শেষ শব্দটা উচ্চারণ করেই অন্ধকারের রাজা আগন্তুক শয়তানটা বাতাসে গোত্তা মেরে কি করে যে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল, দার্শনিক বন-বন কিছুই বুঝে উঠতে পারলেন না। কুকুরটা অনবরত অসভ্যের মতো ঘেউ ঘেউ আওয়াজ করে চলেছে। আওয়াজটাকে মুহূর্তে মেনে নিতে না পেরে অস্থিরভাবে প্রচণ্ড জোরে তার গায়ে একটা লাথি হাঁকিয়ে দিলেন।
আর আগন্তুক শয়তানটাকে লক্ষ্য করে চরম আক্রাশে দুম করে আস্ত একটা বোতল ছুঁড়ে দিলেন।
কিন্তু হায়! বোলতটা বাতাসের কাঁধে ভর দিয়ে উড়তে উড়তে ঝুলন্ত বাতিটার শেঁকলটায় গিয়ে আঘাত হানল। সরু-দুর্বল শিকলটা বোতলটার আঘাত সইতে না পেরে দুম্ করে ছিঁড়ে গেল ব্যস, আর যাবে কোথায়, বাতিটা আছাড় খেয়ে পড়ল দার্শনিক বন-বনের একেবারে ব্রহ্মতালুতে।
মহাদার্শনিক বিকট আর্তনাদ করে মেঝেতে লুটিয়ে পড়লেন।
বিজনেসম্যান
আমি একজন ব্যবসায়ী। কারবারের মাধ্যমেই আমি জীবিকা নির্বাহ করি। আমি ঊ্যবসায়ী বটে, কিন্তু পদ্ধতি নিষ্ঠার সঙ্গে অনুসরণ করে থাকি। পদ্ধতিই আমার কাছে পরম ধর্ম বিবেচিত হয়। পদ্ধতির পরম ভক্ত আমি। পদ্ধতিকেই আমি সবচেয়ে বড় কর্ম জ্ঞান করি। পদ্ধতির বাইরে আমি একটা কুটোও এদিক থেকে ওদিকে নেই না। পদ্ধতিই আমার কাছে পাথেয় বিবেচিত হয়।
পদ্ধতিই আমার ধ্যান-জ্ঞান-সাধনা। পদ্ধতি ছাড়া আমি নিজে একটা শূন্য ছাড়া কিছুই নই। পদ্ধতিকে আমি পরম গুরু জ্ঞান করে জীবনে চলার পথে প্রতিটা পদক্ষেপ ফেলি।
সত্যি কথা কি জানেন, আসল ব্যাপার তো পদ্ধতিটাই, আর যা-কিছু সবই শূন্য।
কারবারের আত্মাই তো পদ্ধতি। কিন্তু পৃথিবীতে এমন বহু ব্যক্তি রয়েছে যাদের আমি মনে-প্রাণে ঘৃণা করি। কিছুতেই বরদাস্ত করতে পারি না।
আপনারা, যারা একেবারে একটি মূর্খ আর একটু-আধটু বাতিকগ্রস্ত তারা এ শ্রেণির মানুষদের দুচোখে দেখতে পারেন না, ঘৃণায় তাদের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিন সত্য, কিন্তু আমি তাদের চেয়ে অনেক, অনেক বেশি ঘৃণার চোখে দেখি, ভুলেও তাদের দিকে চোখ তুলে তাকাই না।
আমি কেন তাদের অন্তর থেকে ঘৃণা করি বলতে পারেন? এ হতচ্ছাড়াগুলো পদ্ধতি অবলম্বন করে চলা তো দুরের ব্যাপার, যথাযোগ্য সমাদর কি করে করতে হয়, তাও তাদের জানা নেই। তারা নিজেদের জ্ঞান-বুদ্ধি অনুযায়ী পদ্ধতি অবলম্বন করে কাজকর্ম সম্পন্ন করে বটে, কিন্তু পদ্ধতির প্রকৃত অর্থ কি, সেটা সম্বন্ধে উপযুক্ত জ্ঞানগম্য তাদের ঘটে না। তারা অক্ষরে অক্ষরে পদ্ধতি মেনে কাজকর্ম করে, কিন্তু ভাবগতভাবে মানে জানে না।
আরও পরিষ্কারভাবে বললে–পদ্ধতির অক্ষরবোধ তাদের আছে সত্য, কিন্তু পদ্ধতির উদ্দেশ্য সম্বন্ধে কিছুমাত্র ধ্যান-ধারণা তাদের ঘটে নেই।
ইতর প্রাণি,নিচু শ্রেণির প্রাণিরা খুবই অগতানুগতিক কাজ করে থাকে বলেও কিনা পদ্ধতিটা নিতান্তই গতানুগতিক, পুরোপুরি ধরাবাধা ছকের মধ্যে সীমাবদ্ধ।
এসব আহাম্মকদের সঙ্গে আমার তফাৎ তো এ ব্যাপারেই। ধরাবাঁধা ছক। ছক বলে পদ্ধতির অভিধানে কোনোকিছুর অস্তিত্ব আছে নাকি?
সত্যি কথা বলতে কি, মুনাফা লুটতে হলে যে পথ অবলম্বন করা দরকার, সেটাই তো সে মুনাফা লাভের পদ্ধতি বিবেচিত হয়।
আমার মনের কথা কে বুঝবে, কাকেই বা বোঝাব? আরে, আলেয়া ভূত কি কোনোদিন বাঁধাঁধারা পদ্ধতি মেনে কি জ্বলে আর নেভে? এ-কি কখনও সম্ভব? আহাম্মকের দল!
বর্তমানে আমি যে পুরো ব্যাপারটা সম্বন্ধে পরিষ্কার একটা ধারণা করতে পেরেছি, তা কিন্তু কিছুতেই এতটা পরিষ্কার হতো না, যদি খুব ছোটবেলায় একটা উদ্ভট দুর্ঘটনার শিকার আমি না হতাম।
এক দয়াশীলা আইরিশ নার্স, শেষ ইচ্ছাপত্রে আমি তার নাম লিখে রেখে যাব এরকম দৃঢ় সিদ্ধান্ত আমি নিয়ে রেখেছি–একদিন আমার গোড়ালিটা ধরে শূন্যে তুলে নিয়েছিল, দু-তিনবার শূন্যে দুলিয়ে চোখ দুটোতে দুটো থাপ্পর কষিয়ে দিয়ে ঘাটের বাজুতে ঝোলানো একটা খড়ের লম্বা টুপির ভেতরে মাথাটাকে চেপে ঢুকিয়ে দিয়েছিল। যতখানি চিৎকার চ্যাঁচামেচি করলে কাজ চলে যেতে পারে আমি তখন তার চেয়ে অনেক, অনেক জোরে চেঁচিয়েছিলাম।
ব্যস, এটুকুই–এ একটা ঘটনার মধ্য দিয়েই আমার ভাগ্যের লিখন খতম হয়ে গেল। আমার ভাগ্য নির্দিষ্ট হয়ে গেল।
ভাগ্য সুপ্রসন্ন হওয়ার লক্ষণস্বরূপ এ দুর্ঘটনার ফলেই সে মুহূর্তেই একটা প্রকাশ পেয়ে গেল। ইয়া বড় একটা আব আর সেটা আমার কপাল আর চাদির মধ্যবর্তী অঞ্চল জুড়ে বিরাজ করতে লাগল। একেবারে স্পষ্ট, জ্বলজ্বল করতে লাগল সে বস্তুটা।
সত্যি কথা বলতে কি, এমন সুগঠিত, এমন সুচারু পদ্ধতি অনুযায়ী দেহযন্ত্র কোনোদিন কারোই এর আগে চোখে পড়েনি। কারো সৌভাগ্যও এভাবে রচিত হয়নি। আরনিটোল জ্বলজ্বলে আর…।
সে সময় থেকেই পদ্ধতি যেন আমার জীবনের রক্তের সঙ্গে মিলেমিশে একাকার হয়ে গেল। পদ্ধতি ছাড়া আমি যেন এক পা-ও এগোতে পারি না। পদ্ধতি ছাড়া আমার জীবন–আমার সর্বস্ব অচল।
পদ্ধতির আকাঙ্খায় আমি স্থির হয়ে পড়তে লাগলাম। পদ্ধতি ছাড়া আমি যেন দুর্বিষহ যন্ত্রণায় কাতড়ে মরি।
আমি রীতিমত পদ্ধতি পাগল হয়ে পড়লাম। পছন্দমাফিক কোনো পদ্ধতি পেলেই আমি তাকে খপ করে আঁকড়ে ধরি। সব কারবারের যা মূলমন্ত্র –সে সঠিক পদ্ধতির কথাই বলতে চাচ্ছি।
