উপযুক্ত পদ্ধতি বৃদ্ধি খরচ করে বেছে নেওয়ার ক্ষমতা আমার আছে বলেই না। আমার পক্ষে ব্যবসায় সাফল্য লাভ করা সম্ভব হয়েছে। আর এরই ফলে আমি ব্যবসায়ী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করকে সক্ষম হয়েছি। কিন্তু যদি পদ্ধতি সঠিক না হত তবে কি আর আমার পক্ষে নিজেকে সমাজের বুকে প্রতিষ্ঠিত করা সম্ভব হত? আমি বলব অবশ্যই নয়।
আমি কিন্তু একটা জিনিসকে অন্তর থেকে ঘৃণা করি। কোনোদিন, কোনো পরিস্থিতিতেই তাকে বরখাস্ত করতে পারি না। সেটা কি, তাই না? সেটা হচ্ছে ধীশক্তি, যাকে সবাই প্রতিভা আখ্যা দিয়ে থাকে তার কথা বলতে চাচ্ছি। যাকে প্রতিভাধর আখ্যা দেওয়া হয় তারা কিন্তু প্রত্যেকেই এক-একটা সাত জন্মেও নির্ভেজাল আহাম্মক–নিরেট গাধা ছাড়া কিছু নয়। সে যত বড় প্রতিভাধর, সে তত বড় গাধা। এ-নিয়মের এতটুকু হেরফের হবার উপায় নেই–মোটেই না। যত্তসব আহাম্মকের দল! আহাম্মক ছাড়া তো আর কারো পক্ষে প্রতিভার অধিকারী হওয়া সম্ভব নয়। প্রতিভার প্রকাশ যত ঘটবে, আহাম্মকিও ততই প্রকট হয়ে পড়বে।
একটা মোদ্দাকথা কখনই ভুললে চলবে না, প্রতিভাধরকে যতই রগড়ারগড়ি করা যাক না কেন, তার ভেতর থেকে কিছুতেই ব্যবসায়ী বুদ্ধি বেরোবে না, সে ঝানু। ব্যবসায়ী কিছুতেই হতে পারবে না।
আশা করি এ-কথা খোলসা করে বলার দরকার হবে না, কোনো ইহুদিকে রগড়ারগড়ি করা যাক না কেন তার কাছ থেকে একটা ঘেঁদা পয়সাও যেমন বেরোবে না, ঠিক সেরকমই প্রতিভা ধরের মত নিংড়ালেও তার ভেতর থেকে ব্যবসায়ী মতলব তিলমাত্রও বেরোবে না।
একটা কথা মনে রাখবেন, প্রতিবাদকারীরা খুবই সম্ভাবনাময় সুযোগ হাতের নাগালের মধ্যে পেলেও সে কিন্তু সে সবের কাছেও ঘেঁষবে না, বরং প্রায় গা ঘেঁষে সুরুৎ করে চলে যাবে। আর তা যদি না করে, এমন হাস্যকর কাজ করে বসবে যাতে হাসতে হাসতে দম বন্ধ হয়ে যাবার যোগাড় হবে। তা যদি নাও করে তবে এমন কাজ করে বসবে যা একেবারেই অসঙ্গত অর্থাৎ যা করা উচিত ছিল। তার ঠিক বিপরীত কাজ করে ফেলে যাতে হাতে পাওয়া অপূর্ব সুযোগটা একেবারে মাঠে মারা যায়। কারবার বলতে যা-কিছু বোঝায় তার তিলমাত্রও অবশিষ্ট থাকে না। অতএব আশা করি কোনো প্রতিভাবধর হঠাৎ করে কারবার ফেঁদে বসলে পরিণামে কি ঘটতে পারে তার আর কোনো ব্যাখ্যা দেওয়ার দরকার নেই।
এত কথার মধ্য দিয়ে আমি যে কথা বলতে চাচ্ছি তা হল–কোনো প্রতিভাধর হঠাৎ কারবারে নামলে পরিণতি কি হতে পারে। আর এরকম ব্যক্তিদের চোখের সামনে দেখলেই অনায়াসে তাকে চিনতে পারা যাবেই যাবে। সে প্রতিভার কেরামতি দেখাতে গিয়ে যে সব অপকর্ম করে বসছে, একেবারে নাজেহালের চূড়ান্ত হচ্ছে–সে কাজের গতি প্রকৃতি অনুযায়ী তার একটা জুতসই নামও দিয়ে ফেলতে পারেন।
তার কাজকর্মের প্রকৃতি, ধরন-ধারণ দেখলেই আপনি অনায়াসেই বুঝে নিতে পারবেন।
মনে করুন, একজন কোনোকিছু কেনাবেচা করে হঠাৎ সাধারণ অবস্থা থেকে একেবারে একজন ধনকুবের বনে গেছে। তা নইলে বিরাট কারখানা গড়ে সারাদিন বিভিন্নরকম দ্রব্য সামগ্রী বানাচ্ছে, অথবা তামাক বা তুলা কারবার কেঁদে কেনাবেচায় মেতেছে, তা নইলে এরকমই অন্য কোনো কারবারে মেতেছে, নতুন চিকিৎসাবিদ্যা; আইন ব্যবসা বা কর্মকার হবার জন্য ঘুর ঘুর করছে; আর তা যদি নাও করে তবে সাবান তৈরি বা এরকমই কিছু একটা তৈরি করে চলেছে–অর্থাৎ স্বাভাবিক কাজকর্ম বহির্ভূত যা-ই হোক, কিছু একটা করতে দেখলেই তাকে প্রতিভাধর আখ্যা দিয়ে দেবেন। ব্যস, আর দেরি না করে তৃতীয় সূত্র অনুসারে তাকে মানুষ বলে গণ্য করলেও আহাম্মক ছাড়া আর কিছু বলা যাবে না। তা না করে গাধা নামকরণ করলেই কিন্তু উপযুক্ত কাজ করা হবে, যাকে বলে একেবারে জুতসই কাজ।
যাক গে, আর ওসব কথা না-ইবা বাড়ালাম। তার চেয়ে বরং আমার প্রসঙ্গেই কিছু বলছি, কেমন?
বিশ্বাস করুন, আমি কোনোদিনই প্রতিভাধর ছিলাম না। সত্যি কথা বলতে কি, আমার মধ্যে প্রতিভার নাম-গন্ধও কোনোদিন ছিল না, আজও নেই। একজন সত্যিকারেরনিখাদ ব্যবসায়ী বলতে যা বোঝায় আমি অবিকল তাই।
হ্যাঁ, আমি একজন খাঁটি ব্যবসায়ী।
আমি যে একজন মনে-প্রাণে খাঁটি ব্যবসায়ী তার প্রত্যক্ষ প্রমাণ পেয়ে যাবেন আমার প্রাত্যহিক হিসাব-নিকাষের খাতাপত্র যাকে আয়-ব্যয়ের খাতা বলা হয়, আর আমার দিনলিপির পাতায় চোখ বুলালে। আমার কাজ একেবারে ছিমছাম পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। আমার নিজের ঢাক নিজেই পিটাচ্ছি। এছাড়া অন্য কোনো পথও তো দেখছি না।
আমার নিয়মানুবর্তিতা সম্বন্ধে জ্ঞান প্রখর, যাকে বলে একেবারে টনটনে। আর কাজের সময় জ্ঞানের তো তুলনাই হয় না। কোনো কাজ করতে নামলে একটা সেকেন্ডেরও হেরফের কখনও হয় না। আমার কাজের গতি দেখে ঘড়ির কাটারও বুঝি লজ্জায় মাথা হেট হয়ে যায়। অতএব সময় জ্ঞান যে আমার খুবই টনটনে, এ ব্যাপারে আর কোনো যুক্তির অবতারণা করার দরকার আছে বলে মনে করছি না।
কারবার চালানো তো আর যে-সে কর্ম নয়, দশজনের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করতেই হয়। অর্থাৎ একাধিক ব্যক্তির পারস্পারিক সাহায্য সহযোগিতায়ই কারবারকে রমরমা করে তোলে। আবার আশপাশের মানুষগুলোর অভ্যাসও তো ভিন্নতর। ফলে আমাকে তাদের অভ্যাসের সঙ্গে খাপ খাইয়ে চলতে হয় বলে নিজের মানসিকতাকেও ঠিক সেভাবেই তৈরি করে নিতে হয়েছে। এ ব্যাপারে আমি আমার গর্ভধারিণী আর জন্মদাতা পিতার কাছে শতকরা একশো ভাগই ঋণী, অকপটে স্বীকার করে নিচ্ছি। আমার অন্তহীন দুর্বলমনা মা ও বাবার কথা যদি এখানে উল্লেখ না করতাম তবে চরমতম অকৃতজ্ঞতার দায়ে নিজেকে বড়ই অপরাধী জ্ঞান করতে হত। কারণ নিয়তি আর তাদের উদার মানসিকতা সহায় না থাকলে আমার পরিণতি যে কি হত তা ভাবলে আমার মাথা আজও রীতিমত ঝিমঝিম করে। একটিবার গভীরভাবে ভাবুন তো, তারা আমাকে একজন প্রতিভাবান না বা নিয়ে ছাড়তেন কি? ব্যস, আমার দফা একেবারে রফা হয়ে যেত।
