আরও আছে। ইয়া লম্বা একটা গলাবন্ধ দিয়ে ঘাড় আর গলার সবটুকু জড়িয়ে রাখা হয়েছে। সব মিলিয়ে আগন্তুক এমন জবরদস্ত পোশাক গায়ে চাপিয়ে এসেছে যার ফলে কেউ তাকে ধর্মযাজক মনে করলেও তেমন ভুল করবে না। আবার কথাবার্তায় ধরন-ধারণ আর ভাবভঙ্গি দেখলে এরকম সম্ভাবনার কথাই সবার আগে মাথায় আসে।
আরও আছে, আগন্তুক বাবাজীর বাঁ কানের ফাঁকে একটা কলম গোঁজা, কেরানিরা মাঝে মধ্যে লেখার ফাঁকে যেভাবে কলম গুঁজে রাখে, ঠিক সে কায়দায়ই সে কলমটাকে রেখেছে। আর কোটের বুক পকেট থেকে মাথা বের করে রেখেছে মোটা একটা বই। হঠাৎ করে দেখলে মনে হয় সেটা বুঝি আশ্রয়স্থল থেকে উঁকি দিচ্ছে। সেটার রং কালো। ইস্পাতের ক্লিপ দিয়ে আচ্ছা করে আটকে দেওয়া হয়েছে। বইটার বেরিয়ে থাকা অংশটুকুতে বড় বড় হরফে লেখা ক্যাথেলিক ধর্মানুষ্ঠান।
বিচিত্র আগন্তুকের পকেটে ধর্মগ্রন্থ দেখা গেলেও তার চেহারা ছবি আর পোশাক পরিচ্ছদ দেখলে সাক্ষাৎ শয়তান ছাড়া অন্য কিছু ভাবতে উৎসাহই পাওয়া যায় না। কত আর বলব, তার গায়ের চামড়া পর্যন্ত শ্বেতী রোগীর–না, মড়ার মতো ফ্যাকাশে বিবর্ণ। আর কপালটাকে তো একটা ঢিবি ছাড়া ভাবাই যায় না আর চোখে লাগার মতো চওড়া বটে। সে সঙ্গে অসংখ্য বলিরেখা যেন সেখানে মানচিত্র এঁকে রেখেছে।
ঠোঁটের কোণ দুটো ভেতরের দিকে বেঁকে ঢুকে গেছে অনেকটা। হঠাৎ করে দেখলে মনে হয় কেউ বুঝি জোর করে ঠেলে কান দুটোকে ভেতর খুঁজে দিয়েছে।
আগন্তুকের দিকে অনুসন্ধিৎসু দৃষ্টিতে তাকালে মনের কোণে একটা ভাবনারই উদয় হয়–শয়তানটা যেন বৈষ্ণবের মতো বিনয়ের অবতার। আর বিনয়ের ভারে যেন মাটিতে লুটিয়ে পড়তেই আগ্রহি।
আগন্তুক এবার সচল হলো। সে দুহাতের আঙুল দশটাকে লতার মতো একটা সঙ্গে অন্য আর একটাকে পেঁচিয়ে ধরে কাহিনীর নায়ক পণ্ডিত প্রবরের দিকে গুটিগুটি সামান্য এগিয়ে আসতেই তার গা থেকে পরম বিশুদ্ধতা যেন বাতাসে ছড়িয়ে পড়ল। ব্যাপারটা প্রত্যক্ষ করামাত্র দার্শনিক বন-বনের মুখমণ্ডল থেকে ক্ষোভের ছাপটুকু নিঃশেষে মুছে গেল।
বন-বন আগন্তুকের পা থেকে মাথা পর্যন্ত খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখার ব্যাপারটাও সেওে নিলেন। এবার মুখে প্রসন্নতার ছাপ ফুটে উঠল। পাশের একটা চেয়ার দেখিয়ে তাকে বসতে অনুরোধ করলেন।
আগন্তুকের চোখে-মুখেও প্রসন্নতার ছাপ সুস্পষ্ট হয়ে উঠল। হঠাৎ হ্যাঁ, এভাবে হঠাৎ-ই দার্শনিক প্রবরের মনের পরিবর্তন হয়ে যাওয়ার মূলে হয়তো আগন্তুকের বিটকেলে ভাবভঙ্গি, চেহারা ছবি আর পোশাক-পরিচ্ছদের প্রভাব কিছু না কিছু ছিলই। আর এ যদি না হয় তবে দার্শনিক মারাত্মক ভুলের ফাঁদে পা দিয়েছেন।
তার সম্বন্ধে আমার অন্তত যেটুকু জানা আছে, দার্শনিক বন-বনকে কেউ বাহ্যিক ব্যক্তিত্বের সাহায্যে কোনোদিনই বার করতে পারেনি–পারবেও না। সত্যি কথা বলতে কি, বন-বনের পক্ষে আগন্তুকের চরিত্র পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে বিচার করে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। এ তো হওয়া অসম্ভবও নয়। শুধুমাত্র এটুকুই নয়, আগন্তুক একেবারেই যে-ঢঙের টুপি মাথায় চাপিয়েছে, তার কথা বলে শেষ করা যাবে না। একে তো সুপারি গাছের মতো ধিঙি এক চেহারা। তার ওপর এমন বেখাপ্পা। একটা টুপি মাথায় চাপিয়েছে কেন? ব্যাপারটা তো খুবই গোলমেলে। ব্যাপারটা আসলে কি? তলায় শিং গজায়নি তো। শিং দুটোকে ঢেকে ঢুকে রাখার জন্যই কি এ পথ বেছে নিয়েছে?
আরে বাবা! প্যান্টের পিছন দিকটা কিভাবে ঠেলেঠুলে ওপরে উঠে গেছে রে বাবা! কেন? এমনটাই বা কেন হল? আর ঠেলে ওপরে উঠে-আসা জায়গাটাই বা ধিকধিক করে কাঁপাকাপি করছিল কেন? ল্যাজওয়ালা কোটটার পিছনের দিকও সে বারবার কাঁপাচ্ছিল কেন? কোন অদৃশ্য বস্তুর কাঁপুনির জন্য এমন বিঘুঁটে কাণ্ডটা ঘটছিল।
সামান্যতম অন্তদৃষ্টি থাকলেই সে সন্দেহটা মাথায় উঁকি মারে তা নিতান্ত আজগুবি মনে হলেও যে সত্যি, তাতে কিছুমাত্র সন্দেহের অবকাশ নেই।
হ্যাঁ, অনুমান অভ্রান্ত। আগন্তুকের গজিয়ে ওঠা ল্যাজটার জন্যই প্যান্ট আর কোটের পিছন দিকটা বারবার তিরতির করে কাঁপছিল।
এরকম লোকটা সম্বন্ধে দার্শনিক প্রবর বন-বন অন্তরের গোপন করে চিরদিনই এক অসঙ্গত সম পোষণ করে এসেছেন। তাই তো সে লোকটার আকস্মিক আবির্ভাবে তিনি অবাক হলে সন্তুষ্ট যে হয়েছেন, এতে এতটুকুও ভুল নেই–সংশয়ও নেই সামান্যতম।
তবে এও সত্য, হাবভাব আর কথা বলার মাধ্যমে দার্শনিক কিন্তু আগন্তুককে এতটুকুও টের পেতে দিলেন না যে, তিনি তাকে চোখের সামনে দেখতে পেয়ে আহ্লাদে গদগদ হয়ে পড়েছেন আর এমন একজন লোকের দেখা পাওয়া যে নিতান্ত ভাগ্যের ব্যাপার তাও তাকে তিলমাত্রও বুঝতে দিলেন না। লোকটা যে মহা দরিবাজ বুঝতে পেরেও তার কাছে কিছুতেই তিনি ধরা দিলেন না। উপরন্তু মহাদার্শনিক বন বন কথার কায়দা-কৌশলের মাধ্যমে আগন্তুকের কাছ থেকে বেশ কিছু নতুন তত্ত্ব বুঝে নেবার জন্য সাধ্যতীত ধান্ধা চালাতে লাগলেন। নতুন বইটা লেখার ব্যাপারে এটা কম-বেশি সাহায্য করলে করতেও পারে।
শত হলেও অদ্ভুতদর্শন আর আশ্চর্য পোশাক-পরিচ্ছদে আবৃত আগন্তুকের বয়স তো আর কিছু কম নয়। তার জ্ঞানগরিমা আর নীতিজ্ঞান তো পৃথিবী বিখ্যাত ব্যাপার। এমন একজন বিশ্বনন্দিত লোকের মগজ থেকে কিছু সংখ্যকও বিতিকিচ্ছিরি ধারণাটা ছিনতাই করে নেওয়া যায়, তবে মনুষ্য জাতির যে অশেষ উপকার সাধিত হবে, আর সে সঙ্গে পণ্ডিত প্রবর বন-বনও অমরত্ব লাভে ধন্য হবেন, সন্দেহ কি?
