নিছক রাজার মিছিলের জন্যই ছেলে-বুড়ো সবাই এমন খুশির জোয়ারে গা ভাসিয়ে দেয়নি। খুশির আরও কারণ অবশ্যই আছে।
কী সে কারণ, যার ফলে সবাই এমন বলগাহীন খুশিতে মাতোয়ারা? রাজা মশাই আসছেন তাতে তো সবাই খুশি হওয়ার কথাই বটে। সবচেয়ে আনন্দের কথা হচ্ছে, রাজা মশাই সবেমাত্র এক হাজার ইজরায়েলবাসীকে কচুকাটা করে ফিরছেন। নিজেই–একদম নিজের হাতে তিনি এক হাজার মানুষকে যমের দুয়ারে পাঠিয়েছেন। এমন অবিশ্বাস্য বীরত্বের পরিচয় দিয়ে রাজা মশাই এখন সাঙ্গপাঙ্গদের নিয়ে বিজয় মিছিল নিয়ে পথে পথে চক্কর দিয়ে বেড়াচ্ছেন। একে মহাবীর, অতি বড় খুনি রাজা মশাইও বলতে পারেন, এমন একজন রাজার তোষামোদকারীরা গলাছেড়ে নানাভাবে স্তোকবাক্যে তাকে তুষ্ট করতে সাধ্যাতীত প্রয়াস চালাচ্ছে।
হতচ্ছাড়া নচ্ছার জংলি কোথাকার!
কেবলমাত্র রাজার চাটুকারদের কথাই বা বলি কেন? সৈন্যরাও কোনো অংশে কম যাচ্ছে না। তারা পর্যন্ত কুচকাওয়াজ করতে করতে ল্যাটিন গানের মাধ্যমে রাজার সন্তোষ উৎপাদন করে তার মনোরঞ্জন করছে।
ওই যে, ওই দিকে দৃষ্টি ফেরান। ভালোভাবে লক্ষ্য করুন, দেশের মানুষগুলোর মুখের রঙ কেমন গাঢ় লাল। গালগুলো যেন রীতিমত টস টস করছে।
কেন তাদের মুখ এমন লক্ষণীয়ভাবে লাল হয়ে উঠেছে, বলতে পারেন? পারলেন না তো? আমিই বলছি, শুনুন। আরে মশাই অফুরন্ত খুশির মেজাজের জন্যই তো মুখের রঙ এমন অভাবনীয়ভাবে পাল্টে গেছে। আর সে সঙ্গে মনের হাসিখুশি ভাবটা আরও বেশি করে উঠেছে। অনবরত রাজার গুনগান গাওয়া আর মাত্রাতিরিক্ত শ্ৰদ্ধাপ্রদর্শনের জন্য। চাটুকাররা যে আর কতভাবে রাজার তোষামোদ করবে, তা তিনি বেশি খুশি হবেন তা যেন তারা ভেবেই পাচ্ছে না। অপদার্থ! আহাম্মক কোথাকার।
ব্যস, রাজা মশাই এসে গেছেন। আরে মশাই, ওই তো ঘাড় ঘুরিয়ে ওইদিকে তাকান–ওই তো স্বয়ং রাজা মশাই সবার সঙ্গে পা মিলিয়ে পথ পাড়ি দিচ্ছেন। কী হল–দেখতে পাচ্ছেন না! কী ঝকমারিতেই পড়া গেল রে বাবা! চশমাটা নাকের ডগা থেকে তুলে জায়গামত তুলে নিয়ে ভালোভাবে তাকান, লক্ষ করুন।
আরে মশাই, ওই যে সদ্য জঙ্গল থেকে বেরিয়ে আসা জানোয়ারটাকে দেখছেন– উনিই তো দেশের রাজা। তার গজেগমনে পথ পাড়ি দেওয়া, রাজকীয় ভঙ্গিতে না চালানো, আর থেকে থেকে শিবনেত্র হয়ে চলা প্রজাদের দিকে তাৎপর্যপূর্ণ দৃষ্টিতে তাকানো–এসব দেখেই নিঃসন্দেহ হওয়া যায়, মিলিলের মধ্যে কোটা রাজা মশাই। আরও খোলসা করে বলছি–কিম্ভুতকিমাকার চেহারা, উদ্ভট ভঙ্গিতে তাকাচ্ছে, অর্ধেক উট আর অর্ধেক উটের আকৃতিবিশিষ্ট জানোয়ারটাই তো দেশের দণ্ডমুণ্ডের কর্তা, এবার চিনতে পেরেছেন তো?
আরে ধুৎ! এখন রাজাকে চিনতে পারলেন না মশাই। ঠিক আছে আঙুল বরাবর তাকান। ওই যে অর্ধেক উট আর অর্ধেক বাঘের আকৃতি বিশিষ্ট জানোয়ার দিব্যি চার পায়ে হেঁটে চলেছে, ওই তো রাজা। আর মাঝে মধ্যে খুর ছুঁড়ে লাথি হাঁকাচ্ছে তাকেই সবাই ভক্তিতে গদগদ হয়ে শ্রদ্ধা জানাচ্ছে। আর তাকে ঘুরে যারা চুমু খেতে আসছে, তাদেরই ক্ষুর চালিয়ে ভালোবাসা জানাচ্ছে, দেখতে পাচ্ছেন না।
এবার লক্ষ্য করুন, যার পিছন পিছন দুই উপপত্নী, তার ইয়া লম্বা ল্যাজটাকে তুলে কোলে করে পথ চলছে–দেখতে পাচ্ছেন না? কী যে বলছেন, আমার মাথায় আসছে না! এমন রাজাকেও ভীড়ের মাঝখান থেকে চিনে বের করতে পারছেন না। যাচ্ছে তা-ই!
ভাই, আসল ব্যাপারটা হচ্ছে, আমাদের মহামান্য রাজা মশাই–তিনি তো আর সব সময় তো আর রাজপোশাক পড়ে থাকেন না। দিনক্ষণলগ্ন বিচার করে তবেই রাজপোশাক গায়ে চাপান।
সত্যি কথা বলতে কি, বড় স্বেচ্ছাচারি, দাম্ভিক, অত্যাচারী আর বদ্ধ পাগল রাজা মশাই যে সবেমাত্রই এক হাজার ইজরায়েলকে খতম করে এসেছে। তা-ও আবার সবাইকে নিজে হাতেই কচকুাটা করেছে। সেজন্যই তো এমন একটা আনন্দ-উল্লাসের মিছিলে পশুর পোশাকেই সে উপযুক্ত। সে জন্যই পশুর চামড়ায় নিজেকে মুড়িয়ে নিয়ে, আড়াল করে পশুর চেয়ে অধম রাজা মশাই পথে নেমেছেন।
ওই যে, দুটো পশুর চামড়া দেখতে পাচ্ছেন না? তারই তলায় পশুরও অধম রাজা মশাই অবস্থান করছেন, চার নম্বর পশুটাকে বলতে পারেন? এবার নজরে পড়েছে? চিনতে পেরেছেন তো?
আরে মানুষ! মানুষ! মানুষ কেউই নয়! আসলে সবাই, সব মানুষই পশু। নর পশু! আরে বাবা! এ-কী কাণ্ড! হৈচৈ চিৎকার চ্যাঁচামেচি হঠাৎ কেমন যেন পঞ্চমে উঠে গেল। যে! কেন হৈ হল্লা মুহূর্তের মধ্যে এমন বেড়ে গেল!
এখন ছুটাছুটি দাপাদাপিই বা বেড়ে গেল কেন? এ-কী সর্বনাশ! এ যে রীতিমত সর্বনাশের চূড়ান্ত ঘটতে চলেছে! সিংহ, বাঘ আর চিতা বাঘগুলো ক্ষেপে একেবারে উন্মাদ-দশা হয়েছে! ভেকধারী রাজা মশাইয়ের শয়তানি আর বরদাস্ত করতে পারছে না!
অসহ্য! হিংস্র জন্তু জানোয়ারগুলো সহ্যের বাঁধ ভেঙে গেছে। এতক্ষণ বহু কষ্টে তারানিজেদের সামলে সুমলে রেখেছিল। এখন রাজা মশাইয়ের নষ্টামি–সীমা ছাড়িয়ে গেছে।
আর তারা কেনই ক্ষ্যাপবে না? এমনকিম্ভুতকিমাকার জীব তো তারা জীবনে দেখেনি। সে জন্যই তো তারা একজোট হয়ে পড়েছে। ভেকধারী রাজাকে বধ করে গায়ের জ্বালা মেটাবার জন্য তারা এখন ক্ষেপে গেছে।
ওই ওই ওই যে, দেখুন রাজা মশাই প্রাণ নিয়ে পালাচ্ছে। উপপত্নী দুজনও তার সঙ্গ নিয়েছে। তারা রাজা মশাইয়ের ল্যাজটাকে বুকে জাপ্টে ধরে রেখেই উধশ্বাসে ছুটে পালাচ্ছে। একেবারে ড্রোম পালা! পালা! পালা! এক মুহূর্তও দেরি নয়। সোজা
