নদীটা কখনো পাহাড়ের গা-বেয়ে কুলকুল রবে নেচে নেচে হেলে দুলে নেমে এসেছে সমতল ভূমির দিকে, আবার কখনো বা বাড়িঘর জঙ্গলের বুক দিয়ে এগিয়ে গেছে আপন গতিতে।
এবার দৃষ্টি ফেরাতে হবে দক্ষিণ দিকে।
বারো মাইল দূরে ওই যে কাঁচের মতো স্বচ্ছ আর স্থির জলরাশি দেখতে পাচ্ছেন, ওটাই হচ্ছে ভূমধ্যসাগর।
এবার আপনার দৃষ্টিকে ওখান থেকে তুলে এদিকে নিয়ে আসুন। এদিকে তাকান। এই যে পুরনো প্রাসাদের সারি অরণ্যের মতো মাথা উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে–এসব কিন্তু সেই প্রাচিনকালে ১৮৩০ খ্রিস্টাব্দেই নির্মিত হয়েছে।
ইতিহাসের পাতা বিপরীত দিক থেকে ওল্টালে আপনি ১৮৪৫ খ্রিস্টাব্দে পৌঁছে দেখতে পাবেন, সবই ধ্বংস্তূপে পরিণত হয়ে গেছে–এক একটা ঢিবিতে পরিণত হয়ে গেছে।
এখন রূপ-সৌন্দর্যের আকর মনোলোভা এ শহরটার শোভা চাক্ষুষ করে আপনার মনে যদি শেকসপীয়রের কবিতা মনে মনে আবৃত্তি করার বাসনা জাগেই তবে কিন্তু মনে রাখবেন, আপনাকে ইতিহাসের বিপরীত দিককার অনেকগুলো পাতা উলটে অনেকগুলো বছর পিছিয়ে যেতেই হবে। কারণ? আরে ভাই, মহাকবি তো এখনো জন্মগ্রহণ করেননি।
ভাবছেন, অদ্ভুত কথা, তাই না? অবাক হচ্ছেন তো? অবাক হচ্ছেন যে, এমন অত্যাশ্চর্য একটা শহর ধ্বংস হয়ে মাটির ঢিবিতে পরিণত হয়ে যাওয়ায় অবাক হচ্ছেন, ঠিক কি না?
আরে ভাই, অবাক হবার কিছুই নেই। এমনটাই তো হয়ে থাকে। একের পর এক তিনটি ভূমিকম্প যে শহরের ওপর তুলকালাম কাণ্ড ঘটিয়েছে, যাকে লণ্ডভণ্ড– একেবারে ধূলিস্যাৎ করে দিয়েছিল তার এমন পরিণতিই তো হবার কথা।
সে শহরের বুকে এমন ভয়ঙ্কর কাণ্ড ঘটে গেছে তার বরাতে আর কী-ই বা ঘটতে পারে? আর প্রকৃতি দেবী এখন সে শহরকেই কেমন অবিশ্বাস্যভাবে বুকে করে আগলে আগলে রেখে দিয়েছেন, নিজের চোখেই তো দেখছেন। ছাইয়ের স্থূপের ওপরেই তো দৃষ্টিনন্দন ফুলের থোকা ফোটে! ধ্বংসস্তূপের ওপরেই তো সৌধ গড়ে ওঠে! একে অবশ্যই প্রকৃতিক নিয়ম আখ্যা না দিয়ে অন্য কি-ই বা বলা যেতে পারে।
আরে ধ্যুৎ ছাই! কেবল নিজের কথা নিয়েই সেই তখন থেকে ঘ্যানর ঘ্যানর করছি! কী ভাবছেন, কী বলছেন? নালা-নর্দমা, ময়লা-আবর্জনা, জমাটবাধা ধোঁয়া, পচা গন্ধ? আরে মশাই এ যে হতেই হবে। এটা যে পুতুল পূজার ঘাঁটি। কাঁসর-ঘণ্টা বাজিয়ে যেখানে মহা ধূমধামের সঙ্গে পুতুল পূজা হয়, সেখানে তো নাকে ধুনোর গন্ধ আসবেই আসবে। আর ধূনোর ধোয়াও দেখা যাবেই।
সুবিশাল, আকাশছোঁয়া প্রাসাদগুলোর লম্বা ও মোটা থামগুলোর আড়ালে সরু সরু গলি থাকার তো কথাই বটে। সেখানে ময়লা আবর্জনা জমার কথা নয়! নালা নর্দমা থেকে দুর্গন্ধ ছড়াবে না! কি যে বলেন ভাই, এসব তো মামুলি ব্যাপার।
না, হাসবেন না। একদম হাসবেন না বলে দিচ্ছি। ওই যে আধা-উলঙ্গ লোকগুলোকে দেখছেন, যার মুখে রঙের প্রলেপ দিয়ে হাত-পা উঁচিয়ে গলা ছেড়ে চেঁচিয়ে চলেছে, তারা কিন্তু কেউই উন্মাদদশা হয়নি, মস্তিষ্ক বিকৃতি ঘটেনি। তবে? কি তাদের পরিচয়? তারা প্রত্যেকে এক-একজন দার্শনিক। জ্ঞানের ভাণ্ডার নিঙড়ে দশজনকে জ্ঞানদান করে চলেছেন। তবে সবাই কিন্তু প্রকৃত জ্ঞানী নন। ভণ্ডের সংখ্যাও নেহাৎ কম নয়। তারা নীতিকথাই বেশি বলেন। সত্যি বলছি, ভণ্ডরাই বেশি নীতি কথা বলে থাকে, ঠিক কি না?
এবার ওই দিকে, ওই দিকে দৃষ্টিপাত করুন। ভালো করে তাকিয়ে দেখুন কেমন অমানবিক আচরণ! সহজ-সরল-নিরীহ ম প্রকৃতির মানুষগুলোকে লাঠিপেটা করে একদল লোক কেমন উল্লসিত হচ্ছে, মজা লুটছে! ওরা কারা জানতে ইচ্ছা করছে, তাই না। বলছি তবে শুনুন, ওরা রাজার উমেদার, ঠাঙাড়ের দল। ওদের ভাঁড় বললেও ভুল করা হবে না। যেন-তেন প্রকারে রাজাকে সন্তুষ্ট করাই ওদের এক মাত্র লক্ষ্য। ওরা তো ভালোই জানে, রাজাকে খুশি করতে, মুখে হাসি ফোঁটাতে পারলেই তাদের ভাগ্য খুলে যাবে।
কী ব্যাপার বলুন তো ভাই, ভয়ে কুঁকড়ে যাচ্ছেন নাকি? হাবভাব দেখে মনে তো হচ্ছে, ভয়ই পেয়েছেন। শহরময় জংলি জন্তু-জানোয়ার দাঁড়িয়ে রয়েছে তাতে আপনার ভয়ে এমন মুষড়ে যাবার কী আছে? ওরা তো মানুষের সেবা করা ছাড়া অন্য কিছুই করছে না। কোনোরকম বদ মতলবও ওদের মাথায় নেই। মানুষের সেবা করাকেই ওরা জীবনের ব্রত বলে গ্রহণ করেছে। আর তা করছে সে তো নিজের চোখেই দেখতে পাচ্ছেন। লক্ষ্য করে দেখুন তো ওদের কারো গলায় দড়ি আছে কি? না, কারো গলায়ই নেই।
দেখুন, তাকিয়ে দেখুন, সিংহ, বাঘ আর চিতাবাঘ পর্যন্ত সবাই কেমন স্বাধীনভাবে মনিবদের অনুসরণ করে চলেছে। একটু ভালোভাবে লক্ষ্য করলেই বুঝতে পারবেন, ওদের মতো অনুগত ভৃত্য বুঝি আর হয় না।
প্রতিটা জন্তুজানোয়ারকেই ধরে ধরে শিখানো হয়েছে, কখন, কোন কাজ, কিভাবে করতে হবে। তবে এও সত্য যে, ওদের যত শিক্ষাই দেওয়া হয়ে থাক না কেন মাঝে মধ্যে শিক্ষা দীক্ষাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে আদি হিংস্র জানোয়ার বনে যায়। হিংস্র মনোভাবই তাদের মধ্যে তখন সক্রিয় হয়ে ওঠে। আর হিংস্রতার বশবর্তী হয়ে তারা অস্ত্রধারীকেও চিবিয়ে খেয়ে ফেলে, বলদের রক্ত পান করে পরম তৃপ্তি লাভ করে। আরে ভাই, এসব তো নিতান্তই তুচ্ছাতিতুচ্ছ ব্যাপার। এসব নিয়ে কেউ তিলমাত্র ভাবে না, প্রয়োজনও তো নেই।
