আসল কথা কি জানেন? জীবনমাত্রই তো প্রকৃতির দান। মানুষ? প্রকৃতির আহ্বানকে প্রতিরোধ করা কি মানুষের পক্ষে সম্ভব হয়, বলুন? তা-ই যদি সত্য হয় তবে ওরা কি করে পারবে। অবশ্যই পারবে না, কিছুতেই পারা সম্ভব নয়।
ও ভাই, এমন উৎকর্ণ হয়ে কি শুনছেন? কি শোনার চেষ্টা করছেন, বলুন তো? ও চেষ্টা ছাড়ান দিয়ে আমার দিকে তাকান। যা শোনার বোঝার জন্য এমন আগ্রহী তা আমার মুখ থেকেই শুনুন। হৈ হট্টগোলটা কীসের তা আমিই বলছি, শুনুন। তবে দেখতে-টেখতে চাইবেন না যেন। কারণ কি? কেন এমন কথা বলছি? আরে ভাই, সহ্য করতে পারবেন না। আপনার কান দুটো ঝালাপালা করবে।
যাক, কথা যখন দিয়েছি তখন ব্যাপারটা তো শোনাতেই হবে, বলতেই হবে খোলসা করে। বলছি শুনুন, আমুদের রাজা মশাই নতুন রঙ্গ তামাশা দেখার জন্য অত্যুৎসাহী। হিপোড্রামে অবশ্যই জীবনপণ মল্লযুদ্ধে মেতেছে, তা যদি না-ও হয় তবে নিদিয়ান কয়েদিদের কচুকাটা করা হচ্ছে। তা না হলে রাজা তার নিজের হাতে তৈরি নতুন রাজপ্রাসাদে আগুন ধরিয়ে দিয়ে আগুনের লেলিহান শিখা দেখার জন্য অত্যুৎসাহী হয়ে পড়েছেন, অথবা এমনও হওয়া খুবই স্বাভাবিক, দৃষ্টিনন্দন কোনো দেবস্থানকে ভেঙে ধূলিস্যাৎ করে দেওয়া হচ্ছে।
এদিকে হৈ হট্টগোল যে, কমে যাওয়া তো দূরের কথা ক্রমাগত বেড়েই চলেছে– কেন? হয়তো বা ইহুদিদের একটা পুরো দলকে জ্যান্ত আগুনে পুড়িয়ে মারছে। আর এরই জন্য হয়তো আর্তস্বর আকাশভেদী হয়ে ওঠায় এত হৈ হট্টগোল, আর্তস্বর আর হাসির রোল এমন আকাশে-বাতাসে আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। আর কত রকম বাজনাই যে বাজছে–শুনতে পাচ্ছেন কিছু? লক্ষ-লক্ষ মানুষের হৈ-চৈ চিৎকার চাচামেচি, এতসব বাজনার আওয়াজকে ছাপিয়ে কানে আসছে। সে কী হাসি!
শুনুন। আরও মজা দেখার সাধ আছে কী? কোনোই চিন্তা নেই। আমার পিছন পিছন আসুন। সোজা নেমে আসুন, দেখবেন কেবলই মজাদার ব্যাপার স্যাপার।
আসুন, আমার পিছন পিছন সোজা এদিক দিয়ে চলে আসুন। আমার পিছন পিছন সোজা নেমে আসুন। ব্যস, এবার কিন্তু সদর রাস্তায় পৌঁছে গেছেন। সাবধান, খুব সাবধান। দেখেশুনে সতর্কতার সঙ্গে পা চালিয়ে আমাকে অনুসরণ করুন। ওই দেখুন, কেমন দলে দলে কাতারে কাতারে মানুষ অনবরত হাঁটছে তো হাঁটছেই। এ হাঁটার যেন বিরাম নেই এটুকুও।
আরে, আরে, করছেন কী! মানুষের মিছিল যাচ্ছে; যাক। আপনি রাস্তার ধারে চলে যান, সরে দাঁড়ান।
লক্ষ মানুষের এ মিছিল কোত্থেকে আসছে, বলুন তো? রাজপ্রাসাদের দিক থেকে। এরা এমন আনন্দে নাচানাচি করতে করতে এগিয়ে চলেছে। অর্থাৎ আমি বলতে চাইছি, এ মিছিলে স্বয়ং রাজা মশাই উপস্থিত রয়েছেন। তাই তো এত হৈ হুল্লোড়–খুশির ঝিলিক।
ওই যে, ওই শুনুন, কান পেতে শুনুন নফির গলা ছেড়ে চিল্লাচিল্লি করছে। সে অনবরত হাত ছুঁড়তে ছুঁড়তে বলছে–সরে যাও! তফাৎ যাও! তফাৎ যাও! দেখছ না, রাজা মশাই আসছেন! তফাৎ যাও!
চলুন, আমরা সামনের ওই মন্দিরটায় গিয়ে দাঁড়াই। সেখানে থাম্বার আড়ালে লুকিয়ে পড়ি। সেখান থেকেই আমরা গোপনে পুরো ব্যাপারটার ওপর নজর রাখি। আর দেরি নয়, পা চালিয়ে চলুন, মন্দিরটায় ঢুকে যাওয়া যাক।
আরে আরে করেছেন কী মশাই। আসুন, এদিকে আসুন। একটু জোরে পা চালান। এই দেখ, কী ঝকমারিতেই না পড়া গেল! একটা কেলেঙ্কারি না বাঁধিয়ে ছাড়বেন না দেখছি!
বিগ্রহ দেখেই ভিমড়ি খাওয়ার যোগার হলেন! এমন অবাক হয়ে দেখার কী যে আছে, আমার মাথায় আসছে না। আপনি কি দেবতা আশীমাহকের আগে কোনোদিন দেখেননি। চিনতে পারছেন না?
দেবতা আশীমাহর বিগ্রহ তো এমন অদ্ভুতদর্শনই বটে। ভবিষ্যৎ সিরিয়ানবাসীরা তো এমন অদ্ভুত দেবতার পূজা করবে। হ্যাঁ, সত্যি বলছি–তারা কিন্তু এমন একটা না-মানুষ, না-ভেড়া আর না-ছাগল, জীবনটাকেই ভগবান বলে অন্তরের অন্তঃস্থলে আসন পেতে দেবে। সবটুকু ভক্তি নিঙড়ে তাঁর পূজায় আত্ম নিয়োগ করবে। এবার ব্যাপারটা বুঝলেন তো। না না, আর পুতুলের মতো ঝুটমুট দাঁড়িয়ে থেকে ঝামেলায় জড়িয়ে পড়বেন না। চলুন মন্দিরের ওই থাম্বার আড়ালে গিয়ে আমরা গা-ঢাকা দিয়ে থাকি। ওখান থেকেই আমরা উঁকি দিয়ে দিয়ে রাজা মশাইয়ের মিছিলটাকে দিব্যি দেখতে পাব, সত্যি বলছি।
আরে সাহেব, চশমাটা কোটের পকেট থেকে বের করে চোখে লাগিয়ে নিন।
হ্যাঁ, হ্যাঁ, চশমটা চোখে লাগান। লাগিয়েছেন? এবার চোখের সামনে যা দেখছেন, এটা কি? হ্যাঁ, ঠিক, এক্কেবারে ঠিক বলেছেন–বেবুনই বটে। এটা বেবুনেরই বিগ্রহ। এর নামকরণ হয়েছে গ্রীক শব্দ মিমিয়া থেকে। বেবুনের বিগ্রহ বুঝলেন?
তবে একটা কথা ভুলে যাবেন না যেন, বেবুনদেব খুবই প্রভাবশালী দেবতা। ভক্তরা সর্বান্তকরণে এঁর পূজা পাঠ করে। আর এ-দেবতার নামে সবাই ভক্তিভাবে গ গদ হয়ে পড়ে।
এবার কী বলছি, ধৈর্য ধরে শুনুন–বেবুনদেবের পূজা করার কথা শুনে আপনি অবশ্যই বুঝতে পারছেন–দেশের পুরাতত্ত্ববিদরা কেমন অপদার্থ, আহাম্মকের শিরোমণি! এবার একটু উৎকর্ণ হয়ে লক্ষ্য করুন তো। কী শুনতে পারছেন কিছু? ঝাড়া নাকাড়া আর তুরি ভেরির আওয়াজ কানে আসচে না? কুচোকাঁচারা কেমন চিল্লাচিল্লি আর লাফালাফি করছে, দেখতে পাচ্ছেন না? দেখুন, ওই যে দেখুন তারা কেমন ধেই ধেই করে লাফাচ্ছে। তারা কেন এখন নাচানাচি লাফালাফি করছে, বুঝতে পারছেন? কিছুই বুঝতে পারছেন না? আরে মশাই রাজার মিছিল আসছে, স্বয়ং রাজা মিছিলে রয়েছেন, কম খুশির ব্যাপার।
