বন-বন আগের মতোই নীরবে তাকিয়ে রইলেন।
আগন্তুক বেশ কড়া স্বরেই বলে উঠল–দ্যুৎ! ভাই ওসব কোনটাই ঠিক নয়। যত্তসব বস্তাপচা ঘ্যান ঘ্যানানি!
দার্শনিক মহাপ্রভু বন-বন এবার আর উঁত করতে পারলেন না। হেরে গিয়ে আবার স্বগতোক্তি করলেন–যাক, যা হবার নয় তাই হয়ে গেল! এবার তবে চেম্বারলেনের তৃতীয় বোতলটা খোলা যাক। নেতিয়ে পড়া মনকে চাঙা করতে হলে মদই একমাত্র ভরসা।
ঢক ঢক করে মদ গিলে দার্শনিক প্রবর এবার ঘোলাটে চোখে আগন্তুক শয়তানের দিকে তাকিয়ে বললেন, আত্মার ব্যাখ্যা দুটাকে তুমি যদি আমল না-ই দাও তবে আত্মা বলতে তুমি কি বলতে চাইছ, বল?
আরে ভাই আত্মার স্বরূপ ব্যাখ্যা করে কারো মধ্যে ধারণা জন্মানো কি এতই সহজ? চোখে বহু, বহু দুরাত্মাই তো দেখলাম।
কথা বলতে বলতে সে বুক পকেটের বইটার ওপর বার কয়েক হাত বুলিয়ে নিল। ঠিক সে মুহূর্তেই প্রবল হাঁচির উদ্রেক ঘটল। কোনোরকমে দম আটকে গিয়ে পরিস্থিতিটাকে সামাল দিয়ে নিল।
হাঁচিটাকে ঠেকিয়ে রাখার মতলবেই সে অতীতের বড় বড় দার্শনিক নাম এক নাগাড়ে বলে যেতে লাগল। কেবলমাত্র নামই নয়, তাদের কাণ্ডকারখানার কথাও একই। সঙ্গে বলে চলল। দার্শনিক বন-বন আগন্তুকের কথার জোয়ারে ভাসতে থাকলেও মদের গ্লাস কিন্তু হাত থেকে নামালেন না। বোতল থেকে গ্লাসে বার বার মদ ঢেলে অনবরত গলায় ঢালতে লাগলেন। একটু পরপরই নতুন বোতল আলমারি থেকে। নামাতে লাগলেন।
অন্ধকারের বাসিন্দা আগন্তুকও সমান তালেই মদ গিলে চলল। মদের নেশা তাকে জেঁকে ধরে কিছুক্ষণের মধ্যেই। আর সে সঙ্গে একটু পর পর প্রবল হচির ব্যাপারটাও অব্যাহতই রইল।
দার্শনিক বন-বন তাকে এমন অদ্ভুত হাঁচির কারণ জিজ্ঞাসা করলে আগন্তুক শয়তানটা স্বাভাবিক কণ্ঠেই জবাব দিল। আরে ভাই, আর বলবেন না, স্যাঁতাতে জায়গায় থাকার জন্যই আমার ঠাণ্ডা লেগে এমন হাঁচি রোগ সৃষ্টি হয়েছে।
স্যাঁতস্যাঁত জায়গা? ব্যাপারটা ঠিক মাথায় গেল না তো! দার্শনিক ভ্রূ কুঁচকে কথাটা ছুঁড়ে দিলেন।
বুঝছেন না ভাই, মড়া ঘেঁটে ঘেঁটে আত্মাদের টেনে আনা তো আর কম কষ্টের ব্যাপার নয়!
মড়া। আত্মা! আত্মা-টাত্মা আবার কোত্থেকে এলো, বুঝছি না তো!
কোত্থেকে আসে সেটা বড় কথা নয়। আত্মার প্রকৃতি কেমন সেটা আগে শুনুন।
দার্শনিক বন-বন আর কথা না বাড়িয়ে আগন্তুক শয়তানের মুখ থেকে তার পরবর্তী বক্তব্য শোনার জন্য অধীর প্রতীক্ষায় রইলেন।
আগন্তুক শয়তানটা পূর্ব প্রসঙ্গের জের টেনে বলল–যে কথা বলছিলাম, আত্মা জিনিসটা কিন্তু প্রকৃতই খাসা। অভাবনীয়! অপূর্ব! আত্মাকে মূলত ছায়া ছায়া একটা পদার্থ মনে করা যেতে পারে।
একটা কথা তো আর কারো অজানা নয় যে, পৃথিবীতে বেঁচে থাকা কালেই তো কতজন শয়তানের কাছে আত্মা বাধা রাখে।
দার্শনিক চোখের তারায় বিস্ময় ও অবিশ্বাসের ছাপ এঁকে তার মুখের দিকে তাকালেন।
তার বিস্ময়টুকু কিন্তু আগন্তুক শয়তানটার নজর এড়াল না। সে ঠোঁটের কোণে হাসির রেখা ফুটিয়ে তুলে এবার বলল–কেন, মিথ্যে বলেছি? বহুলোকই শয়তানের কাছে নিজের আত্মা বেঁধে দিয়ে আখের গুছিয়ে নেবার ধান্ধায় মেতে যায়।
এবার বুক পকেটের খাতাটা দেখিয়ে সে বলল–তাদের নামধাম সম্পূর্ণ বিবরণ এতে স্পষ্টাক্ষরে লেখা রয়েছে। বললে বিশ্বাস করবেন কিনা জানি না। শয়তান তাদের কত রকম উপকারই যে কওে, তার ইয়ত্তা নেই। কথা বলতে বলতে সে বার কয়েক ফাঁচ ফাঁচ করে হাঁচি দিয়ে নিল।
আগন্তুক শয়তান হাঁচির এ বে-আদপটাকে রুখতে গিয়ে নতুনতর আর একটা ঝামেলার মধ্যে পড়ে যায়। বুকের ভেতর থেকে বিশ্রি শব্দ করে বার বার ঢেকুর উঠতে আরম্ভ হয়ে যায়। মনে হল, তার বুক আর পেট বুঝি ফেটে একাকার হয়ে যাবে।
মহাধড়িবাজ দার্শনিক বন-বন তার এ সমস্যাটাকে নিজের কাজে লাগিয়ে নিজের মতলটাকে কাজে লাগাবে ভাবল। তাই তিনি অন্য প্রসঙ্গে চলে গেলেন। মদের নেশায় বুঁদ হয়ে পড়লেও নিজের স্বার্থের কথা মাথার ভেতরে ঠিক ধরে রেখেছেন।
হঠাৎ-ই তিনি বলে উঠলেন–আপনি তো একটু আগেই বললেন, আত্মা জিনিসটা মূলত ছায়া-ছায়া একটা পদার্থ–ঠিক কি না?
হ্যাঁ, তা তো বলেছিই। কথাটা বলেই আগন্তুক শয়তানটা ফাঁচ ফাঁচ করে বার দু-তিন হাঁচি দিল।
ফিক ফিক করে হেসে দার্শনিক প্রবর বললেন–আমার ধারণা কিন্তু অন্য রকম।
অন্য রকম? আত্মা সম্পর্কে আপনার বিশ্বাস কী? কথাটা বলেই আগন্তুক বার কয়েক ভেউ ভেউ করে ঢেকুর তুলে ফেলল। তারপর দার্শনিক মুখ খুলল–দেখ হে, আত্মা মানে চাটনি ছাড়া আর কিছুই নয়।
আগন্তুক সচকিত হয়ে বলে উঠল–সে কি কথা! আপনি বলছেন, আত্মা মানে চাটনি!
ভালো কথা, যদি চাটনি বলে মেনে নিতে না পারো তবে মনে করো আত্মা মানে চপ-কাটলেট।
চপ-কাটলেট!
তা যদি ওটাও মেনে নিতে না পারো তবে মনে করো আত্মা মানে সসেজ–এবার আশা করি মানতে গড়রাজি নও, কি বল?
আত্মাকে আপনি সসেজ বলছেন!
হ্যাঁ, বলছি। একবার নয়, হাজারবার বলতে পারি–আত্মা মানে সসেজ।
কথাটা বলতে বলতে দার্শনিক বন-বন ফিক ফিক করে হেসে বার কয়েক আগন্তুক শয়তানটার পিঠ চাপড়ে আবারও বললেন–আত্মা মানে সসেজ, বুঝলে বাছাধন?
অস্বাভাবিক গম্ভীর মুখে আগন্তুক শয়তানটা ঝট করে চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়ল। চেয়ারটাকে পিছন দিকে ঠেলে দিয়েই আবার ফাঁচর ফাঁচর করে হাঁচতে শুরু করে দিল। আর সে সঙ্গে থেকে থেকে ভেউ ভেউ করে ঢেকুর তুলতেও ছাড়ল না। তারপর নিজেকে একটু সামলে নিয়ে বলল–আপনার কথাবার্তা মোটেই ভদ্রজনোচিত মানে মার্জিত নয় মোটেই। অসভ্য বর্বরের মতো যা খুশি তাই বলে যাচ্ছেন! অসভ্য বর্বর কোথাকার!
