছুদিন মেতেছিলাম। কর্মস্থল শহরের চৌমাথা। কেতাদুরস্ত কোনো বাবু দেখলেই রাস্তা ঝাটা দিতে লেগে যেতাম। তার পোশাকে ধুলো ময়লা জড়িয়ে যেত। তারপর ব্যস্ততা দেখিয়ে নিজেই পাশের ডোবা থেকে পানি এনে ধুয়ে মুছে দিতাম। দক্ষিণানিতাম এক পেনি।
কারবারটা ভালোই চলছিল। আমার অর্থাগমের লক্ষ্য ছিল ব্যাঙ্কের ফুলবাবুরা। কিন্তু ব্যাংকগুলো একে একে লাটে উঠে গেল। আমার কারবারও উঠল সিকেয়।
তারপর মেতেছিলাম দমাদম বাজনা নামক এক কারবার নিয়ে। রীতিমত মৌলিক পদ্ধতির কারবার। নামমাত্র দাম দিয়ে একটা ভাঙা বাজনা খরিদ করে নিয়েছিলাম, যা থেকে বেসুর বেরায়।
তারপর সে বাজনাটা কাঁধে ঝুলিয়ে শহরের নিরিবিলি জায়গায় চলে যেতাম, যেখানে অখণ্ড শান্তি বিরাজ করত।
ব্যস, রাস্তার ধারে বসে দমাদম পেটাতে আরম্ভ করতাম ভাঙা বাজনাটকে। লোকে বিরক্ত হয়ে জানালা-দরজা বন্ধ করে দিত। গলা খেঁকিয়ে বলত, এখান থেকে কেটে পর বাছাধন। সে সঙ্গে সামান্য কিছু হাতে ধরিয়েও দিত। সারাদিনে এভাবে পকেট প্রায় বোঝাই হয়ে যেত।
তারপর আমি সপ্তম ব্যবসার দিকে ঝুঁকে পড়লাম। এতে চমৎকার পদ্ধতি প্রয়োগ করেছিলাম। তাই শহরের সর্বত্র আমার খ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছিল। আমার এবারের ব্যবসাটা হচ্ছে, হরেক নাম খামের গায়ে লিখে লোকের সঙ্গে প্রতারণা করা। আমি কমন ববি টমকিন, আবার কখনও বা টম জবসন নাম উল্লেখ করে চিঠি লিখতাম। চিঠি বলতে আজে-বাজে কথায় পাতা ভরা যাকে বলে। চিঠিটা, পড়ামাত্র যেন পায়ের। নখ থেকে মাথার চুল পর্যন্ত উত্তেজনায় ফেটে পড়ার জোগাড় হতো। তা নইলে আতঙ্কে যেন গা ছমছম করত।
চিঠিগুলো লেখা শেষ করে খুব যত্নের সঙ্গে একটা একটা করে খামে ভরতাম। তাদের নাম-ঠিকানা যোগাড় করার পদ্ধতি ছিল বাড়ির সামনের নেমপ্লেট দেখে।
খামের গায়ের ঠিকানাগুলো লিখে এক এক করে বাড়িতে হাজির হয়ে, ঠিকানা অনুযায়ী চিঠিগুলো বিলি করতাম।
খামের গায়ে কোনো ডাকটিকিট লাগানো নেই, বা উপযুক্ত ডাকটিকিট লাগানো নেই বলে, ডাক বিভাগের নামে উপযুক্ত ডাকটিকিটের মূল্যের দ্বিগুণ পয়সা আদায় করতাম।
চিঠির প্রাপক নিতান্ত অপরাধীর মতো আমার চাহিদা অনুযায়ী পয়সা দিতে আপত্তি করত না।
