আমার ভাগ্য-দেবতা যেন একেবারে ঘড়ি ধরে কাটায় কাটায় এসে হাজির হয়েছিলেন। তিনি কৃপাবলে আমাকে মহাসঙ্কট থেকে উদ্ধার করে দিয়েছিলেন বলেই আমি বেশি হয়ে পড়িনি।
জীবনী নাম দিয়ে অদ্ভুত বইয়ের পাতায় পাতায় যা-কিছু লেখা হয়, সবাই সে সব কথাকেই সত্য বলে ধরে নিয়ে বিচার করতে বসে।
তবুও আমার বাবার প্রকৃত বাসনাটার কথা মনে পড়লেই আমার মনটা দারুণ বিষিয়ে ওঠে। তবে সে ঘটনাটা খোলসা করেই বলছি–আমি তখন মাত্র বছর পনেরোর কিশোর। দিনের একটা বড় অংশ খেলাধুলা আনন্দ-ফুর্তি নিয়েই মেতে থাকতাম।
আমার বাবা হঠাৎ আমার ভবিষ্যৎ নিয়ে বড়ই ভাবিত হয়ে পড়লেন। এ বয়সেই কোনো একটা কাজকর্মে লাগিয়ে দিতে পারলে আমি ধীরে ধীরে অভিজ্ঞ হয়ে উঠতে পারব, এ চিন্তাটাই তার মাথায় চেপে বসল।
একদিন তিনি আমাকে সঙ্গে করে নিয়ে গিয়ে একটা কাজে লাগিয়ে দিতে চাইলেন–সম্মানজনক পেশা। লোহা কেনাবেচার পেশা। এক জায়গা থেকে পাইকারি দরে লোহা-লক্কর খরিদ করে খুচরা বিক্রি করা। এতে কশিমন ভালোই পাওয়া যাবে।
ব্যাপারটা মোটামুটি এরকম–আমার বাবা আমাকে একদিকে লোহার ব্যবসায়ী আর অন্যদিকে কমিশন এজেন্ট দু-দুটো পেশায় নিযুক্ত করবেন–তার ইচ্ছা ছিল। তার বিশ্বাস এটাই নাকি সম্মানজনক উঁচু জাতের কারবার।
আরে ধ্যুৎ! উঁচু জাতের কারবার না ঘোড়ার ডিম! এ ভুলের মাশুল তাকে তিন দিনের মধ্যেই দিতে হলো।
কারবার চলাতে গিয়ে তৃতীয় দিনে আমি প্রবল জ্বর নিয়ে বাড়ি ফিরলাম। বাবা আমার গায়ে হাত দিয়েই রীতিমত আঁতকে উঠে বললেন–আরে সর্বনাশ! গা দিয়ে যে আগুন বেরোচ্ছে।
আমার পদ্ধতি দেহযন্ত্রটা এমন একটা অত্যাচার বরদাস্ত করতে পারেনি। মারাত্মক বিপজ্জনক পরিস্থিতি আর ব্যথা-বেদনার চোখে আমার কাতড়ানি দেখে আমার বাবা তো দারুণ ঘাবড়ে গেলেন। আর আমার গর্ভধারিণীও কম মুষড়ে পড়লেন না।
আমি বিছানায় আশ্রয় নিলাম। চৌকি থেকে নামার ক্ষমতাও এক সময় আমার শরীরে থাকল না। পুরো দেড় মাস ধরে আমাকে যমরাজের সঙ্গে লড়াই করে টিকে থাকতে হলো। সরু একটা সুতোয় আমার প্রাণটা কোনোরকমে ঝুলে রইল।
চিকিৎসক গোড়া থেকেই তার অধীতবিদ্যা আর অভিজ্ঞতা নিঃশেষে উজার করে যমরাজের সঙ্গে পাঞ্জা লড়ে আমাকে টিকিয়ে রাখার জন্য প্রাণবন্ত প্রয়াস চালাতে লাগলেন। কিন্তু কিছুতেই কিছু হবার নয় ভেবে শেষমেশ হাল ছেড়ে চলে গেলেন।
এবার বিনা চিকিৎসাই আমাকে নিতান্ত সাহসের ভর করে মরিয়া হয়ে যমরাজের চেলাচামুণ্ডাদের সঙ্গে লড়াই করে টিকে থাকার জন্য চেষ্টা চালাতেই হলো।
হ্যাঁ, কাজ হলো। আমারই জয় হলো। রোগে ভূগে ভুগে কাঠির মতো হয়ে গেলেও আমি শেষমেশ যমরাজকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে রোগ-শয্যা ছেড়ে উঠে পড়লাম। আমার ব্যাধি নিরাময় হয়ে গেল।
তবে সর্বনাশ যা হল–আমার মাথায় বলের মতো গোল আব বা গোল শিং অপেক্ষাকৃত চকচকে হয়ে উঠেছিল। ভাগ্য দেবতার নির্দেশ তাঁর মধ্যে প্রোজ্জ্বলতর হয়ে উঠেছিল।
যা-ই হোক, স্বাস্থ্য গেলেও ভাগ্যগুণে সম্মানজনক লোহার ব্যবসায়ী হওয়ার অপূর্ব ফাঁদ থেকে কোনোরকমে পিছলে গিয়ে অব্যাহতি পেয়ে গিয়েছিলাম।
রোগ নিরাময়ের মাঝপথেই আমি কৃতজ্ঞতাবশত দয়াবতী যে নার্সের কথা বারবার অন্তরের অন্তঃস্থলে ভেসে উঠছিল, যার অপরিসীম করুণায় আমার মাথায় বলের মতো ভাবটা দেখা দিয়েছে–আজও বহাল তবিয়তে যথাস্থানে জ্বলজ্বল করছে। আর তারই দূরদর্শিতায়ই তো শেষপর্যন্ত লোহার ব্যবসায়ী আর মোটা টাকাকড়ি কমিশন খাওয়ার ব্যাপারটা আমার ঘাড় থেকে নেমে গেল। নইলে আমার বরাতে যে কি ছিল, তা তো আমি বুঝতেই পারছি।
দেশের অধিকাংশ ছেলে দশ কি বারো বছরে পড়লেই বাপের আশ্রয় ছেড়ে টুক করে কেটে পড়ে। ব্যস, তারপর নিজের ভাগ্য নিজেই তৈরি করে নেয়। বাবার খবরদারির আর ধার ধারে না।
আর আমি? আমি কিন্তু লক্ষ্মী ছেলের মতো, বাবা-মায়ের একান্ত অনুগত সন্তান সেজে ষোল বছর বয়স পর্যন্ত অপেক্ষা করেছিলাম, জন্মভিটার মাটি কামড়ে পড়েছিলাম।
কেবলমাত্র ষোলটা বছরই নয়, আর কয়েকটা বছর হয়তো বাবার ছাতার ছায়াই রয়ে যেতাম। কিন্তু আমার গর্ভধারিণীর আচরণ আমার চোখ-কান খুলে দিয়েছিল। তার পৈশাচিক পরিকল্পনার কথা আমি দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে আড়ি পেতে শুনেছিলাম–আমার ভবিষ্যৎ নিয়ে জল্পনা-কল্পনা করছেন।
আমার মা খোলাখুলিভাবেই বাবাকে যা বললেন, তাতে করে আমি এটুকুই বুঝলাম, আমাকে আমার মনের মতো কাজে লাগিয়েই বাড়ি থেকেনির্বাসিত করতে উঠেপড়ে লেগেছেন। তার পরিকল্পনাটা হচ্ছে, আমি একটা মুদিখানা খুলে টাকাকড়ি রোজকারের ধান্ধা করি। এতে নাকি দুহাতে মুনাফা পাওয়া যায়।
মুদিখানা! আমি মুদির দোকান খুলে বসব। এটাই আমার পছন্দমাফিক পেশা! শেষপর্যন্ত এমন একটা পেশার মধ্য দিয়ে আমাকে সারাটা জীবন কাটিয়ে দিতে হবে।
ধ্যুৎ! মুদিখানার নিকুচি করেছি। মনে মনে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলাম, বাপের অন্ন অনেক খেয়েছি, আর নয়। এবার মানে মানে কেটে না পড়লে কেলেঙ্কারীর চূড়ান্ত হয়ে যাবে।
বাতিকগ্রস্ত বুড়ো বাবা-মায়ের কাছ থেকে দূরে সরে যাই। তারা তাদের চিন্তা ভাবনা নিয়ে নিজেদের খেয়াল-খুশিমাফিক জীবন কাটাক, আর আমি নিজের পথ দেখে নিচ্ছি। বাবা-মা আমাকে প্রতিভাধর করে তোলার যে স্বপ্ন দেখেছেন, এখানেই তার ইতি হোক।
