আবার বিশেষ একটা ব্যাপার নিয়ে অনবরত দরকষাকষি করতে গিয়ে পুরো ব্যাপারটাই তিনি বানচাল করে দিলেন। দর কষাকষির ব্যাপারে তার যথেষ্ট নামডাক থাকা সত্ত্বেও তিনি নাস্তানাবুদ হচ্ছেন।
ভয়ানক উদ্বেগের মধ্যে রয়েছে দার্শনিকের স্নায়ুচাপ আর সহ্য করতে পারছে না। সবাই যেন ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছে–একযোগে তার স্নায়ুগুলোকে আক্রমণ করে বসেছে। দার্শনিক বন-বনের পোষা কুকুরটা গুটিসুটি মেরে শুয়ে রয়েছে। বহু মানুষ ভীত হয়ে পড়লে যে গানের সুর ভাজতে আরম্ভ করে, কুকুরটাকে শুনিয়ে শুনিয়ে বন বন প্রাণ খুলে শিস দিচ্ছেন আর উদ্বেগ উৎকণ্ঠার ছোপ লাগা চোখে সুবিশাল ঘরের কোণগুলোর দিকে বার বার তাকাচ্ছেন–যেখানে আগুনের তাপ পৌঁছতে পারে না সেখানকার জমাটবাধা কালো ছায়া অন্ধকারকে দূরে সরিয়ে দিতে পারছে না।
দার্শনিক বন-বন কোণগুলোকে এমন করে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে চাচ্ছেন যে, অন্ধকারের ভেতরে এমনকি আছে তা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে উৎসাহি হয়েছেন। পারলেন না। ব্যর্থ হলো–হতাশায় জর্জরিত হলেন।
অনন্যোপায় হয়ে দার্শনিক বন-বন হতাশ হয়ে হাতলওয়ালা চেয়ারটায় দুম্ করে বসে পড়লেন। টেবিল থেকে কাগজ-কলম টেনে নিয়ে খসখস করে সুবিশাল সারগর্ভ পাণ্ডুলিপি লিখতে শুরু করলেন। লেখাটা আগামীকাল ছাপা হবে। রাতের মধ্যেই কাজটা সেরে ফেলতে হবে। তিনি লেখা-ঝোকার মধ্যে মিনিট খানেক ডুবে ছিলেন। পর মুহূর্তেই ঘরটারই ভেতরে চাপা একটা গুনগুনানি শুরু হয়ে গেল।
বন-বন উৎসর্গ হয়ে শব্দটার অর্থ উদ্ধার করতে চেষ্টা করলেন। শুনতে পেলেন, কে যেন প্রায় অস্পষ্ট স্বরে বলছে–মি. বন-বন, আমার কিন্তু তাড়া নেই।
তড়াক করে লাফিয়ে কাহিনীর নায়ক চেয়ার ছেড়ে দাঁড়িয়ে পড়লেন। ফলে টেবিলটা ছিটকে হাত কয়েক দূরে গিয়ে পড়ল। পণ্ডিত প্রবর বন-বন বড় বড় চোখ করে চারদিকে তাকিয়ে নিয়ে দাঁতে ঘষে অধৈর্য ভরে বলে উঠলেন–হতচ্ছাড়া শয়তান পাজি।
শান্ত কণ্ঠে জবাবটা ফিরে এল সত্যি একদম সত্যি কথা।–সত্যি কথা! কীসের সত্যি কথা? কে তুমি?
বিপরীত দিকে কোনো উত্তর ভেসে এলো না। বন-বন ক্রোধে ফেঁটে পড়ার যোগাড় হলেন। এবার তিনি রীতিমতো অধৈর্যের সঙ্গে বলে উঠলেন–চুপ করে থেকো না। বল, কে তুমি? এখানে ঢুকলেই বা কিভাবে? গলা ছেড়ে চিৎকার করে কথা কটা বলেই দার্শনিক থেমে গেলেন, কারণ, হঠাৎ বিছানার দিকে তার নজর পড়েছে। চমকে উঠলেন। শরীরের সব কটা স্নায়ু একই সঙ্গে ঝনঝনিয়ে উঠল।
দার্শনিক অনেক কষ্টে নিজেকে সামলে-সুমলে নিলেন।
কিন্তু বন-বন এমনকি দেখলেন যার ফলে তিনি আঁতকে না উঠে পারলেন না? তিনি হঠাৎ একেবারে হঠাৎ দেখতে পেলেন, কে একজন তাঁরই খাটের ওপর টান টান হয়ে শুয়ে তার দিকে পিটপিট করে তাকিয়ে রয়েছে।
আগন্তুক বন-বনের প্রশ্নের জবাব দেবার প্রয়োজনই বোধ করল না। তার কথার কিছুমাত্র গুরুত্ব না দিয়েই সে বলতে লাগল–তোমাকে যা বলতে চাই তা শোন–
সময় ফুরিয়ে এলেও আমি মোটেই ছটফট করি না। যে কাজের জন্য এখানে আসা, সেটাকে আমি খুবই জরুরি বলেও মনে করছি না। অল্প কথায় বলছি–তোমার হাটে হাঁড়ি ভাঙা, লেখাটা শেষ না হওয়া পর্যন্ত আমি অনায়াসেই অপেক্ষা করতে পারি।
চমকে উঠে পণ্ডিত প্রবর বললেন–কী? কী বললে? হাটে হাঁড়ি ভাঙা লেখা! এই রে! আমি অবাক হচ্ছি, আমি যে হাটে হাঁড়ি ভাঙার ব্যাপার-স্যাপারই লিখেছি, তুমি জানলে কি করে শুনি?
ধূর ধূর। আগন্তুক চাপা গলায় প্রায় ফিসফিসিয়ে বলল।
পরমুহূর্তেই আগন্তুক বাবাজী একেবারে যন্ত্রচালিতের মতো দুম্ করে লাফিয়ে বন-বনের সামনে এসে দাঁড়াল।
সাক্ষাৎ অপচ্ছায়াটাকে আসতে দেখামাত্র বন-বনের মাথার টুপির লম্বা শিখরটা দুমড়ে মুচড়ে পিছন দিকে চলে গেল। ব্যাপারটা এমন দাঁড়াল যে, আগন্তুকের আসার পথের দিকে থাকবার মতো সাহস তার হলো না।
ব্যাপারটা দেখে দার্শনিক প্রবর বন-বন অবশ্যই যারপরনাই অবাকই হলেন।
এটুকু সময়ের মধ্যেই আগন্তুকের চেহারা আর পোশাক পরিচ্ছদ অনুসন্ধিৎসু নজরে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে না দেখে তিনি পারলেন না।
হতচ্ছাড়াটা অসম্ভব লম্বা আর লাঠির মতো রোগাটে চেহারা। লাঠি নয় জ্যান্ত একটা সুপারি গাছ যেন তার চোখের সামনে দাঁড়িয়ে। ইয়া লম্বা চেহারাটা কুচকুচে কালো কাপড়ে তৈরি, গায়ের সঙ্গে লেগে থাকা পোশাক দিয়ে। বছরখানেক আগে যে পোশাক পথে-ঘাটে দেখা যেত। যে দর্জি এগুলো তৈরি করছে সে ছিল নিতান্ত এক বামন, ছোটখাট আকৃতির মানুষ। যার জন্য পোশাকটা লম্বায় এত ছোট হয়ে গেছে যে, ধিঙি লোকটার গোড়ালির কাছে প্যান্টটা অনেকখানি ওপরে উঠে রয়েছে।
পোশাকের গরীবিয়ানার বিপরীত লক্ষণ নজরে পড়ছে তার জুতা জোড়ায়। জুতা দুটোকে রীতিমত চাকচিক্য করে তুলেছে এক জোড়া দামি ও ঝকমকে বক্লস্।
মাথায় ইয়া বড় একটা টাক চকচক করছে। মাথায় চুলের নাম-গন্ধও নেই। কেবলমাত্র ঘাড়ের কাছে একগোছা লম্বা চুল। বেশি পাকানো। সেটা পিঠের ওপর দোল খাচ্ছে।
আর চোখ? সবুজ চশমা দিয়ে চোখ দুটোকে ঢেকে রেখেছে। তার দুধারেও সবুজ কঁচ সেঁটে দেওয়া। যাতে তিলমাত্র আলোও চোখের মণিতে আঘাত হানতে না পারে সেজন্যই এ বিশেষ ব্যবস্থা। এরকম অদ্ভুত ব্যবস্থা করে রাখায় দার্শনিক কিন্তু আগন্তুকের চোখ দুটো দেখতেই পেলেন না। চোখের গড়ন যে কেমন তা জানা তার পক্ষে কিছুতেই সম্ভব হলো না।
