হুকুম হওয়ামাত্র দার্শনিক নিতান্ত বাধ্য শিশুর মতো হাত থেকে গ্লাসটা নামিয়ে টেবিলে রেখে দিলেন। শয়তানটা তার কাঁধে মৃদু ঝাঁকুনি দিয়ে বলল–শোন দার্শনিক, বইটা কিন্তু ভালোই লিখেছ। তবে আমি বলব, তোমার ধ্যান-ধারণাকে আরও একটু গোছগাছ করে নিতে পারতে। আমি লক্ষ্য করেছি, অ্যারিস্টটলের চিন্তা ভাবনার সঙ্গে তোমার চিন্তার অনেকটাই মিল রয়েছে। যে কজন বড় বড় দার্শনিকের সঙ্গে আমার ঘনিষ্ট সম্পর্ক ছিল, তাদের মধ্যে এ ভদ্রলোকও একজন। তিনি বস্তা-বস্তা লিখেছেন সত্য। কিন্তু তাদের মধ্যে সত্যি কথা লিখেছেন মাত্র একটা। আমি তাকে ধরিয়ে দিয়েছিলাম কথাটা নিতান্তই বিঘুঁটে।
আমি তাকে কি বলেছিলাম জানতে ইচ্ছা করছে, তাই না? তবে বলেই ফেলি, শুনুন–
আমি তাঁকে বলেছিলাম–ভাই, হাঁচি দিলেই অতিরিক্ত কথাগুলো নাকের ছিদ্র দিয়ে গলগল করে বেরিয়ে যায়।
খ্যাক খ্যাক করে হেসে দার্শনিক বন-বন বলে উঠলেন–অবশ্যই। অহেতুক কথা বলেছেন ভাই!
আগন্তুক শয়তানটা আবার মুখ খুলল–এবার প্লেটোর কথা কিছু বলছি–সে ছিল আমার এক গ্রামের বন্ধু। চিনতে পারছ তো? বহুৎ আচ্ছা, বহুৎ আচ্ছা, আমি মার্জনা ভিক্ষা করছি।
আমি একদিন একটা খাঁটি সূত্র ধরিয়ে দিয়ে পিরামিডের ওপর গিয়ে বসলাম।
নিজের আচরণের কথা ভাবতে লাগলাম। মনে মনে বললাম–কাজটা মোটেই ঠিক করিনি। দার্শনিক-বন্ধু প্লেটোকে সাহায্য করতে গিয়ে এমন একটা খাঁটি মন্তব্য করা মোটেই ঠিক হয়নি। সত্যি কথা সব সময় কাউকে মুখের ওপর বলা মোটেই সঙ্গত নয়।
আমি আর মোটেই সময় নষ্ট না করে সোজা এথেন্সে ফিরে এলাম। বন্ধুবর পে টো তখন গ্রীক ভাষায় লিখতে আরম্ভ করেছে।
আমি তখন তার পাশে বসেছিলাম। আচমকা একটা টোকা মেরে লাম্বাডা অর্থাৎ রোমানস এলকে দিলাম উলটে, একেবারে চিৎ করে। ব্যস, মূল সূত্রটা গেল সম্পূর্ণ বদলে। আর সেটাই তার দর্শনের মূলসূত্রে পরিণত হয়ে গেল।
দার্শনিক বন-বন তার সারি থেকে চেম্বারলেন মদের বোতল বের করতে করতে ঘাড় ঘুরিয়ে বললেন–আপনি রোমে গিয়েছিলেন কী?
রোমে?
হ্যাঁ, রোমে গিয়েছিলেন?
গিয়েছিলাম বটে, তবে মাত্র একবারই।
তাই বুঝি? মাত্র একবার?
আগন্তুক শয়তানটা এবার পাঠ্য বইয়ের পড়া মুখস্ত করার মতো এক নাগাড়ে বলতে আরম্ভ করল–দেশের মানুষ যখন গণতন্ত্রের দোহাই দিয়ে অত্যাচারের স্টিমরোলার চালিয়ে যাচ্ছিল, তখনই মাত্র একবার রোমের মাটিতে পা দিয়েছিলাম।
হুম! মাত্র একবার, তা–ও আবার বেশ কয়েক বছর আগে?।
দেশজুড়ে তুমুল আন্দোলন চলছিল। তাই তখনকার দর্শনশাস্ত্রের সঙ্গে পরিচয় ঘটার তেমন সুযোগ আমার মেলেনি।
ফিক ফিক করে হেসে বন-বন এবার বললেন–এপিকিউরাস সম্বন্ধে আপনার মতামত কি?
আরে ধ্যুৎ! ভাই, আপনি যে কি বলছেন তা আপনিই বোধহয় ভালো জানেন!
চোখ দুটো কপালে তুলে পণ্ডিত প্রবর এবার বলে উঠলেন–তার মানে? কি বলতে চাইছেন, খোলসা করে বলুন তো?
আপনি তো এপিকিউরাসের কথা জিজ্ঞেস করলেন? আরে ভাই, আমি নিজেই তো এপিকিউরাস।
আপনি, আপনিই–
তার মুখের কথা কেড়ে নিয়ে আগন্তুক শয়তানটা দাঁত বের করে বিশ্রি স্বরে হাসতে হাসতে বলল–হা-হা, আমি সেই দার্শনিক। আমি ক্রমান্বয়ে তিনশো নিবন্ধ রচনা করেছিলাম।
দার্শনিক বন-বন গুলি খাওয়া বাঘের মতো গর্জে উঠল–বাজে কথা!
বাজে কথা! আপনি বলছেন, আমি বাজে কথা বলছি? আমি দার্শনিক এপিকিউরাস নই?
না, অবশ্যই না। ধাপ্পা দেওয়ার আর জায়গা পাননি ভাই!
কি বললেন, আমি ধাপ্পা দিচ্ছি?
হ্যাঁ, হ্যাঁ, আপনি ডাহা মিথ্যে কথা বলছেন–সমানে ধাপ্পা দিয়ে চলেছেন। কথাটা বলেই দার্শনিক বন-বন মুখে ফি ফিক্ করে বিশ্রি একটা স্বর করলেন।
আগন্তুক শয়তানটা এবার তাচ্ছিল্যের সঙ্গে বলল–কি আর বলব, আপনি যা খুশি ভাবতে পারেন, বলতে পারেন।
তার কথায় বন-বনের মুখে হাসির রেখা ফুটে উঠল। তিনি এবার চেম্বারলেন-এর খালি বোতলটা টেবিলে রেখে আবার আলমারির দিকে এগোতে এগোতে স্বগতোক্তি করলেন–যাক, এবারও আমি বাজিমাত করেছি। তবে খুশির প্রমাণস্বরূপ মদের দ্বিতীয় বোতলটা খুলে শরীর ও মনটাকে একটু চাঙা করে নেওয়া যাক।
আগন্তুক শয়তানটা তার হাতের বোতলটার দিকে মুহূর্তের জন্যও না তাকিয়েই পূর্ব প্রসঙ্গের জের টেনে বলল–সে কথা বলছি না, আপনার লেখাটা কিন্তু জুতসই হয়নি।
দার্শনিক চট করে ঘাড় ঘুরিয়ে তার দিকে তাকালেন। সে বলে চলল–আমি কিন্তু হাজারবার বলতে রাজি আছি যে, আপনার লেখা মোটেই মনে দাগ কাটার মতো হয়নি। এটাকে আকর্ষণীয় করতে হলে প্রচুর পরিবর্তন-পরিবর্ধনে করা দরকার। ভালো কথা, আত্মা বলতে কী বোঝেন, বলুন তো?।
আত্মা? –আত্মা কি জানতে চাইছ, এই তো?
হ্যাঁ, আত্মা সম্বন্ধে আপনার মতামত জানতে চাই।
আত্মা?–আত্ম তো? ফিক্-ফিক্-ফিক্ আত্মা কি? কথা বলতে বলতে টেবিলের ওপরে রক্ষিত পাণ্ডুলিপির ওপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করে আবার যেই মুখ খুলতে যাবেন, অমনি আগন্তুক শয়তানটা তাঁকে থামিয়ে দিয়ে বলল
থাক, থাক! আর বলার দরকার নেই।
বন-বন বিস্ময় মাখানো দৃষ্টিতে তার মুখের দিকে নীরবে তাকিয়ে রইলেন।
আগন্তুক কথার খেই ধরে রেখেই বললেন–আমি বুঝতে পেরেছি, আপনি এমন আত্মার দুটা ব্যাখ্যা হাজির করে বসবেন, ঠিক কিনা?
