একেবারে হিপোড্রোম!
দেখুন, রাজা মশাইয়ের উল্লাসের বহরটা একবার দেখুন। অব্যাহতি পেয়ে যাওয়ায় তার উল্লাসের বহরটা একবার দেখুন।
রাজা মশাইয়ের চাটুকারদের কাণ্ডটা একবার দেখুন। তারা কেমন হাত-পা ছোঁড়াছুড়ি করে আনন্দ-উল্লাস করছে। কেমন গলা ছেড়ে গান গেয়ে আনন্দ প্রকাশে মেতে গেছে।
উল্লাস! উল্লাস! উল্লাস! কিন্তু লাগামছাড়া উল্লাস কেন? আছে, কারণ অবশ্যই আছে। কি সে কারণ, জানতে চাইছেন? রাজামশাই নাকি দৌড় প্রতিযোগিতায় প্রথম স্থান লাভ করেছে। আর সিংহ, বাঘ আর চিতাবাঘের দল হেরে গেছে। একেবারে গো-হারা হেরে গেছে তারা।
ব্যস। এতেই যথেষ্ট! আর দেখতে ইচ্ছুক নয়? এতেই শখ মিটে গেছে? একাধারে চার পশু দেখেই আপনার চিত্ত চমৎকার। জন্মের মতো শখ মিটে গেছে? ভালো কথা, তবে এখানেই ইতি করা যাক।
তবে একটা কথা বলে রাখছি, এভাবেই কিন্তু ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটে–পুরনো দিনের ঘটনাবলি ঘুরেফিরে আমাদের সামনে হাজির হয়।
বন-বন
বন-বন!
তার মতো ভয়ানক রেস্তোরাঁপ্রেমিক লোক আমি দ্বিতীয় আর একজন দেখিনি। যারা, যখনই ছোট এ-রেস্তোরাঁটায় ঢুকেছেন, তারাই বন-বন নামধারী লোকটাকে সেখানকার টেবিলে ঘাড় উঁচিয়ে বসে থাকতে দেখেছেন। এ-ব্যাপারে দ্বিমত পোষণ করে, এমন লোক খুঁজে পাওয়া ভার।
আরও আছে, রোস্তোরাপ্রিয় ছাড়াও বন-বন লোকটার আরও একটা বিশেষ পরিচয় আছে–তিনি একজন কৃতি দার্শনিক। তার এ-ব্যাপারে যে যথেষ্ট দক্ষতা আছে, এতেও কেউ দ্বিমত পোষণ করেন বলে আমার অন্তত জানা নেই। এ ব্যাপারটা লিখেও কেউ কারো সঙ্গে তর্কাতর্কিতে লিপ্ত হবেন না।
বড় বড় যে কোনো পণ্ডিত ব্যক্তির তুলনায় তিনি অনেক বেশি পুঁথিপত্র পাঠের মাধ্যমে অগাধ পাণ্ডিত্য অর্জন করেছেন, সব কটা গ্রন্থাগারের পুঁথিপত্র ঘাঁটাঘাঁটি করেছেন। আর লিখে দিস্তা দিস্তা পাতাও ভরেছেন।
দার্শনিক বন-বন যা-কিছু লিখেছেন, সবই যে উন্নতমানের তা যেমন অনায়াসে বলা সম্ভব নয়, ঠিক তেমনই বলা সম্ভব নয় তার যেকোনো লেখা পড়েই মর্মার্থ উদ্ধার করা, মানে তার বক্তব্য রপ্ত করা সম্ভব নয়।
পণ্ডিত বন-বনের অন্য সব লেখা যেমন তেমন, তার লেখা নীতিকথাগুলোকে মাথায় ঢোকানো খুবই কঠিন ব্যাপার। বহুবার পড়াশোনা করেও সেগুলোর অন্তর্নিহিত অর্থ বুঝতে পারার মতো ঘিলু কয়জনের মাথায়ই বা আছে?
তার লেখাগুলোকে কেন দুর্বোধ্য বলা হয়–তাই না? যারা তার লেখা, বিশেষ করে তার নীতিকথাগুলো পড়েননি, তাদের যে কিভাবে প্রকৃত সত্যটাকে বোঝানো যাবে, ভেবে পাচ্ছি না।
আরিস্টটল, প্লেটো আর পৃথিবীর বড় বড় দার্শনিকদের সঙ্গে আমাদের দার্শনিক পণ্ডিত বন-বনের কোনদিক থেকে তুলনাই চলতে পারে না।
সত্যি কথা বলতে কি, পণ্ডিত প্রবর বন-বন তো নিজেই চলমান একজন কৃতি দার্শনিক আর এ-কথা কেনই বা বলা যাবে না? দর্শন শাস্ত্রের যাবতীয় তথ্য যে তার ঠোঁটে সর্বস্ব হাজির থাকে।
আর বন-বন যে একজন ভয়ানক দর্শনপ্রিয় ব্যক্তি, এ-কথা তো গোড়াতেই বলে রেখেছি। আহারাদির ব্যাপারে তার এই যে অতুলনীয় প্রতিভা এ বিষয়ে কারো দ্বিমত থাকতে পারে না, থাকা উচিতও নয়। তিনি নিজের এর জন্য কেবলমাত্র মনে মনে নন, সবার সামনেই, একেবারে প্রকাশ্যে অহঙ্কার প্রকাশ করে থাকেন।
পণ্ডিত দার্শনিক নিজের আহারাদির প্রতিভা সম্বন্ধে বলতে গিয়ে মন্তব্য করেন– তার এ বিশেষ প্রতিভার মূলে রয়েছে, তার পাকস্থলির শক্তি। পাকস্থলির সহযোগিতা, অর্থাৎ পাকস্থলির সক্রিয় সহযোগিতা না থাকলে তার পক্ষে এ বিষয়ে প্রতিভার স্বাক্ষর রাখা কিছুতেই সম্ভব হত না।
আমি তার সম্বন্ধে যেটুকু দেখেছি আর বুঝেছি, আহারাদির ব্যাপারে চীনের মানুষের সঙ্গে তার সব দিক থেকে সাদৃশ্য বর্তমান। আত্মা পেটে থাকে, চীনের মানুষরা এ-কথা বলে। তবে আত্মার অবস্থান সম্বন্ধে গ্রীকরাই ঠিক কথা বলে। তাদের মতে, আত্মার অবস্থান উদরের খাঁচার ভেতরে আর মনের গহীনে।
ভুলেও এরকম কথা মনে স্থান দেবেন না যে, আমি পণ্ডিতদের পেটকু আখ্যা দিয়ে খুশি হতে চাচ্ছি। ভুল তো মানুষ মাত্রেই হয়ে থাকে। অতএব দার্শনিক বন বনের মোটেই ভুলচুক হতে পারে না, আমরা কি করে ভাবব, বলুন?
অতীত কাহিনী লিখতে বসে দার্শনিক বন-বন এবং একটা ভুলের কথাই আমি উল্লেখ করব। কথাটা হচ্ছে, সুযোগ পেলে কোনো জিনিস সম্বন্ধে দর কষাকষি করতে তিনি মোটেই ইতস্তত করেন না।
কিন্তু এরকম কথা কেউ ভুলেও মনে স্থান দেবেন না যে, পণ্ডিত বন-বন একজন অর্থলিলু, অর্থ পিশাচ ছিলেন।
মনে রাখবেন, পৃথিবীর কোনো দার্শনিকই কোনোদিন তার ধ্যান-ধারণাচ্যুত হয়ে, হন্যে হয়ে অর্থের পিছনে ছুটে বেড়িয়েছেন, অর্থকেই একমাত্র কাম্য–ধ্যান জ্ঞান, সাধনা হিসেবে গ্রহণ করেছেন।
এখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠতে পারে, তিনি তবে দর কষাকষিতে উৎসাহি হতেন কেন? এর উত্তর একটাই, নিজের স্বার্থ রক্ষিত হলো কিনা তা বোঝার জন্য। আর তা যদি সম্ভব করতে পারেন, তবে বেশ কয়েকদিন ধরে তার মুখে হাসির ছটা অক্ষুণ্ণ থাকত। তার পাণ্ডিত্য যে অন্তহীন–এ মুচকি হাসিটুকুই তার বিজ্ঞাপন হিসেবে কাজ করে থাকে।
মুখমণ্ডল জুড়ে এরকম মুচকি হাসি বিরাজ করার জন্য তার অন্য আর একটা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ হাসি অনেকেরই আজ অবধি নজরে পড়েনি। এ আবার কেমন হাসি রে বাবা! ভাবছেন, তাই নয়? দাঁত খিঁচিয়ে হাসি যাকে বলে।
