আমরা সমুদ্রের বুকে মাছ ধরতে কতবার যে কত রকম প্রতিকূল পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছি, তা বলে শেষ করা যাবে না। অর্থাৎ সে সব বিপদের বিশভাগের এক ভাগ সমস্যার কথাও তোমার কাছে বলা সম্ভব হবে না।
শোন, এবার যে ঘটনাটার কথা তোমার কাছে বলব, সেটা তিন বছর আগে ঘটেছিল।
১৮ খ্রিস্টাব্দের কথা।
পৃথিবীর এ অংশের মানুষ কোনোদিনই সে তারিখটার কথা শত চেষ্টা করেও মন থেকে মুছে ফেলতে পারবে না।
কেন? কারণ কি? কারণ, সে বিশেষ তারিখটাতেই ভয়ঙ্কর এক ঘূর্ণিঝড় আকাশের বুক থেকে পৃথিবীতে নেমে এসেছিল। অথচ কেবলমাত্র সারা সকালই নয়, সকাল থেকে বিকেলের শেষমুহূর্ত পর্যন্ত মৃদুমন্দ বাতাস প্রবাহিত হয়েছিল। মাথার ওপর সূর্যদেব অত্যুজ্জ্বল রূপ নিয়ে বিরাজ করছিল। ফলে স্বাভাবিক কারণেই আমাদের মধ্যে সে প্রবীন ও অভিজ্ঞতম নাবিকটা পর্যন্ত ঘৃণাক্ষরেও বুঝতে পারেনি অচিরেই কি ঘটবে। এমন অভাবনীয় পরিবেশে যে হঠাৎ মহাপ্রলয় নেমে আসবে, তা তো কারো বোঝার কথাও নয়।
আমরা তিনভাই, অর্থাৎ আমি আর দুভাই বেলা দুটোর কাছাকাছি স্কুনার নিয়ে সমুদ্র পাড়ি দিয়ে দ্বীপগুলোর নিকটবর্তী অঞ্চলে হাজির হলাম। তারপর ক্রমে এক একটা দ্বীপের কাছাকাছি গিয়ে জাল ফেলতে আরম্ভ করলাম। কিছুক্ষণের মধ্যেই মাছ। দিয়ে জাহাজটা বোঝাই করে ফেলতে পারলাম।
আমরা নিজেদের মধ্যে বলাবলি করতে লাগলাম, এত অল্প সময়ে এত মাছ আমরা এর আগে কোনোদিনই ধরতে পারিনি। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলাম, ঠিক সাতটা বাজে। আমরা আনন্দে ডগমগ হয়ে নোঙর তুলে মাছ-ভর্তি জাহাজ নিয়ে বাড়ির দিকে যাত্রা করলাম। আমরা তড়িঘড়ি যাত্রা করলাম এ জন্য যে, আমরা যাতে আটটার কাছাকাছি সময়ে পানি যখন শান্ত-স্বাভাবিক থাকবে, তার মধ্যেই স্ট্রামের খারাপ অঞ্চলটা অতিক্রম করে ফেলতে পারি। আমাদের জাহাজটা উল্কার বেগে ধেয়ে চলল নির্দিষ্ট লক্ষ্যের দিকে।
নতুন করে হালকা হাওয়া বইতে শুরু করলেই আমরা আবার নোঙর তুললাম।
আমাদের জাহাজটা ঢেউয়ের তালে তালে দোল খেতে খেতে ধীর-মন্থর গতিতে এগিয়ে চলেছে তো চলেছেই। বিপদের কোনোরকম আশঙ্কা আছে এমন কথা ঘুণাক্ষরেও আমার মনে আসেনি। কারণ সে-রকম কোনো সম্ভাবনা তিলমাত্রও নজরে পড়েনি।
আমরা সামান্য এগিয়ে যেতেই একেবারেই অকস্মাৎ হেলমেগনের ওপর দিয়ে একটা দমকা বাতাস বয়ে গেল। আমরা ব্যাপারটা লক্ষ্য করেই রীতিমত ঘাবড়ে গেলাম।
ব্যাপারটা বাস্তবিকই খুব অস্বাভাবিক তো বটেই, অভাবনীয়ও। অতীতে কোনোদিনই এমন কাণ্ড ঘটতে দেখিনি।
আমি যেন কিছু একটা নিদারুণ অস্বস্তি বোধ করতে লাগলাম। নিরবচ্ছিন্ন অস্থিরতার মধ্য দিয়ে আমি প্রতিটা মুহূর্ত কাটাতে লাগলাম। পরিস্থিতি প্রতিকূল বুঝতে পেরে জাহাজটাকে বাতাসের অনুকূলে রেখে আমরা অগ্রগতি অব্যাহত রাখলাম।
না। বেশিদূর এগিয়ে যাওয়া সম্ভব হলো না। কারণ, ঘূর্ণি চক্করগুলোই আমাদের অগ্রসর হওয়ার ব্যাপারে প্রতিবন্ধকতা করতে লাগল।
অনন্যোপায় হয়ে আমি ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নিলাম।
কিন্তু মুহূর্তের জন্য পিছনের দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে দৃষ্টিপাত করতেই অদ্ভুত প্রকৃতির একটা মেঘের দিকে আমার নজর গেল। তার রং তামাটে।
চোখের পলকে মেঘের টুকরোটা দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পড়তে একেবারে দিগন্ত রেখা অবধি ঢেকে ফেলল। পরিস্থিতি যে কী ভয়ঙ্কর রূপ নিল, তা বুঝিয়ে বলা সম্ভব নয়। পরিস্থিতির দ্রুত পরিবর্তন ঘটতে লাগল। যে বাতাসের কাঁধে ভর দিয়ে আমরা সামনের দিকে গতি অব্যাহত রেখেছিলাম তা একেবারে পড়ে গেল। যেটুকু আশা ছিল তাও আমাদের মন থেকে মুছে গেল।
উপায়ান্তর না দেখে আমরা জাহাজ থামিয়ে এদিক-ওদিক অনবরত চক্কর খেতে লাগলাম। এ পরিস্থিতিতে কি করা যেতে পারে তা-ও ভেবে পেলাম না। বেশি। ভাববার অবসরই বা কোথায়।
এক মিনিট, মাত্র একটা মিনিট যেতে-না-যেতেই ঝড়টা প্রলয়ঙ্কর রূপ নিয়ে, রীতিমত ফুঁসতে ফুঁসতে আমাদের জাহাজটার ওপর আছড়ে পড়ল। আর দু মিনিটের মধ্যেই ঘন কালো যমদূতাকৃতি মেঘটা পুরো আকাশটা ছেয়ে ফেলল।
চোখের পলকে চারদিক এমন অন্ধকারে ঢেকে গেল যে, জাহাজের ভেতরে অবস্থানরত আমরা একে-অন্যকে দেখতে পাওয়া তো দূরের ব্যাপার, এমনকি নিজের হাতটাকে পর্যন্ত দেখা যাচ্ছিল না। কী যে দুর্বিষহ পরিস্থিতির মধ্যে পড়লাম তা আর বলার নয়। এর পর পরই যে বিধ্বংসী ঘূর্ণিঝড় শুরু হয়ে গেল, তার বর্ণনা দেওয়া বাস্তবিকই সাধ্যাতীত, চেষ্টা করাও বোকামি ছাড়া কিছু নয়।
আমাদের জাহাজের নরওয়ের অভিজ্ঞ ও প্রবীনতম নাবিকটার এমন প্রলয়ঙ্কর ঝড়ে অভিজ্ঞতা নেই।
আকস্মিক ঝড়ের প্রথম ধাক্কাতেই মাস্তুলগুলো এমন হুড়মুড় করে ভেঙে পড়ল যে, হঠাৎ করে দেখলে যে কেউই বলবে, করাত দিয়ে যত্ন করে কেটে ফেলা হয়েছে।
তখনও বড় মাস্তুলটা অক্ষত রয়েছে। আমার ছোট ভাই সেটাকে রক্ষা করার জন্য হন্তদন্ত হয়ে ছুটে গিয়েছিল। কিন্তু সেটাকে রক্ষা করা তো দূরের ব্যাপার তাকে সঙ্গে নিয়ে পানিতে আছড়ে পড়ল। ব্যস, চোখের পলক পড়তে না পড়তে মাস্তুলটার সঙ্গে সে-ও ঘূর্ণাবর্তের মধ্যে পড়ে তলিয়ে গেল।
আমি ছোট ভাইকে তো চোখের সামনেই হারালাম। সে নির্মমভাবে পানিতে ডুবে, শ্বাসরুদ্ধ হয়ে মারা গেল।
