বেশ কিছুদিন আমাকে জেলে ঘানি টানতে হলো। হতচ্ছড়াটার কৃপায় এই প্রথম আমি জেলে ঢুকলাম।
জেলখানা থেকে ছাড়া পেয়ে আবার অশোভন কারবারটা চালু করলাম বটে, কিন্তু আগের মতো রমরমা করে তুলতে পারলাম না।
কারবার কী করেই বা জমবে? ব্যাপারটা যে দ্রুত চারদিকে চাউর হয়ে গিয়েছিল।
কারবার উঠলই তো লাঠে। আমার আরোপিত পদ্ধতিটার প্রশংসা করছেন তো? এমন অভিনব আর চমৎকার একটা পদ্ধতির সুখ্যাতি না করে কি পারা যায়, বলুন?
যাক গে, মিছে কপাল চাপড়ে ফায়দা তো কিছু হবার নয়। এবার ভেবে-চিন্তে আর একটা নতুনতর মতলব বের করলাম। এটাও একেবারে অভিনব এক ব্যবসা। নামটা জানার জন্য মনটা উসখুস করছে, তাই না? ঠিক আছে, জিজ্ঞাসা দূঢ় করার জন্য ব্যবসার নামটা বলতেই হচ্ছে–ল্যাঙ্গ-মেরে পিটুনি-খাওয়া কারবার নাম কেমন অভিনব কি না?
কি ব্যাপার বলুন তো, কারবারের নামটা কানে যেতেই চোখ দুটো যে কপালে উঠে গেল?
আরে ধ্যুৎ! লেট লতিফ নাকি? সামান্য একটা ব্যাপার মাথায় ঢুকতে এত সময় লাগে? ঠিক আছে, খোলসা করেই বলছি–মনে করুন, ইচ্ছে করেই কোনো এক বেচারার মাড়িয়ে দিলাম।
ব্যস, মুহূর্তমাত্র দেরি না করে লোকটা দুম করে আমার নাকের ওপার সজোরে একটা ঘুষি মেরে বসলেন। আমার নাক দিয়ে গলগল করে রক্ত পড়তে আরম্ভ করল। এ অবস্থাতেই সোজা উকিলের দরজায় হাজির হলাম। আমার রক্তাপুত থেলানো নাকটা দেখে উকিল সাহেব নানাভাবে আক্ষেপ করতে লাগলেন। সান্ত্বনাও দিলেন বহুভাবে।
আমি এক হাজার ডলার ক্ষতিপূরণ দাবি করলাম। আমি তো ভালোই জানি, মধ্যস্থতা করা পাঁচশ ডলার হাতে মিলবে।
হোক না পাঁচশো ডলার। উকিলের প্রাপ্য মিটিয়ে দেওয়ার পরও যা হাতে থেকে যাবে, তা-ই বা কম কি?
নতুন এক দাঙ্গাবাজ ছেলেকে আগে থেকে বেছে রাখলাম। পকেট বইয়ের পাতায় তার নাম ঠিকানা টুকে রাখলাম–এটাই যে আমার পদ্ধতি জনাব। তারপর তাকে অনুসরণ করতে করতে রঙ্গালয়ে গেলাম। তাকে দেখলাম, দুপাশের দুই তন্বী যুবতিকে নিয়ে ওপরের বক্সে বসে মজা করে নাটক দেখাচ্ছে।
যুবতি দুজনের মধ্যে একজন মোটাসোটা থলথলে চেহারা যাকে বলে, আর দ্বিতীয়জন তালপাতার সেপাই–লিকলিকে চেহারা।
আমি বক্সে বসে চোখে অপেরা গ্লাস লাগালাম। তার মুখটা মোটাসোটা যুবতিটার দিকে ঘুরিয়ে দিলাম।
আমার ব্যাপার-স্যাপার যে যুবতিটার নজরে পড়ামাত্র তার মুখটা জবা ফুলের মতো লাল হয়ে গেল। বার কয়েক চোখ কটমট করে আমার দিকে তাকাল। তা সত্ত্বেও আমি নিজেকে সংযত করছি না দেখে সে বাধ্য হয়ে দাঙ্গাবাজ ছেঁড়াটার দৃষ্টি আকর্ষণ করল। তার কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে কি যেন বলতে লাগল। বুঝতে অসুবিধা হয় না? আমার বিরুদ্ধে তার কাছে জোর নালিশ করছে।
চকিতে আমার বুকে খুশির জোয়ার বইতে শুরু করল। বুঝলাম, আমার মতলবটা বাস্তব রূপ পেতে চলেছে।
ব্যস, আর মুহূর্তমাত্রও দেরি না করে আমি নিজের বক্স ছেড়ে গুটিগুটি পায়ে দাঙ্গাবাজ ছোঁড়াটার বক্সটার একেবারে সামনে গা-ঘেঁষে গিয়ে দাঁড়ালাম। আর সঙ্গে সঙ্গে নাকটাকে তার দিকে এগিয়ে দিলাম।
আশ্চর্য ব্যাপার! ছোঁড়াটা কিন্তু মুহূর্তের জন্য আমার দিকে তাকাল না। ব্যাপারটা যেন তার মধ্যে অনীহার সৃষ্টি করল। আমার দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালও না। এমন একটা ভাব চোখ-মুখে ফুটিয়ে তুলল যে, আমি যেন নিতান্তই তুচ্ছাতিতুচ্ছ একটা প্রাণি। আমার গায়ে হাত তোলার অর্থই যেন, আচমকা কুড়ানো।
আমি এবার ছোঁড়াটার একেবারে মুখের কাছে আমার ইয়া লম্বা নাকটাকে নিয়ে গেলাম। বেশ জোরে জোরে বার কয়েক নাক ঝাড়লাম। তবুও তাকে আমার প্রতি উদাসীনই দেখলাম। এবার দুম করে তার হাতের সঙ্গে আমার নাকটা ঘষে দিলাম।
কিন্তু হায়! এ কী তাজ্জব ব্যাপার! সে যেন ঠাণ্ডা মাথায়ই ব্যাপারটার নিষ্পত্তি করে ফেলল–হাত দিয়ে আলতোভাবে আমার নাকটাকে সরিয়ে দিল।
হতাশ হয়ে হাল ছাড়ার পাত্র আমি নই। এত সহজে তো আমি হাল ছেড়ে দিয়ে হাত গুটিয়ে বসে রইলাম না। এবার রোগা পটকা মেয়েটার দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করলাম। মওকা বুঝে তাকে দম করে চোখ মেরে বসলাম। এ মোক্ষম দাওয়াইটা ছেড়ে না দিয়ে পারলাম না। ব্যস, দাঙ্গাবাজ ছোঁড়াটা যন্ত্রচালিতের মতো লাফিয়ে উঠে আমাকে জাপ্টে ধরল। আমি ব্যাপারটা বোঝার আগেই সে আমাকে শূন্যে তুলে জানালা দিয়ে ছুঁড়ে একেবারে বাইরে ফেলে দিল। আমি গিয়ে রাস্তায় আছাড় খেয়ে পড়লাম।
আমার অবস্থা একেবারে খারাপ হয়ে পড়ল। ডান পায়ের হাড় ভেঙে একেবারে দু টুকরো হয়ে গেল। শুধু কি এই ঘাড়ের একটা হাড়ও গেল খুলে।
মনের মতো কাজ হয়েছে ভেবে কোনোরকমে খোঁড়াতে খোঁড়াতে বাসায় ফিরে এলাম।
পরদিন সকাল হতে না হতেই উকিলের বাড়ি হাজির হলাম। তার সাহায্যে পাঁচ হাজার ডলার ক্ষতিপূরণ দাবি করে বসলাম।
আমার নোট বইয়ের পাতায় প্রতিটা ঘটনার কথা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে লিখে রাখলাম। কোনো ঘটনার জন্য কত খরচাপাতি হয়েছে, লাভ হয়েছে কত টাকা–কিছুই লিখতে বাকি রাখলাম না। আমার পদ্ধতি যে মোক্ষম। এতটুকু ভুল হতেই পারে না।
এ নোট বইয়ের পাতায় লেখা রয়েছে ক্ষতিপূরণ কত টাকা আশা করেছিলাম অবশ্য প্রতিটা ঘটনায় প্রত্যাশার তুলনায় অনেক কম টাকাই পেয়েছি।
