লোকের মুখে-মুখে ঘুরে বেড়ানো যে উড়োখবর শোনা গেছে, তা থেকে জানা সম্ভব হয়েছে, পণ্ডিত বন-বন দাঁত-মুখ খিঁচিয়ে হাসতে থাকেন তখন, যখন তার দর কষাকষি প্রধান উদ্দেশ্য, বদখেয়াল পরিপূর্ণ করার প্রচণ্ড ইচ্ছা, তবে কিন্তু নিতান্তই নিজের স্বার্থের তাগিদে।
দোষ বা দুবর্লতা যে শব্দ ব্যবহার করেই মনের ভাব ব্যক্ত করা হোক না কেন, প্রখ্যাত এ দার্শনিক পণ্ডিতের আরও বহু দুর্বলতা অথবা আচার ব্যবহারের দোষ ছিল। তবে এও সত্য যে, সে সব ব্যাপার-স্যাপার নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা-ভাবনায় লিপ্ত হওয়ার কোনো দরকার নেই।
যেমন মনে করা যেতে পারে, পৃথিবীতে এমন বহু প্রতিভাশালী ব্যক্তি আছেন, বোতলের প্রতি যার এতটুকুও লিপ্সা বা আসক্তি নেই। বোতলের প্রতি কারো কারো অস্বাভাবিক আসক্তি থাকতে দেখা যায়। কারণ কি? এতে আমরা কি মনে করব? আমরা মনে করব, বোতলের প্রতি তার যেমন আসক্তি রয়েছে, আবার প্রতিভাও কম নেই, নতুবা ভাবতে হবে দারুণ উত্তেজনা সৃষ্টির মাধ্যমে পাঁচজনের হিত সাধনই তার প্রধানতম লক্ষ্য।
এবার দার্শনিক বন-বনের প্রসঙ্গে আশা যাক, তিনি বোতলকে আদর করে বকে জড়িয়ে ধরেন, দেবী জ্ঞানে পূজা করেন কখন? অবশ্যই সুযোগের সন্ধান পেলে, অথবা বিশেষ বিশেষ বোতলে বস্তু তাকে বিশেষ বিশেষ শক্তি-সামর্থ যোগায়।
আরও খোলসা করেই বলা যাক, কি বলেন? মনে করুন, পণ্ডিত বন-বন সেন্টপিরে মদের স্বাদ যখন গ্রহণ করেন, তখন যদি কোনো পণ্ডিত ব্যক্তি মুখামি করে ন্যায়-অন্যায় নিয়ে তর্কযুদ্ধে লিপ্ত হন তবে তাকে ঝড়ের মুখে শুকনো পাতার মতোই উড়ে যেতে হবে। মোদ্দা কথা, বন-বন রীতিমত ঝড় বইয়ে দেবেন।
আবার যদি বন-বন ক্লজ ডো ভোগো মদ গলা অবধি গিলে বুঁদ হয়ে পড়েন তখন তার সঙ্গে কেউ যদি যুক্তিতর্কে লিপ্ত হন তবে তাকেই নাজেহাল হয়ে কাড়াতে হবে। আর যদি তিনি চেম্বারলেন মদের শিকার হয়ে পড়েত সাবধান! –দোহাই ভাই, এখন প্রাণ গেলেও তার সঙ্গে তত্ত্বকথা নিয়ে আলোচনায় লিপ্ত হতে যাবেন না যেন, আগেই বলে রাখছি, তবে তিনি কিন্তু আপনাকে একেবারে নাস্তানাবুদ–ঘোল খাইয়ে ছাড়বেন।
এমনই একজন স্বনামধন্য দার্শনিক পণ্ডিত বন-বন। রেস্তোরাঁ বিশেষজ্ঞ শহরের যেকোনো পেটুক, যেকোনো ভোজন-রসিকই তার প্রতিভার খবর কিছুক্ষণ রাখে। চমৎকার প্রতিভা! খাসা প্রতিভা!নিখাদ প্রতিভা! তার হুলো বিড়ালটা পর্যন্ত তার এ বিশেষ প্রতিভাটার খবর অবশ্যই রাখে। সে কিন্তু ভুলেও তার মনিবের সামনে ল্যাজ নাড়ে না।
কেবলমাত্র বিড়ালটার কথাই বলি কেন? তার এ অসামান্য প্রতিভাটার কথা কোনো অংশে কম রাখে না। অনন্য প্রতিভার সামনে সে কান দুটো নুইয়ে দিয়ে নিচের চেয়ারটাকে সরিয়ে ফেলে পিট পিট করে তাকিয়ে মনিবের অসামান্য ক্ষমতার কথা তন্ময় হতে ভাবতে থাকে।
এবার বিখ্যাত দার্শনিক পণ্ডিত বন-বনের চেহারার বিবরণ যৎকিঞ্চিত না দিলে আপনাদের মানসিক অস্থিরতা দূর হবার নয়, বুঝতেই পারছি।
সত্যি কথা না বলে পারছি না, তার চেহারাটা মোটেই অন্য পাঁচজন মানুষের মতো নয়। বলতে দ্বিধা নেই, মানুষ নয়, বনের হিংস্র জন্তু-জানোয়ারের সঙ্গেই তাঁর চেহারার সাদৃশ্য সবচেয়ে বেশি।
কেবলমাত্র জন্তু-জানোয়ার বললেই যথার্থ বলা হবে না। বরং বলা চলে মানুষের সঙ্গে তার চেহারার যতটা না আছে সাদৃশ্য, তার চেয়ে অনেক, অনেক বেশি সাদৃশ্য খুঁজে পাওয়া যায় চার পেয়ে জানোয়ারের সঙ্গে। তবে এও সত্য যে, লোকটার মধ্যে অদ্ভুত একটা রাজা-রাজা ভাব প্রকাশ পায়। কেবলমাত্র আকৃতির জন্যই নয়, তার প্রকৃতির অবদানও কম নয়।
তার দৈহিক উচ্চতা তিন ফুট হলে কি হবে, তার মাথাটা কিন্তু একটা বেলের মতো এতটুকু। তবে তার জালার মতো পেটটা দৈহিক আয়তনের অভাব অনেকাংশে পূরণ করে দিয়েছে।
জালার মতো ইয়া বড় পেট–তাঁর যা-কিছু কৃতিত্ব, যত পরিচিতি সবই তার অতিকায় পেটটার দৌলতেই অর্জন করেছেন। সত্যি, এমন এক প্রতিভাশালী আত্মা থাকার উপযুক্ত জায়গাই বটে তার নাদুসনুদুস হুঁড়িটা।
প্রতিভাশালী দার্শনিক বন-বনের পোশাক পরিচ্ছদের ব্যাপারেও কিছু বলার দরকার মনে করছি। বাহ! পোশাক আশাক দার্শনিকের অসাধারণ ব্যক্তিত্ব প্রকাশের ক্ষেত্রে কম তো নয়ই বরং যথেষ্টই বলা চলে।
তার পোশাক আশাকের কথা বলা শুরু করার আগে মাথার চুলের প্রসঙ্গে দু একটা কথা বলে নেবার প্রয়োজন বোধ করছি। তিনি সব সময়ই মাথায় চুলগুলো খুবই ছোট–এই এতটুকু করে কাটেন। তবে ছোট ছোট চুলগুলোকে চিরুনি দিয়ে চেপে কপালের সাথে মিশিয়ে রাখেন। আর মাথায় চাপিয়ে রাখেন গাধার টুপি বা শঙ্কুর আকৃতিবিশিষ্ট লম্বা একটা টুপি। টুপিটার চারদিকে ঝালর ঝুলে থাকে। গায়ে চাপান একটা অদ্ভুত কাটের ফতুয়া, যার রঙটাকে কড়াইশুটির রঙের সঙ্গে তুলনা করা যেতে পরে। এরকম ফতুয়া তার আমলের অন্য কোনো রেস্তোরাঁ রসিকের মধ্যে চালু আছে বলে দেখা যায় না। তার হাতদুটো মাত্রাতিরিক্ত লম্বা। কুচ পরোয়া নেই, অসভ্য জংলিদের কায়দায় গুটিয়ে রেখে সমস্যা মিটিয়ে নেন।
রক্তের মতো লাল এক জোড়া বিচিত্র ধরনের চটি তিনি ব্যবহার করেন। তবে তাদের গায়ে সোনা-রূপার জরির কাজ করা থাকায় আরও অদ্ভুত দেখায়। কেবলমাত্র রঙের জন্যই অদ্ভুত দেখায় না। সামনের দিকটা হাস্যকর কায়দায় ছুঁচালো ও সরু হয়ে ওপরের দিকে গুটিয়ে থাকে। এ দুটোর দিকে নজর পড়লেই যেকোনো মানুষেরই হাসতে হাসতে দম বন্ধ হয়ে যাবার যোগাড় হয়।
