ষোল শ পঁয়তাল্লিশ খ্রিস্টাব্দের কথা।
সে-বছর সেক্সাগোসিয়া রবিবার কাকডাকা ভোরে ভয়াল এ ঘূর্ণাবর্ত এমন ভয়ঙ্কর, গগনবিদারী শব্দ এতই উত্তাল-উদ্দাম হয়ে উঠেছিল যে, উপকূলের ছোটবড় বহু বাড়ির পাথরের চাঁইগুলো পর্যন্ত তীব্র গতিতে চারদিকে ছুটে ছুটে যাচ্ছিল। সে যে কী ভয়ঙ্কর পরিস্থিতি, তা আরও খোলসা করে বলে কারো মধ্যে করুণা সঞ্চার করা সম্ভব নয়, মোটেই নয়।
লেখক যযামাস র্যামাসের লেখা এ বিবরণ বিভিন্ন কারণে আমার মনোপুত হলো না। সত্যি কথা বলতে কী ভালুক আর তিমির কাহিনী দুটো তো নিতান্তই হাসির উদ্রেক করে। বলা হয়েছে, ঝড়ের কবলে পড়ে অতিকায় সব জাহাজ পাখির পালকের মতো ডুবে যায়। তাই যদি হয় তবে ভালুক আর তিমি গলা ছেড়ে চিল্লাচিল্লি করবে এটাই তো স্বাভাবিক। বরং তা যদি না করত তবেই অবাক হবার মতো ব্যাপার হতো, তাই না।
আর কালচার ও অন্যান্য সবার বিশ্বাস, মালস্ট্রামের পানির তলায় ঠিক কেন্দ্রস্থলে সুগভীর একটা গর্ত পৃথিবীর অভ্যন্তর ভাগ দিয়ে বহুদূরবর্তী কোনো স্থান পর্যন্ত প্রসারিত হয়েছে। তারপর সেখান থেকে গর্তের মুখটা আবার বাইরে বেরিয়ে এসেছে। আবার কেউ কেউ এ প্রসঙ্গে বোথুনিয়া উপসাগরের নাম করতেও ছাড়েন নি।
স্বীকার করতে লজ্জা নেই, আসলে অলস কল্পনা হলেও তখন আমার মনও সে মতামতকেই সমর্থন করেছিল, অর্থাৎ আমি মনে মনে স্বীকার করে নিয়েছিলাম।
কিন্তু পথপ্রদর্শককে আমার মতামত ব্যক্ত করা মাত্রই তিনি তা মুহূর্তের মধ্যেই নস্যাৎ করে দিলেন। তারপর নিজের মতামত ব্যক্ত করতে গিয়ে তিনি মন্তব্য করলেন–নরওয়ের প্রায় প্রতিটা মানুষ এ-বক্তব্যকে মেনে নেয়, তবুও তিনি নিজে একমত প্রকাশ, সমর্থন নারাজ। অর্থাৎ এটা তাঁর নিজের মতো নয়।
পরমুহূর্তেই তিনি আমাকে লক্ষ্য করে বললেন–একটা কথা জিজ্ঞেস করতে চাইছি।
আমি সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠলাম–বলুন, কি জানতে চাইছেন?
ঘূর্ণাবর্তটাকে তো নিজের চোখেই দেখলে, কী বল?
হ্যাঁ, তা-তো দেখলামই।
আর সেটাকে তো খুবই ভালোভাবেই দেখতে পেয়েছ, তাই না?
হ্যাঁ, ঠিক তাই।
এবার যদি পাহাড়টাকে ডিঙিয়ে অন্যদিকে যাও তবে বুঝতে পারবে, বাতাস সেখানে সরাসরি পৌঁছায় না।
হুম।
আর পানির এ তীব্র তর্জন গর্জনকে যদি বন্ধ কর তবে তোমাকে এমন এক কাহিনী শোনাতে পারি যাতে তোমার মধ্যে বিশ্বাস জন্মাবে যে, এ মসকো-স্ট্রাম সম্বন্ধে আমার কিছু ধারণা অবশ্যই থাকার কথা।
আমি তার ইচ্ছাকে গুরুত্ব দিয়ে সে-মতোই কাজ করলাম।
আমার আগ্রহটুকু লক্ষ্য করে তিনি বলতে আরম্ভ করলেন–
এক সময় আমাদের পরিবারের, মানে আমার আর আমার দুই ভাইয়ের মালিকানায় একটা স্কুনার টানা সত্তর মালের জাহাজ ছিল। আর সেটা ছিল এক মাস্তুল বিশিষ্ট।
সে জাহাজটা নিয়ে আমরা মাছ ধরতে যেতাম। আর মাছ ধরতে গিয়ে ক্রমে। এগোতে এগোতে প্রায়ই আমরা মত্সকো অঞ্চল অতিক্রম করে ভুরুখের কাছাকাছি বেশ কয়েকটা দ্বীপে পৌঁছে যেতাম।
এ-কথা সব মৎস্য শিকারিরই জানা আছে যে, কোনো সমুদ্রের যে কোনো ঘূর্ণিজলেই মওকা মাফিক প্রচুর মাছ ধরা পড়ে। তবে একটা কথা, সে ব্যাপারে সাহস অবশ্যই থাকা দরকার। মানে ঘূর্ণিজলের বিপদ কিছু না কিছু থাকা চাইই চাই। যাক, যে কথা বলছিলাম, লকডেনের প্রতিটা নাবিকের মধ্যেই একমাত্র আমরা তিন ভাই-ই সে দ্বীপে গিয়ে মাছের কারবার চালাতাম। আর একটা কথা, সে দ্বীপাঞ্চলের পাথরের ফোকড়ে ফোকড়ে এমন বহু পছন্দ মাফিক স্থান আছে যেখানে হরেক আকৃতি ও রঙের। মাছ প্রচুর পরিমাণে মেলে।
আমরা তিন ভাই স্কুনার নিয়ে ভুরুখের কাছাকাছি দ্বীপগুলোতে হানা দিতাম বলে আমরা সমুদ্রের বুক থেকে একদিনে যত মাছ তুলে আনতে পারতাম, অন্য সব মৎস্য শিকারিরা এক সপ্তাহেও সে পরিমাণ মাছ ধরতে সক্ষম হতো না। ফলে আমাদের কারবার অচিরেই ফুলে-ফেঁপে রমরমা হয়ে উঠতে লাগল।
আমরা স্কুনারটাকে নোঙর করে রাখতাম এখান থেকে পাঁচ মাইল উজানের একটা খাড়ির বুকে।
আবহাওয়া অনুকূল হলে তবেই সে পনেরো মিনিটের শান্ত সমুদ্রের সুযোগ নিয়ে মত্সকো স্ট্রামর প্রধান স্রোতে জাহাজকে ছেড়ে দিয়ে, স্রোতের টানে সেটাকে ভাসিয়ে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দিয়ে ওটারহম বা স্যান্ডফ্লেসেনের নিকটবর্তী কোনো এক স্থানে সুযোগ মতো নোঙর করতাম।
আমরা সেখানে থাকতাম যতক্ষণ পানি আবার শান্ত-স্বাভাবিক না হয়। এ জন্য দীর্ঘসময় অপেক্ষা করার পর পরিস্থিতি অনুকূল হলে আবার নোঙর তুলে বাড়ির দিকে স্কুনারের মুখ ঘোরাতাম।
এভাবে যাওয়া-আসার পথে অনুকূল আবহাওয়া পাওয়া যাবে সে রকম পরিস্থিতি বুঝতে পারলে তবেই কিন্তু আমরা এ অভিযানে পা-বাড়াতাম। কিন্তু একটা কথা খুবই সত্য যে, এ-কাজে আমাদের কোনোদিনই হিসাব-নিকাশে ভুলচুক হত না।
দুবছরে কেবলমাত্র দুবার বাতাস একেবারে পড়ে গিয়েছিল। ফলে তখন আমাদের স্কুনার নোঙর ফেলে কাটাতে হয়। তবে এরকম ঘটনা আকছাড় ঘটে না, খুব কমই ঘটে থাকে। আর একবার আমরা প্রতিকূল পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়ে ছিলাম। আমরা তো সে অঞ্চলে পৌঁছলাম। ব্যস, তার কিছুক্ষণ বাদেই প্রলয়ঙ্কর ঝড় শুরু হয়ে গেল। মুহূর্তের মধ্যে সমুদ্র উত্তাল-উদ্দাম হয়ে উঠল। সে যে কী ভয়ঙ্কর পরিস্থিতি তা কেবলমাত্র বলে কাউকে বুঝানো সম্ভব নয়। আর এরই ফলে আমাদের প্রায় পুরো একটা সপ্তাহ উপোষ করে কাটাতে হয় সে। ভয়ঙ্কর পরিস্থিতির কথা ভাবলে আমাদের গায়ে জ্বর আসার উপক্রম হয়।
