প্যান্টের কথা আর কী-ই বা বলব! মার্টিনের প্যান্টে ছুঁচের কেরামতি দেখলে চিত্ত চমৎকার হয়ে যেতে বাধ্য। লাল পুঁথির গায়ে জ্বালা ধরা নকসা কার আলখাল্লটার দিকে চোখ পড়তেই মনে হয়, ঘোড়সওয়ারের পিঠে চেপে বুঝি কুয়াশা শুন্যে ভেসে চলেছে।
তার বিদঘুঁটে চেহারা তো রয়েছেই, আর সে সঙ্গে কিম্ভুতকিমাকার পোশাক মিলে তাকে এমন একটা অদ্ভুত বা নিয়ে তোলে, যার নজির পাওয়া সত্যি ভার।
দার্শনিক পণ্ডিত বন-বন যখন পথ দিয়ে যাতায়াত করেন তখন পথচারীরা এখানে-ওখানে দাঁড়িয়ে জটলা করে, কানাকানি কওে, বন-বন কি স্বর্গের পাখি, নাকি নিজেই সাক্ষ্যৎ স্বর্গ?
সত্যি বলছি, আমি কিন্তু বন-বনের চেহারা ছবি বা অদ্ভুত পোশাক-আশাক নিয়ে কোনো মন্তব্যই করি না, ভবিষ্যতে করব না। লোকের ব্যক্তিগত ব্যাপার-স্যাপার নিয়ে কথা চালাচালি করা আমার স্বভাব নয়। একজন গবেষক, ঐতিহাসিক ঔপন্যাসিকরা এ-কাজের দায়িত্বে তো রয়েছেই।
দার্শনিক পণ্ডিত বন-বন অধিকাংশ সময় রেস্তোরাঁয় বারোমাস চেয়ার আগলে বসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটান। সেখানে পা দিলেই মনে হবে মহাপুরুষদের সাধনা ক্ষেত্রে হাজির হয়েছি। এ-ভাবনাটা যাতে সহজেই মানুষের মাথায় আসে, সে জন্য রেস্তোরাঁর ফটকে একটা ইয়া মোটা বই আর একটা বড়সড় বোতল দড়ি বেঁধে ঝুলিয়ে দেওয়া। হয়েছে। আর এদের ঠিক পিছনে একটা থালার গায়ে বড় বড় হরফে লিখে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে, বন-বনের খুপড়ি। এটা দেখলেই মনে হবে বার খুপড়িতে প্রবেশ করা হচ্ছে আর সেখানে কোনো প্রকার মগজের অধিকারী অবস্থান করছেন। সেটাকে রেস্তোরাঁ বলা হয় বটে। কিন্তু সেটা একটা বাজারের খানাপিনার ঘর ছাড়া কিছু নয়।
দার্শনিক পণ্ডিতপ্রবর বন-বন এখানেই মদের বোতল আর গ্লাস নিয়ে সর্বক্ষণ পড়ে থাকেন। আর এখানেই মগজে শান দেন। মগজ-চর্চায় লিপ্ত থাকেন। চারদিকে হরেক রঙ আর হরেক রকম নক্সাওয়ালা পর্দা ঝোলে। এক কোণে একটা খাটে সব সময় বিছানা পাতাই থাকে। তার শোবার ব্যবস্থা। আর নক্সাকরা চাঁদোয়া খাটের মাথায় ঝোলে। সব মিলিয়ে অদ্ভুত এক পরিবেশ সৃষ্টি করা হয়েছে পুরো ঘরটাতে। ফকড়ামি করার জায়গা এটা নয়, তা ঘরে ঢুকেই বুঝে নেওয়া যাবে।
খুপড়িটার যে কোণে শোবার খাট পাতা রয়েছে তার বিপরীত দিকের কোণে রান্নার ব্যবস্থা আর পুঁথিপত্রের পাহাড়। থালা-ঘটি-বাটি, বইপত্র স্থূপাকার করে রাখা হয়েছে। তা-ও আবার যে সে বই নয়, পৃথিবীর বড় বড় দার্শনিকদের লেখা রয়েছে। সেগুলোর পাতায় পাতায়। সেগুলোর ফাঁক-ফোকড় দিয়ে উঁকি দিতে দেখা যাচ্ছে। হাতা-খুন্তি–আরও কত কী রান্নার সরঞ্জাম।
সত্যি, উদরতুষ্টির সামগ্রী আর মগজের খোরাকের একই সঙ্গে অবস্থান দেখলে কার না মন-প্রাণ পুলকে নেচে উঠবে। আরও আছে ইয়া পেল্লাই একটা ফায়ার প্লেস দরজায় ঠিক সামনেই ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। আগুন-দৈত্য যেন বিরাট গ্রীবা বিস্তার করে গিলে খাওয়ার জন্য ছোঁক ছোঁক করছে। আর মদিরার ফিরিস্তি দিতে গেলে রাত বুঝি কাবারই হয়ে যাবে।
এ বিশেষ খুপড়িটাতেই এক মাঝরাতে পণ্ডিত প্রবর একটা চেয়ার দখল করে বসেছিলেন। অদূরেই চুল্লির কাঠ লকলকে আগুন আর উত্তাপ ছড়াচ্ছে।
আগুন! আগুন জ্বলছে পণ্ডিত বন-বনের মাথার ভেতরে ও বাইরে, কিন্তু হাড় কাঁপানো ঠাণ্ডা। একে শীতকাল, তার ওপরে, মাঝরাত। হাড়ে রীতিমত কাঁপুনি ধরিয়ে দিচ্ছে। স্তাবকের দল এতক্ষণ পণ্ডিত প্রবরকে বেষ্টন করে বসেছিল। মস্তিষ্কের কেরামতি দীর্ঘসময় ধরে তারা অধীর উৎসাহের সঙ্গে শুনছিল। সবেমাত্র বকাবকি করে সবাইকে খুপড়িটা থেকে বের করে দিয়ে তিনি দরজায় তালা ঝুলিয়ে দিয়েছেন।
এরকম একটা ভয়ানক রাত একশো বছরের মধ্যে বড়জোর একবার বা দুবার। আসে। বাইরে দুর্যোগ পূর্ণ আবহাওয়ার দাপাদাপি। অনবরত ঝর ঝর করে তুষার ঝরেই চলেছে। দৈত্যের দীর্ঘশ্বাসের মতো দমকা বাতাসে পুরো বাড়িটাই তিরতির করে অনবরত কেঁপেই চলেছে। প্রবল বেগে বাতাস চিমনিটার ভেতর দিয়ে ভেতরে ঢুকে আসছে। ফলে দার্শনিকের খুপড়িটার সব কটা পর্দা দারুণভাবে কাঁপছে, নড়ছে আর দুলছে। বাসনকোসন দুমদাম করে পড়ছে আর ছোটাছুটি করছে, কাগজপত্র উড়ে গিয়ে ঘরময় ছড়িয়ে পড়ছে আর মেঝের ওপরে মোটাসোটা বইগুলো দুম্ দাম করে আছড়ে পড়ছে–গড়িয়ে যে যেদিকে পারছে চলে যাচ্ছে। সব মিলিয়ে যেন রীতিমত একটা প্রলয় কাণ্ড ঘটে চলেছে।
এরকম একটা পরিস্থিতিতে পণ্ডিত প্রবরের মেজাজ যে তিড়িক্কি হয়ে পড়বে তাতে আর আশ্চর্য কি? সব বড় বড় দার্শনিকরাই মাথা ঠাণ্ডা রাখার জন্য সাধ্য মতো চুল্লিটার কাছাকাছি ঘেঁসে বসেন। দার্শনিক বন-বনও তা-ই করলেন।
কেবলমাত্র আকস্মিক তুফানের জন্যই যে বন-বনের মাথাটা গরম হয়ে গেছে। তাই নয়, সারাদিনে অদ্ভুত বহু ঘটনা ঘটেছে। তাই তো তার ছোট মাথার খুলিটার ভেতরে কালবৈশাখীর দাপাদাপি শুরু হয়ে গেছে। অবিশ্বাস্য রকম শান্তি বিঘ্নিত হয়েছে।
পরিস্থিতি তাকে এমন উদ্ৰান্ত করে তুলেছে, মেজাজটা এমন করে বিগড়ে দিয়েছে যে, মদ গিলছেন মনে করে তিনি ভুল করে ওমলেটে জোরসে কামড়ে দিলেন।
পর মুহূর্তেই বিশেষ একটা নীতিসূত্র আবিষ্ককার করতে গিয়ে তিনি দুম করে ঝোলের বাটিটা দিলেন উলটে।
