রীতিমত উৎসাহ-আনন্দের মধ্য দিয়েই আমি কাজে মেতে ছিলাম। কিন্তু সেদিনই আমার বুকটা ফেটে চৌচির হয়ে যাচ্ছিল, যেদিন জবাই করা প্রতিষ্ঠানের মালিক আমার প্রাপ্য মিটিয়ে না দিয়েই আমাকে জবাই করে ছেড়ে দিল।
আমি তো মোটেই বেহিসেবি নই, বরং অতিমাত্রায় হিসেবিই বলা চলে। প্রতিটা কানাকড়ির হিসাব নোট বইয়ের পাতায় টুকে রেখেছি। লোকে বলে হিসেবের কড়ি বাঘেও ছুঁতে পারে না, কিন্তু জবাই-করা মালিক বাবাজী আমার প্রাপ্য বেমালুম হজম করে বসল।
হতচ্ছাড়া দর্জি আমার চোখে পানির ধারা নামিয়ে ছাড়ল। মাত্র দুটো পেনি আত্মসাৎ করে দেওয়ায় তার সঙ্গে তুমুল ঝগড়া করে কাজটা ছেড়ে দিতে গিয়ে আমার পাঁজরের একটা হাড় যেন খসে যাচ্ছিল। কিন্তু বিশ্বাস করুন, পেনি দুটো আমি মোটেই নিজের ভোগে লাগাইনি। পেনি দুটো যদি নিজের ভোগে না-ই লাগিয়ে থাকি, তবে গেল কোথায়, তাই নয়? তবে খুলেই বলছি–কাগজের একটা ধবধবে সাদা কলার কিনে ময়লা কলারটা পাল্টে সেখানে লাগিয়ে দিয়েছিলাম। এর দরকার কি ছিল? প্রশ্ন উঠতে পারে। জবাই করা প্রতিষ্ঠানের ইজ্জত বাড়ানোর জন্য আমি এ কাজটা নিজের বিবেচনা মতোই করেছিলাম।
যারা সত্যিকারের ব্যবসায়ী তারাই এ বিশেষ পদ্ধতির গুরুত্বটাকে অবশ্যই মেনে নেবেন। কিন্তু কেবলমাত্র জবাই-করা প্রতিষ্ঠানের মালিক মেনে নেয়নি।
আমাকে জব্দ করার জন্য হতচ্ছাড়াটা এক পেনি দিয়ে এক পাতা ফুলস্কেপ কাগজ কিনে দেখানোর জন্য জেদ ধরেছিল। আর দেখতে চেয়েছিল যে, কাগজ দিয়ে কেমন চমৎকার জামার কলার তৈরি করা যায়।
ধাপ্পা, সে ধাপ্পা নয় কি? স্রেফ ধাপ্পা ছাড়া আর কি-ই বা একে বলা চলে, বলুন তো? ধাপ্পা ছাড়া আর যে জুতসই শব্দ এখানে ব্যবহার করা চলে তা হচ্ছে ধান্ধাবাজী। ব্যাপারটা তো একটা পেনি বাঁচানোর ব্যাপার। এক পেনি বাঁচানোর অর্থই তো আমার প্রাপ্য। একটা পেনি কেঁপে দেওয়ার ধান্ধা। আর শতকরা পঞ্চাশ পেনি ঠকানোর ধান্ধা করা। নচ্ছাড়টা করল তাই। একেই কি বলে কারবার? পদ্ধতির গোড়ায় কুড়াল চালানো নয় কি?
আমি পরিষ্কার বুঝে নিলাম, এমন একজন ধান্ধাবাজের সঙ্গে আমার মতের আর। মনের মিল নির্ঘাত হবে না। আমি সততা রক্ষা করে চললে কি হবে, তার মাথায় তো। সব সময় ঠকানোর মলতব চক্কর মারছে।
আমি তার মতলবটা সম্বন্ধে নিঃসন্দেহ হয়ে তার চাকরির বদলে পদাঘাত করে কারখানা ছেড়ে বেরিয়ে এলাম।
চাকরি করতে এসে তো আর নাকে খত দেইনি–নিজের পদ্ধতি জলাঞ্জলি দেওয়া তো সম্ভব নয়। দর্জির কাছ থেকে সরে এসে অশোভন কারবার শুরু করলাম। এবার আর কারো অধীনে থেকে কারবারে মাতা নয়, সম্পূর্ণনিজস্ব কারবার।
সদ্য গড়ে তোলা কারবারের মালিক আমি নিজেই, কর্মচারীও আমিই। তবে কারবারটা সত্যি খুবই লাভজনক, আবার অবশ্যই সম্মানজনকও বটে। আর বিস্তর স্বাধীনতাও আছে।
যেহেতু আমি নিজেই কারবারের মালিক তাই সর্বক্ষণ কানের কাছে ফাটা রেকর্ডের মতো ঘ্যানর ঘ্যানর করারও কেউ নেই। নিজের মর্জিমাফিক কাজ করো, দোষ ত্রুটি ধরার বলতে কেউ-ই নেই!
আমার একেবারেই নতুন ধরনের কারবারটায় আমার নির্ভেজাল মিতব্যয়িতা, সময়ানুবর্তিতা, ব্যবসায়িক কৌশল ও অভ্যাস আর সততা–গুণগুলোর সবকয়টাই কাজে লাগাতে পারলাম, কম কথা?
আমার অভিনব কারবারটার পসার জমতে দু-চারদিনের বেশি সময় লাগল না। আর দাগী হতেও সময় লাগল না।
আমার অভিনব অশোভন কারবারটার কথা সংক্ষেপে বলে দেওয়া যাক, কি বলেন?
এ দুনিয়ার বেশ কিছু সংখ্যক হঠাৎ ধনকুবের বনে যাওয়া, নইলে ছন্নছাড়া বাউণ্ডুলে ওয়ারিস বা ডকে-ওঠা প্রতিষ্ঠান আছে যারা ইয়া বড় প্রাসাদ তৈরি করতেই থাকে।
প্রাসাদ তো বানাতে আরম্ভ করল–যখন তৈরির কাজ অর্ধেক হয় তখন কাছেই বা ঠিক ঢোকার মুখে কাদামাটি দিয়ে জঘন্য কিছু তৈরি করে রাখতে হয়।
কাদা দিয়ে তৈরি বলতে কি বলতে চাইছি, তাই না? সেটা এস্কিমোদের বাসস্থল ইগলু হতে পারে প্যাগোডা হতে পারে, তা যদি না-ই হয় তবে হটেনটটদের অদ্ভুত ধরনের দোচালা হওয়াও কিছুমাত্র বিচিত্র নয়। তবে আর যাই হোক, এমনকিছু একটা হওয়া দরকার, যে-দিকে চোখ পড়লেই চোখের ভেতরে কড়কড়ানি শুরু হয়ে যায়, মেজাজ তুঙ্গে উঠে যাবে–তখনই ইচ্ছা হবে সেটাকে ধূলিসাৎ করে দেওয়া হোক।
এমনতর ইচ্ছাটা যখন মনের কোণে দানা বাঁধে ঠিক তখনই আমাকে একেবারে নিরীহ গোবেচারা ভালো মানুষের মতো, সাদাসিদে পোশাক-পরিচ্ছদ গায়ে চাপিয়ে অপদেবতার মতো আবির্ভূত হতে হয়।
ঠিক সে মুহূর্তেই কদাকার–একেবারে জঘন্য জিনিসটাকে দৃষ্টিপথের বাইরে চালান দেওয়ার মতো বিচ্ছিরি কাজটার দায়িত্ব নিজের কাঁধেই তুলে নেই। মতলবটা কি খারাপ, বলুন?
কাজটা হাসিল করার বিনিময়ে সামান্য কিছু প্রাপ্য আদায় করে নেওয়া। খুবই সামান্য অর্থ, তবে হাতে-হাতে আদায়। আর পাইও অবশ্যই। বলুন তো, এর মধ্যে অন্যায় কিছু আছে?
আপনি আর আমি এতে দোষ কিছু না পেলে কি হবে, কসাইয়ের মতো মানসিকতাসম্পন্ন এক হতচ্ছাড়া কিন্তু কাজটাকেনিষ্কলুষ বলে মনে করল না। আমার প্রাপ্য অর্থ মিটিয়ে তো দিলই না উপরন্তু আমাকে জোর করে ফটকে আটক করার ব্যবস্থা করতেও দ্বিধা করল না।
