মহাধড়িবাজ দার্শনিক বন-বন সবকিছুর উপলব্ধি করেও চেয়ারটা এগিয়ে দিয়ে তাকে আদর-যত্ন করে বসতে অনুরোধ করলেন।
দার্শনিক প্রবর জব্বর পরিকল্পনা করেছেন। কিন্তু হতচ্ছাড়া আগন্তুকের উদ্বোধনী ভাষণটার ঠেলাতেই পুরো মতলবটা পুরোপুরি বানচাল হয়ে গেল।
আগন্তুক ফিক্ করে হেসে উঠে ফ্যাসফ্যাসে গলায় বলে উঠল–চমৎকার! বলিহারী স্মৃতি শক্তি বটে! চিনে ফেলেছে দেখছি! কথাটা বলে সে অট্টহাসিতে ফেটে পড়ার যোগাড় হলো। সে কি বিচ্ছিরি হাসির ছিরি রে বাবা! গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে।
অট্টহাসির সঙ্গে সঙ্গে আরও দু-দুটো কাঁপানো ঘটনা ঘটে গেল। গায়ের রক্ত হিম হয়ে আসার মতো ব্যাপারই বটে। শয়তান কুকুর হতচ্ছাড়াটার দিকে তাকিয়ে দাঁতের পাটি বের করা ঘেউ ঘেউ শব্দে কেঁপে কেঁপে উঠতে লাগল। মুহূর্তের মধ্যেই বিড়ালটাও বিকট শব্দে আর্তনাদ করতে করতে ঘরের একবারে কোণে গিয়ে বিচ্ছিরি স্বরে খ্যাক খ্যাক করতে লাগল। আর সে সঙ্গে ল্যাজটাকে ফোলাতেও ভুলল না। গলার শিরা ফুলিয়ে চিল্লিয়ে, পিছনের পা দুটোকে বার বার এমন ছুঁড়তে আরম্ভ করল যে, তার আর কুকুরটার নিরবচ্ছিন্ন চিৎকারে আগন্তুকের অট্টহাসি চাপা পড়ে গেল।
শয়তানটার বুক পকেট থেকে ঠেলে বেরিয়ে আসা বইটার রং অদ্ভুতভাবে বদলে গেল। এমনকি লেখাও গেল একই রকমভাবে বদলে। লেখাটা আগে ছিল কালোর ওপর সাদা দিয়ে লেখা। এখন সেটা রক্তের মতো লাল রং ধারণ করেছে। আর আগে লেখা ছিল, ক্যাথেলিক ধর্মানুষ্ঠান। আর এখন দেখা যাচ্ছে, আভিশাপের ডাইরী লেখা রয়েছে।
একই সঙ্গে দুটো অভাবনীয় ঘটনা ঘটে যাওয়ায় দার্শনিক বন-বনের স্নায়ুগুলো বিকল হয়ে যাওয়ার যোগাড় হলো। বিস্ময়ে যেন তিনি একেবারে বিমূঢ় হয়ে পড়লেন। তিনি কোনো কথা বলতে না পারায় কেবল অসহায়ভাবে ঠোঁট দুটো নাড়াতে লাগলেন।
আগন্তুক শয়তানটা তার বেহাল পরিস্থিতি দেখে বলে উঠল–
থাক থাক খুব হয়েছে, আমি বুঝতে পারছি। কথা বলতে বলতে অন্ধকারের রাজা, সে এক হেঁচকা টানে চোখ থেকে চশমাটা খুলে সোজা পকেটে চালান করে দিল।
প্রথমের ঘটনা দুটোতে দার্শনিক বন-বনের নিচের ঠোঁটটা ঝুলে পড়েছিল। এবার চোখ দুটো একেবারে কপালে উঠে গেল। এমন আজব কাণ্ড চোখের সামনে ঘটতে দেখলে কার না পিলে চমকে উঠবে?
আগন্তুক শয়তানটার চোখ দুটোকে নিয়ে অনেক ভাবনা চিন্তাই দার্শনিক প্রবর করেছিলেন। মোটেই সুবিধা করতে পারেননি। কিন্তু এখন সবুজ চশমাটা উধাও হয়ে যাওয়ায় তার চোখ দুটোর আকৃতি আর রঙ দেখে তার নিজের চোখ দুটোই যেন কপালে উঠে যাওয়ার যোগাড় হয়েছে। আপন মনেই আঁতকে উঠলেন–আরে বাবা! এ কী দেখছি হতচ্ছাড়াটার চোখে!
দার্শনিক বন-বন অনুমান করেছিলেন নচ্ছাড়টার চোখের রং কালো। কিন্তু এখন দেখছেন আসলে তা নয়। তবে? তার চোখের রং কালো, নীল, ধূসর, হলুদ, পিঙ্গল, সাদা, বেগুনি বা লাল কোনোটাই নয়। আকাশের কোনো রং তো নয়ই, এমনকি পাতালের রং-ও তার চোখে লক্ষিত হচ্ছে না।
দার্শনিক স্পষ্ট লক্ষ্য করলেন, নচ্ছাড় শয়তানটার তো চোখের কোনো বালাই-ই নেই। চোখ দুটোর কোটরে যা দেখা যাচ্ছে, তাকে মড়া চামড়া ছাড়া আর কিছুই ভাবা যায় না। অদ্ভুত কোনো ঘটনার মুখোমুখি হলে তাকে মনের কোণে চেপেচুপে রাখা দার্শনিক প্রবর বন-বনের কোষ্ঠীতে লেখা নেই। তিনি মুখ খোলার আগেই শয়তানটার অনুচ্চকণ্ঠ শোনা গেল–
কি হে বনবন, আমার চোখ দেখবে বলে বড় আশা করেছিলে, তাই না? অকর্মার ঢেকী! জনা কয়েক চিত্রশিল্পী রং আর তুলির টানে আমার চোখ আঁকবে বলে বহু চেষ্টা করেছে। কয়েকটা আজে-বাজে নমুনাও কিছু বাজারে ছেড়েছিল বটে। সেগুলোর দিকে তাকালে ভেতর থেকে হাসি ঠেলে বেরিয়ে আসতে চায়। সেগুলোকে আমার চেহারা। আর চোখের বর্ণনা এমন লাগাম ছাড়া হয়ে পড়েছিল যে, প্রত্যেকটা ছবিকে রদ্দিমার্কা জঞ্জাল ছাড়া আর কিছুই ভাবা যায় না। বন-বন, মানুষের কাছে নাকি চোখের কদর খুবই বেশি। চোখ ছাড়া কারো এতটুকুও চলার উপায় নেই। চোখ! হ্যাঁ, তোমার দু দুটো চোখ আছে, কিন্তু আমার একটাও নেই।
কিন্তু দার্শনিক সাহেব, মনে রাখবেন, আমার দৃষ্টি কিন্তু বড়ই অন্তর্ভেদী। কি? প্রমাণ চাচ্ছ? ভালো কথা, প্রমাণ দিচ্ছি। ওই যে ঘরের কোণায় বসে হুলো বিড়ালটা অনবরত ফুঁসে চলেছে, সেটাকে আমি যেমন দেখতে পাচ্ছি, তুমি কিন্তু মোটেই তা দেখতে পাচ্ছ না। চিন্তা-ভাবনা তার চোখে-মুখে চিন্তার ছাপ সুস্পষ্ট, আমি পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছি, তুমি তা পারছ না।
আরও আছে, তার ধারণায় আমি একজন পরম ধার্মিক-গীর্জার ধর্মযাজক। আর তুমি? তুমি একজন চালাকের পোশাকে বোকা দার্শনিক ছাড়া কিছু নও। তার মগজ ক্ষমতা, তার বুদ্ধির তারিফ না করে পারা যায় কি, তুমিই বল?
অতএব এতেই প্রমাণ হচ্ছে, আমি মোটেই অন্ধ নই, মানছ তো?
সত্যি কথা বলতে কি, আমার কাছে চোখ দুটো নিতান্তই অপ্রয়োজনীয় অঙ্গ ছাড়া কিছুই নয়।
কথাগুলো বলেই আগন্তুক বাবাজী টেবিল থেকে মদের বোতল আর দুটো গ্লাস টেনে নিয়ে মদ ঢালল। তার একটা গৃহকর্তার দিকে বাড়িয়ে দিল আর নিজের হাতেরটা ঠোঁটের কাছে তুলে নিল।
এক চুমুক মদ গিলেই দার্শনিক বন-বনকে গ্লাসটা নামিয়ে টেবিলে রেখে দিতে বলল।
