এত বড় পৃথিবীটাতে আমি আমাকে একেবারে নিজের মতো করেই গড়ে তুলতে চাই, করবও ঠিক তাই। কলুর বলদের মতো চোখে ঠুলি পড়িয়ে আমাকে কেউ ঘোরাতে পারবে না। সে বান্দা এ-শর্মা নয়। আমি কি বাজিকরের হাতের পুতুল নাকি যে, যেমন খুশি আমাকে নাচিয়ে নিয়ে বেড়াবে? আমি স্বাধীন, মুক্ত! নিজের মর্জিমাফিক কাজে লিপ্ত থেকে ভবিষ্যৎ গড়ে তুলব। মাথার ওপরে কারো ছড়ি ঘোরাক, তোয়াক্কা করি না।
বাড়ি থেকে সটকে গিয়ে আমার মর্জিমাফিক হরেকরকম কারবার চালাতে গেলাম। তবে খুবই সত্য যে, পদ্ধতি অবলম্বন করেই কারবার চালাতে লাগলাম। আর সে পদ্ধতি একেবারেনিত্যনতুন।
আমার বলের মতো গোলাকার দেহযন্ত্র থেকে অনবরত একের পর এক সাফাই আনতে লাগল।
আমি আঠারো বছর বয়স পর্যন্ত রমরমা কারবার চালিয়ে গেলাম। তারপর! দরজির হটিয়ে-বিজ্ঞাপন লাইনে ভিড়ে গেলাম। কারবার জমাতে সময় লাগল না। এর বাজার বিস্তৃত-অঞ্চল জুড়ে, মালকড়িও ভালোই আমদানি হয়। অতএব কারবারে আমার উৎসাহ-উদ্দীপনা যে তুঙ্গে উঠে গিয়েছিল, আশা করি তা খোলসা করে না বললেও চলবে।
একটা কথা খুবই সত্য যে, আমার এ পেশাটার সঙ্গে কঠিন কর্তব্য জড়িয়ে রয়েছে। তা হোক তো, আমার কাছে এটা কোনো সমস্যাই নয়। কেবলমাত্র আমার পদ্ধতি প্রীতির জন্যই ব্যাপারটা আমার কাছে নিছকই মামুলী।
এ পেশায় টাকাকড়িকে প্রাধান্য দিলে চলবে না। সর্বাধিক প্রাধান্য দেওয়া দরকার ঘড়ির কাটার সঙ্গে তাল মিলিয়ে কর্তব্য সম্পাদন করে যাওয়া। কেবলমাত্র সময় সম্বন্ধে সচেতনতাই নয়, নিষ্ঠার দিকেও যথেষ্ট গুরুত্ব দিতে হবে। আমি এসব দিকে সতর্ক দৃষ্টি রেখে চলেছি। আর সে সঙ্গে প্রতিটা কানাকড়ির হিসাবও রেখেছি। কোনো প্রতিভাধরকে যদি এসব দিকে কড়া নজর রেখে কারবার চালাতে হতো তবে নির্ঘাৎ ফেসে যেত ভায়া।
আমি যে দরজির কাজ হাতে নিয়েছিলাম, ব্যবসার মাধ্যমে সে দুহাতে পয়সা কামাতে পারে সত্য। কিন্তু পদ্ধতি যে কি জিনিস, তা সে কিছুমাত্রও বুঝতে পারেনি। আর আমি যে তা পুরোপুরি বুঝতে পেরেছিলাম, এতে কারো মনে এতটুকুও সন্দেহ থাকার কথা নয়। আর যদি তা না পারতাম তবে কি আর এত সহজে নিজেকে কাজের মধ্যে ডুবিয়ে দিতে পারতাম? অবশ্যই না।
কাটায় কাটায় নটায় দর্জির দোকানে হাজির হতাম। দু-চার কথার মাধ্যমে দর্জির সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় সেরেই সেদিনের সেলাই করার মতো জামা-কাপড় বুঝেনিতাম।
সেদিন কোন কোন পোশাক বিজ্ঞাপিত হবে তা দর্জি বার বার বলে আমার মগজে ভালোভাবে ঢুকিয়ে দিত। আর তার সঙ্গে সঙ্গতি রখে আমার উপ-মস্তিষ্ক নতুন-নতুন পদ্ধতি উদ্ভাবনে মেতে যেত। আমার উপ-মস্তিষ্ক বলতে বলের মতো গোলাকার। দেহযন্ত্রটা।
আমার মগজ মুহূর্তের জন্যও সুস্থির থাকত না। আরে ভাই, নতুন নতুন পদ্ধতি আমার মস্তিষ্কে পোকার মতো সর্বক্ষণ কিলবিল করত। আর সেই তো বিজ্ঞাপনের পদ্ধতি–এক-একটা পোশাক এক-একরকম রুচিশীল লোকের সামনে তুলে ধরার কৌশল, বুঝলে তো?
ফ্যাশানের রকমফের যে কতই না হতে পারে, তা নিয়ে সে মুহূর্তে আসার উপ মস্তিষ্কে যেন বিশাল এক কারখানা বসে যেত–আমার অর্থাৎ বলের মতো গোলাকার দেহযন্ত্রটাতে।
আমার উপ-মস্তিষ্ক–আর অর্থাৎ যাকে বলের মতো গোলাকার দেহযন্ত্র বলা হচ্ছে, সেখানে পুরো একটা ঘণ্টা ধরে পোশাকে নিত্য-নতুন ফ্যাশান উদ্ভাবনের চিন্তা ভাবনা চলত।
শহরের বিশে বিশেষ জায়গায় সৌখিন মানুষরা ঘুর ঘুর করে বেড়ায়। তারা নতুন নতুন ফ্যাশানের খোঁজে হন্যে হয়ে ছোঁক ছোঁক করে। বেলা দশটা বাজতে না বাজতেই আমি সে-সব জায়গায় হাজির হয়ে যেতাম। তা নইলে এমন কোনো জায়গায় চলে যেতাম যেখানে আমোদপ্রিয় মানুষদের জন্য হরেকরকম আমোদ প্রমোদের ব্যবস্থা রয়েছে।
আমি পথচারীদের গায়ে গা ঠেকিয়ে পথ চলতাম। তাদের নজরের বাইরে যেতাম না মুহূর্তের জন্যও কিছুতেই না।
তারা যেদিকেই নজর ফেরাক না কেন, চোখে পড়ত আমার মন ভোলানো রূপ, আমার পিঠে ঝুলিয়ে রাখা নজরকাড়া পোশাক পরিচ্ছদ।
একবার ভেবে দেখুন তো, আমার এ-কৌশল আর সৌখিন পথচারীদের চোখে চোখে থাকার জন্য অনন্য নিষ্ঠার কথাটা। আর বিবেচনা করুন, এ কারবারে যারা নিজেদের লিপ্ত করেছে, তাদের বুক হিংসায় জ্বালিয়ে পুড়িয়ে খাক করে দেওয়ার পক্ষে যথেষ্ট নয় কি? আবারও বলছি, এক্ষেত্রে আমি নিষ্ঠার কদরই সবচেয়ে বেশি দিয়েছি।
পোশাক-পরিচ্ছদ পিঠে ঝুলিয়ে সৌখিন লোকদের ভিড়ে বা আমোদ-প্রমোদের অঞ্চলে ঘোরাফেরা করতে করতে দুপুর পার হতো না। আমি দক্ষ শিকারির মতো একজন-না-একজন খদ্দের বাবাজীকে ছিপে গেঁথে দরজীর কারখানায় হাজির হয়ে যেতাম। মুহূর্তমাত্র দেরি না করে শিকারটাকে দর্জি বাবাজীর হাতে উৎসর্গ করে দিতাম।
ব্যস, চোখের পলকে সে জবাই হয়ে যেত। দাঁত বের করে হেসে আমার মুনিব বলত-দরকার-টরকার হলে আবার আসবেন ভাই। প্রতিষ্ঠানের কারখানার দরজা আপনার জন্য সর্বক্ষণ খোলাই থাকবে–সালাম!
আমি রীতিমত গর্তের সঙ্গে, বুকে টোকা খেয়ে দিনের পর দিন এ-কাজে লেগে রয়েছি। এমন নিঃসীম আনন্দ ছাড়া কাজ করা কখনও পোষায়, নাকি করা সম্ভব?
আমি গর্বের সঙ্গেই বলছি, এভাবে কত খদ্দের-লক্ষ্মীকে জবাই করেছি, তা আর গণাগাথা নেই। না, কথাটা ঠিক বলিনি। কবে, কতজন খদ্দেরের গলায় যে ছুরি চালিয়েছি, তা আমার নোট বইয়ের পাতায় প্রত্যেকের বিবরণাদি টুকে রেখেছি।
